ঢাকার যানজট নিরসনে ‘ঢাকা পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ইমপ্রুভমেন্ট (ডিপিপিআইপি)’ শীর্ষক সম্ভাব্য প্রকল্প থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এই প্রকল্পটি প্রস্তুতের জন্য অগ্রিম ছাড় করা অর্থ ফেরত দিতে চিঠি দিয়েছে সংস্থাটি। এর ফলে ৩১ কোটি ৬০ লাখ টাকা ফেরত দিতে হবে। একই সঙ্গে সিদ্ধিরগঞ্জ বিদ্যুৎ প্রকল্পের অতিরিক্ত অর্থায়ন চুক্তির আওতায় ১৫০ কোটি টাকার ঋণচুক্তি বাতিল করেছে সংস্থাটি। এ হিসাবে বিশ্বব্যাংকের প্রায় ১৫৪ কোটি টাকার ঋণ ব্যবহার করতে পারল না বাংলাদেশ। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয় থেকে এ সংক্রান্ত আলাদা দুটি চিঠি পাঠানো হয়েছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে (ইআরডি)। আর ইআরডি চিঠি দিয়ে বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও ইআরডি থেকে পাওয়া তথ্যে এসব জানা গেছে।
ডিপিপিআইপি প্রকল্পের বিষয়ে ইআরডির কাছে পাঠানো চিঠিতে বিশ্বব্যাংক বলেছে, বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের মধ্যে প্রস্তাবিত ডিপিপিআইপি প্রকল্পের প্রস্তুতিমূলক একটি অগ্রিম চুক্তি ২০১৯ সালের ২৭ জুন স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এই পর্যায়ে প্রকল্পটি অগ্রসর হচ্ছে না। এজন্য প্রকল্পের জন্য বিশ্বব্যাংকের দেওয়া ৩১ কোটি ৫৯ লাখ ৪ হাজার ৯৯০ টাকা ফেরত দেওয়ার অনুরোধ করা হলো। ইআরডির উপসচিব রোকসানা খান স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে সিদ্ধিরগঞ্জ বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য মোট ঋণচুক্তির মধ্যে ১২ কোটি ৫৬ লাখ এসডিআর সমপরিমাণ অর্থ আর ছাড় করবে না বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটি চুক্তিটি বাতিল করার কথা জানিয়েছে। স্পেশাল ড্রয়িং রাইটস (এসডিআর) হলো আইএমএফের নিজস্ব মুদ্রা। প্রতি এসডিআরের মূল্যমান ১.৪১ মার্কিন ডলার। এ হিসাবে স্থানীয় মুদ্রায় বাতিল করা চুক্তির পরিমাণ দাঁড়ায় ১৫০ কোটি ৭১ লাখ ২ হাজার ২৬২ টাকা। বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত কান্ট্রি ডিরেক্টর মোহাম্মদ আনাস গত ৫ আগস্ট চুক্তি বাতিলের কথা জানিয়ে ইআরডির সচিব ফাতেমা ইয়াসমিনকে চিঠি দেন। ইআরডির উপসচিব সৈয়দা মাসুমা খানম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে।
দুই প্রকল্প থেকে বিশ্বব্যাংকের অর্থ প্রত্যাহারের ব্যাপারে জানতে চাইলে ইআরডির অতিরিক্ত সচিব ও বিশ্বব্যাংক উইংয়ের প্রধান সাহাবুদ্দীন পাটোয়ারী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অনেক দিন থেকে ডিপিপিআইপি প্রকল্পটি তৈরির কাজ চলছে। বিশ্বব্যাংকের এতে অর্থায়ন করার কথা ছিল। কিন্তু করোনা মহামারীসহ বিভিন্ন কারণে প্রকল্পের অগ্রাধিকারে পরিবর্তন এসেছে। এ জন্য আপাতত এই প্রকল্প হচ্ছে না। কিন্তু বিশ্বব্যাংক আগেই অগ্রিম হিসেবে কিছু টাকা ছাড় করেছিল, এখন সে টাকা ফেরত দিতে হবে। অন্যদিকে সিদ্ধিরগঞ্জ বিদ্যুৎ প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের ঋণচুক্তির পুরো টাকা ব্যয় করা যায়নি। এ জন্য অব্যয়িত টাকা আর ছাড় করবে না। এটাকে তারা চুক্তি বাতিল হিসেবে উল্লেখ করেছে।’
অর্থ প্রত্যাহারের ব্যাপারে জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের মুখপাত্র মেহরিন এ মাহবুব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সিদ্ধিরগঞ্জ বিদ্যুৎ প্রকল্পের আওতায় চুক্তির টাকা ব্যয় করতে পারেনি। কিন্তু প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হয়েছে, এজন্য অব্যবহত টাকা আর ছাড় করবে না বিশ্বব্যাংক। অন্যদিকে ডিপিপিআইপি প্রকল্পটি এ বছর হবে না। তাই অগ্রিম ছাড় করা টাকা চাওয়া হয়েছে। তবে এই টাকা অন্য প্রকল্পে দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।’
প্রায় একই ধরনের কথা বলেছেন বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনার কারণে বেশ কিছু নতুন প্রকল্প যুক্ত হয়েছে। এ জন্য কিছু প্রকল্প পরে বাস্তবায়ন হতে পারে বা নাও হতে পারে। তবে প্রত্যাহার করে নেওয়া অর্থ অন্য প্রকল্পে দেওয়া হতে পারে।’
গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সেটি বাস্তবায়নের কাজ চলছে। এ কার্যক্রম সম্প্রসারণের জন্য ডিপিপিআইপি নামের প্রাথমিক কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য একটি প্রকল্প নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছিল। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৯ কোটি ২৪ লাখ টাকা। এতে বিশ্বব্যাংকের সহায়তা দেওয়ার কথা ছিল।
অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানোর জন্য সিদ্ধিরগঞ্জ ২ এক্স ১৫০ মেগাওয়াট পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্ট নামের প্রকল্পটি ২০০৯ সালের ৮ সেপ্টেম্বর অনুমোদন দেওয়া হয়। এটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৭৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন ছিল ১ হাজার ৫০২ কোটি টাকা। এ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বাস্তবায়নের জন্য ২০০৮ সালের ১৩ নভেম্বর বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পরে এর ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ২৩৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ ২ হাজার ১৬২ কোটি টাকা ব্যয় বাড়িয়ে বৈদেশিক সহায়তা অংশে অতিরিক্ত সহায়তা হিসেবে ১ হাজার ৮২২ কোটি টাকা প্রত্যাশা করা হয়। এখন বিশ্বব্যাংক এই অতিরিক্ত অর্থ থেকে ১৫০ কোটি টাকা অর্থ ছাড় করবে না।