চিকিৎসায় দুর্ভোগের কারণে এতদিন কষ্ট চেপে বাসায় থাকা সাধারণ রোগীরা এখন হাসপাতালে আসতে শুরু করেছেন। সরকার ও বেসরকারি হাসপাতালে রোগীদের ভিড় বাড়ছে। জরুরি ও রুটিন অস্ত্রোপচারের চাপ বাড়ছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের চেম্বারেও যাচ্ছেন রোগীরা। আগের তুলনায় এসব হাসপাতালে প্রায় তিনগুণ রোগী বেড়েছে। কিন্তু এখনো আশানুরূপ চিকিৎসা পাচ্ছেন না রোগীরা।
সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরা দেশ রূপান্তরকে জানান, কভিডের ভয়ে ও চিকিৎসা না পেয়ে এতদিন যেসব রোগী বাসা থেকে বের হননি, রোগের কষ্ট চেপে রেখেছেন, এখন সেসব রোগী বের হতে শুরু করেছেন। কিন্তু চিকিৎসা সেবাটা সে অনুপাতে এখনো কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছেনি। সীমিত আকারে কিছু জরুরি অস্ত্রোপচার শুরু হলেও অনেক জটিল রোগের অস্ত্রোপচার হচ্ছে না। বন্ধ রয়েছে রুটিন অস্ত্রোপচার। এমনকি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরাও নিয়মিত চেম্বারে বসছেন না।
এসব চিকিৎসক আরও জানিয়েছেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রীসহ সরকারি কর্মকর্তারা দেশে করোনা কমেছে এবং কভিড হাসপাতালে রোগী কমেছে বলে যে তথ্য দিচ্ছেন, তাতে বিভ্রম তৈরি হয়েছে। কারণ এখন বেসরকারি হাসপাতালে কভিড রোগী বেড়েছে। এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে কোনো কভিড রোগীকে রেফার করতে চাইলে বেড ও আইসিইউ পাওয়া যাচ্ছে না। করোনা পরীক্ষার রেজাল্ট ছাড়া এখনো রোগী ভর্তি নেওয়া হচ্ছে না। আবার করোনার ফল পেতেও দেরি হচ্ছে। ফলে রোগীরা বের হয়ে এলেও চিকিৎসা পেতে এখনো তাদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে নন-কভিড রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকার প্রত্যেক হাসপাতালে কভিড ও নন-কভিড রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার যে নির্দেশ দিয়েছিল, সেটা কঠোরভাবে মনিটরিং করতে হবে। বিশেষ করে সব হাসপাতালে তাৎক্ষণিকভাবে রোগীর করোনা পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। এতে রোগী ভর্তি সহজ হবে ও চিকিৎসকরাও রোগী দেখতে সাহস পাবেন। মানুষের ভেতর যে চিকিৎসাভীতি সেটা কাটবে। চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর আস্থা ফিরবে।
এ ব্যাপারে করোনা মোকাবিলায় গঠিত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখন নন-কভিড রোগের চিকিৎসা বাড়াতে হবে। এজন্য সরকার কাজও করছে। সরকার যে বলেছিল, কভিড হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সরা ১৪ দিন বাসায় থাকবে, সেটা আমরা মানা করে দিয়েছি। বলেছি তাদের হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। বাসার লোকজন সংক্রমিত হবে। সেটা মন্ত্রণালয় মেনে নিয়েছে। এছাড়া যেসব কভিড হাসপাতালে বেড খালি, সেসব নন-কভিডে নিয়ে আসবে বলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজেই বলেছেন। এসব দিকে নজর দিচ্ছে।
প্রত্যেক হাসপাতালে সব রোগীর চিকিৎসা সুবিধা বাড়াতে এ বিশেষজ্ঞ বলেন, অ্যান্টিজেন টেস্ট সরকার অনুমতি দিয়েছে। এখন কিট জোগাড় করতে হবে। এ টেস্ট আমরা রোগীদের তাৎক্ষণিক টেস্ট করার জন্যই দিয়েছি। এটা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। এসব করলে রোগীদের চিকিৎসা আগের চেয়ে সহজ হবে। চিকিৎসকরাও চিকিৎসা দিতে সাহস পাবেন।
আগের চেয়ে হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা তিনগুণ বেড়েছে এমন তথ্য জানান সরকারি সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, করোনার শুরু থেকেই নন-কভিড রোগীরা দারুণভাবে অবহেলিত ছিলেন। কভিডের বাইরে ক্যানসারসহ অন্যান্য রোগের রোগীদের ভীষণ ভোগান্তি ছিল। ইদানীং আমরা দেখছি এসব সাধারণ রোগী বেরিয়ে আসছে। যেমন আমাদের হাসপাতালে সাধারণ রোগীর সংখ্যা দুই-তিনগুণ হয়ে গেছে। আগে আউটডোরে ৫০০-এর ওপরে রোগী আসত না, এখন দেড় হাজার হয়ে গেছে। ইনডোরের ৫০০-৫৫০ রোগী এখন এক হাজার হয়ে গেছে। অর্থাৎ নন-কভিড রোগী বেড়ে গেছে। অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালেও রোগীর ভিড় বাড়ছে।
কিন্তু এখনো রোগীদের দুর্ভোগ কমেনি উল্লেখ করে এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, কভিডের ক্ষেত্রে দুর্ভোগ কমলেও নন-কভিড রোগীর ক্ষেত্রে দুর্ভোগ এখনো আছে। রোগীরা হাসপাতালে আসছে। কিন্তু চিকিৎসা পেতে এখনো সমস্যা হচ্ছে। যে হারে মানুষ রাস্তায় নেমে গেছে, হাসপাতালে আসছে, সে অনুপাতে চিকিৎসকরা চেম্বারে বসেনি। আগে অপারেশন বন্ধ ছিল, সেটা চালু হয়েছে। কিন্তু এখনো নন-কভিড রোগীর সেবায় টানাপড়েন আছে। এসব মানুষের চিকিৎসা ব্যবস্থা কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছেনি।
হাসপাতালে রোগী বাড়লেও চিকিৎসা ব্যবস্থা এখনো স্থিতিশীল হয়নি বলে জানান বেসরকারি হেলথ অ্যান্ড হোপ স্পেশালাইজড হাসপাতালের পরিচালক ও প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, হাসপাতালগুলোতে কভিড ও নন-কভিড অংশের মধ্যে নন-কভিড অংশে এক মাস আগেও যে রোগী ছিল, এখন তা বেশি হচ্ছে। এতদিন সাধারণ লোকজন ভয়ে চিকিৎসা নেয়নি, কষ্ট করে চেপে ছিল। এখন তারা আসতে শুরু করেছে। কিন্তু চিকিৎসা ব্যবস্থায় সাধারণ স্থিতিশীল অবস্থা এখনো ফেরেনি। বেসরকারি হাসপাতালে রুটিন অপারেশন এখন হচ্ছে না। কিছু জরুরি অস্ত্রোপচার হচ্ছে, কিন্তু জটিল অস্ত্রোপচারগুলো বন্ধ। ফলে অপারেশনের জন্য অপেক্ষায় থাকা রোগীদের কষ্ট ও অপেক্ষা বেড়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, একটি মহামারী যখন চলমান থাকে তখন চিকিৎসা ব্যবস্থায়ও পরিবর্তন আসে। কোনো রুটিন অপারেশনের আগে কভিড টেস্ট করে নিতে হয়। কারণ রোগীটি উপসর্গবিহীন ভাইরাসবাহী কি না, সেটা জানা না গেলে এতে অপারেশনের পর রোগীর যেমন অসুবিধা হবে এবং ওটিতে (অপারেশন থিয়েটার) যারা থাকবেন ও রোগীকে যখন বেডে দেবে তখন অন্য রোগীদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে যাবে। ফলে পরীক্ষা করাটা নিয়ম বা প্রটোকল। এ পরীক্ষা করা নিয়েই রোগীদের বেশ দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। চাইলেই কেউ পরীক্ষা করাতে পারেন না।
এ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এমনও জানান, এখন সরকারি হাসপাতালে কভিড রোগীর সংখ্যা কম, বেসরকারি হাসপাতালে কভিড রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। বেসরকারি হাসপাতালে সিট সংকুলান হচ্ছে না। আগে যেখানে কোনো হাসপাতালে ৫-১০ জন রোগী হতো এখন সেখানে গড়ে ১৫ জন করে রোগী হচ্ছে। অনেক জায়গায় কভিড রোগী রেফার করতে চাইলে আইসিইউ বা সিট পাই না। এখন যেসব কভিড রোগী ভর্তি হচ্ছে, তাদের বেশিরভাগই জটিল।
এমন পরিস্থিতিতে নন-কভিড রোগীর চিকিৎসা সুবিধা বাড়াতে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া উচিত জানতে চাইলে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকার কিছু কভিড হাসপাতাল বন্ধ করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটা যেন না করে। প্রত্যেকটা সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে কভিড ও নন-কভিড অংশ রাখার যে নির্দেশ সরকার দিয়েছিল, সেটা আরও কঠোরভাবে মনিটরিং করে বাস্তবায়ন করতে হবে। এখনো অনেক কভিড রোগী হাসপাতালে ঢুকে যাচ্ছে। দুই অংশ থাকলে তখন কভিড রোগীদের নন-কভিড অংশে ভর্তি হওয়ার হার কমবে। আর যদি হাসপাতালের কভিড অংশ ও কভিড হাসপাতাল বন্ধ করে দিই, তাহলে উপসর্গ গোপন করে বা উপসর্গ বুঝতে না পেরে পুরো হাসপাতালে কভিড রোগী ভর্তি হবে। এসব রোগী দ্বারা নন-কভিড রোগী, চিকিৎসক, নার্স সবাই আক্রান্ত হবে। এসব হাসপাতালের চিকিৎসকরা অন্য হাসপাতালে বা চেম্বারে রোগী দেখতে গিয়ে সেখানেও ছড়াবে।
চিকিৎসা ব্যবস্থা সঠিক করতে না পারলে করোনা পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে এমন আশঙ্কা প্রকাশ করে এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, এখন যেভাবে সবকিছু খুলে দেওয়া হয়েছে তাতে করোনা সংক্রমণের গতি স্থিতি অবস্থায় থাকতে পারে, বাড়তে পারে, বেজলাইনে যেতে অনেক দীর্ঘায়ু হবে।
ডা. উত্তম কুমার বলেন, একমাত্র টুলস হিসেবে আরটিপিসিআর পরীক্ষা যুক্তিসংগত নয়। আরটিপিসিআর টেস্ট লাগবে। কিন্তু এ পরীক্ষার ফল পেতে যেহেতু দেরি হয় এবং হাসপাতালে আসা রোগীদের তাৎক্ষণিকভাবে পরীক্ষা করা যাচ্ছে না, তাই অ্যান্টিজেন টেস্ট দরকার। চিকিৎসক ও নার্সদের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে কি না, সেটা জানার জন্য অ্যান্টিবডি টেস্ট লাগবে। কারণ কভিডে আক্রান্ত একজন চিকিৎসক ও নার্স সুস্থ হওয়ার পর তার শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হলো কি না, সেটা জেনে কাজে যোগ দেওয়া উচিত। তাতে সাবধানতা অবলম্বন করা যায়। সিটি স্ক্যান, এক্স-রে ও রক্ত পরীক্ষার সুযোগ থাকতে হবে। এ তিন পরীক্ষার মাধ্যমে কভিড হলে শরীরে যেসব উপসর্গ, সেটা জানা যায়।
এখন সাধারণ রোগের চিকিৎসায় কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত প্রসঙ্গে ডা. লেলিন চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, করোনা টেস্ট সহজলভ্য ও পদ্ধতিও সহজ করতে হবে। একজন রোগী হাসপাতালে ভর্তির আগেই যেন টেস্ট করাতে পারে, সেটা সহজলভ্য করতে হবে। কারণ তার যদি অপারেশন লাগে, সে যদি ভর্তির পর টেস্ট করাতে চায়, তাতে দুটি সমস্যা। একটি হলো টেস্টের জন্য তাকে হাসপাতালে ভর্তি থেকে অতিরিক্ত অর্থ খরচ করতে হবে। আর দ্বিতীয়টি হলো সে যদি কভিড আক্রান্ত হয়, তাহলে হাসপাতালের অন্যদের মধ্যে ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে। অ্যান্টিজেন টেস্ট শুধু সরকারি হাসপাতালে নয়, সব হাসপাতালে বহুলভাবে ব্যবস্থা করতে হবে।
এ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আরও বলেন, এখন পর্যন্ত ঢাকার বাইরে বেসরকারি হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজগুলোতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই। তাদের সুরক্ষাসামগ্রী দেওয়া হয় না। সেখানে রোগীর করোনা টেস্টেরও কোনো ব্যবস্থা নেই। সেখানে রোগীর অপারেশন যেটা হয়, সেটাও অন্ধকারে, চিকিৎসক যে ট্রিটমেন্ট দেয় সেটাও অন্ধকারে। এতে ব্যক্তিগতভাবে চিকিৎসক ও রোগীর ক্ষতি হলো, পাশাপাশি রোগটি ছড়ানোর পথ খোলা থাকল।
কভিড হাসপাতাল কমালে সাধারণ রোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রে মানুষের দুর্ভোগ কি কমবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এতে অবস্থার কোনো পরিবর্তন হবে না। কারণ কোনো হাসপাতালেই যেকোনো রোগীকে ভর্তির আগে করোনা পরীক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই। কিছু কভিড হাসপাতাল বন্ধ করে দিলেই সেসব হাসপাতালের ওপর সাধারণ রোগীদের আস্থা আসবে না। কারণ সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার ওপর সবারই তীব্র সন্দেহ আছে। এ অব্যবস্থাপনা দূর না হলে সন্দেহ যাবে না। এখন কভিড ও নন-কভিড হাসপাতাল কমানো বাড়ানোতে কিছু যায় আসে না। সাধারণ মানুষের জন্য করোনা পরীক্ষা সহজ করতে হবে। হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সদের রোগীর প্রতি আন্তরিক হতে হবে।