রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ। সরকারের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের সহায়তা পাওয়ার পরও তহবিল ব্যবহারে দক্ষতা দেখাতে পারছে না। উল্লেখযোগ্যসংখ্যক তালিকাভুক্ত কোম্পানির পর্ষদে বসে মূল্য সংবেদনশীল তথ্য জেনে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির শেয়ার লেনদেনে সুবিধাজনক অবস্থানে থেকেও লোকসানে পড়েছে সরকারি এ বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানটি। বছরের পর বছর হাজার হাজার কোটি টাকার তহবিল ব্যবহার করেও পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতায় কাক্সিক্ষত ভূমিকা রাখতে পারেনি আইসিবি।
এমন পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানটিকে ঢেলে সাজাতে পরামর্শক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)। অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে এসইসি। এর আগে গত বছর পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে আইসিবির ভূমিকা ও তহবিল ব্যবস্থাপনা নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় ও এসইসি আলাদাভাবে তদন্ত করে। ওই তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই আইসিবিতে ব্যাপক সংস্কার আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এসইসির নির্বাহী পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) ও মুখপাত্র মোহাম্মদ রেজাউল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে আইসিবির সংস্কারে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগে গত বুধবার বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে এসইসি।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে আইসিবির বর্তমান ও ঐতিহাসিক আর্থিক এবং অ-আর্থিক পারফরম্যান্স, সার্বিক কার্যক্রম, পুঁজিবাজার উন্নয়নে আইসিবির ভূমিকার পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান হিসেবে আইসিবি যথাযথভাবে তার দায়-দায়িত্ব পালন করছে কি না সেটি পর্যালোচনা করে দেখতে হবে। এছাড়া আইসিবির প্রকৃত ব্যবসায়িক সুযোগ খুঁজে বের করা, বিনিয়োগ কৌশল, পোর্টফোলিওর ঝুঁকি বিশ্লেষণ, পোর্টফোলিও বৈচিত্র্যকরণ, বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া, তহবিলের উৎস ও ব্যবহার এবং আইসিবি ও এর সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি পর্যালোচনা করবে।
পুঁজিবাজারে ভূমিকা রাখতে ২০১০ সালের পর থেকে কয়েক ধাপে আইসিবিকে সহজ শর্তে অর্থায়ন করা হয়েছে। সর্বশেষ গত বছর বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে দুই হাজার কোটি টাকার জোগান দেওয়া হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত এ বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানটিকে। বারবার তহবিল জোগান দেওয়ার পরও আইসিবি তারল্য সংকটেই রয়ে গেছে। আর এ সংকট কাটাতে পুঁজিবাজারে টানা দরপতনের সময়ও আইসিবি শেয়ার বিক্রি করে বড় অঙ্কের অর্থ বাজার থেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে। আইসিবির বিরুদ্ধে যোগসাজশে শেয়ার ক্রয়ের অভিযোগও রয়েছে। দরপতনের সময়ে মূল বাজারকে সাপোর্ট না দিয়ে ব্লকে বিপুল পরিমাণের শেয়ার কেনার অনেক নজির রয়েছে। কারসাজিকারকদের সঙ্গে যোগসাজশে বেশি দরে শেয়ার কেনার অভিযোগও আইসিবির বিরুদ্ধে রয়েছে। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে লোকসান হলেও আইসিবিকে সঞ্চিতি সংরক্ষণ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এ সুবিধা না পেলে আইসিবিকে বড় লোকসানের মুখে পড়তে হতো।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে এসইসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলাম বলেছিলেন, আইসিবি সমস্যার মধ্যে আছে, সে ব্যাপারে দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ে অবহিত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান দিয়ে আইসিবিকে পুনর্গঠনের প্রস্তাবনা তৈরি করা হবে। এ বিষয়ে আগামী নভেম্বরের মধ্যেই প্রস্তাবনা দিতে বলা হয়েছে। পুঁজিবাজারে আইসিবির সঠিক ভূমিকা পালনের জন্য প্রয়োজনে সরকার অর্থায়ন করবে।
এসইসির দেওয়া বিজ্ঞপ্তিতে পরামর্শক নিয়োগের বিষয়ে বলা হয়েছে, ঋণ নীতিমালা ও প্রক্রিয়া এবং ঋণ আদায় কার্যক্রমও পর্যালোচনা করবে তারা। সিকিউরিটিজ এবং অন্যান্য আইন ও বিধিবিধান পরিপালন করছে কি না এবং এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বিচ্যুতি রয়েছে কি না সেটিও পর্যালোচনা করে দেখবে। আইসিবি সম্পর্কে পুঁজিবাজারের স্টেকহোল্ডারদের আবেগ ও প্রত্যাশা এবং প্রতিষ্ঠানটি তা পূরণ করতে পারছে কি না, সেটি মূল্যায়ন করতে হবে।
এছাড়া আইসিবির আর্থিক ও অ-আর্থিক সম্পদ পর্যালোচনা করা এবং এসব সম্পদ যথাযথভাবে ব্যবহার হয়েছে কি না, সেটি পরীক্ষা করে দেখার পাশাপাশি এর যথাযথ ব্যবহারের বিষয়ে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে সুপারিশ করতে হবে। প্রতিষ্ঠানটির সার্বিক সুশাসন, প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি কাঠামো, জনবল এবং আইসিবি ও এর সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম পরিচালনায় দক্ষতার বিষয়টি পর্যালোচনার পাশাপাশি এসব বিষয়ে কীভাবে উন্নতি করা যায়, সে বিষয়ে পরামর্শককে সুপারিশ করতে হবে।
এ বিষয়ে আরও বলা হয়েছে, আইসিবিকে তদারকির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক ও এসইসির ভূমিকা পর্যালোচনার পাশাপাশি বিদ্যমান অচলাবস্থা থেকে আইসিবিকে উত্তরণে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কীভাবে সহায়তা করতে পারে, সেটিও খুঁজে দেখবে পরামর্শক। আইসিবি ও এর সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ধারাবাহিক দুরবস্থার কারণ অনুসন্ধানের পাশাপাশি উত্তরণের উপায় সম্পর্কে পরামর্শ দেবে।
আইসিবির পারফরম্যান্স উন্নতির জন্য করণীয় এবং দীর্ঘমেয়াদে পুঁজিবাজারকে সহায়তাসহ মার্কেট মেকার হিসেবে এর ভূমিকার বিষয়ে সুপারিশ করবে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। সর্বোপরি আইসিবিকে পুনর্গঠনের বিষয়ে সুপারিশের পাশাপাশি এ-সংক্রান্ত এসইসির কমিটির নির্দেশনা অনুসারে অন্য যেকোনো ইস্যুতে কাজ করবে। দেশের পুঁজিবাজারকে সহায়তা করাই ছিল আইসিবি গঠনের উদ্দেশ্য। কিন্তু কয়েক বছর ধরে, বিশেষ করে ২০১৮-১৯ ও ২০১৯-২০ হিসাব বছরে প্রতিষ্ঠানটি ধারাবাহিক লোকসান দিয়েছে এবং মূলধন হারিয়েছে।
এসইসি বলছে, ‘উৎপাদন খাত ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ঋণের অর্থ আদায় করতে না পারায় প্রতিষ্ঠানটির অবস্থা আওা শোচনীয় হয়ে পড়েছে। যদিও এ ধরনের প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেওয়াটা কোনোভাবেই পুঁজিবাজারের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।’
অনেক ক্ষেত্রেই আইসিবি যেসব কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করেছে সেগুলোর পর্ষদে পরিচালক হিসেবে রয়েছে এবং লক-ইন থাকার কারণে প্রতিষ্ঠানটি সেসব কোম্পানির শেয়ারও বিক্রি করতে পারছে না। দরপতনের কারণে আইসিবির পোর্টফোলিওর মূল্য উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। আইসিবিকে মূলধন সহায়তা হিসেবে সরকারের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকবার ভর্তুকি দেওয়া হলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।
এসইসির পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, আইসিবিকে ভর্তুকি দেওয়া সঠিক হবে কি না এ মুহূর্তে সরকারকে এটি মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। আর আইসিবির সার্বিক কার্যক্রম বিশ্লেষণ, এ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি ম্যান্ডেট অনুসারে যেসব কাজ করেছে সেগুলোর তালিকা তৈরি, বর্তমানে পুঁজিবাজারে আইসিবির ভূমিকা, প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ও অ-আর্থিক সম্পদের অবস্থা, এর সুশাসন, প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি কাঠামো, জনবল সক্ষমতার পাশাপাশি বিশ্বের অন্যান্য দেশে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায়োগিকতা বিশ্লেষণের মাধ্যমে সরকারের পক্ষে আইসিবিকে মূল্যায়ন করা সম্ভব।