১০ গুণ বেশি দামে করোনা সরঞ্জাম ক্রয় কুয়েত মৈত্রীর

করোনা চিকিৎসায় দেশের প্রথম হাসপাতাল কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালের করোনা চিকিৎসা সরঞ্জামাদি কেনাকাটায় বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ১২ কোটি ১০ লাখ ৬৫ হাজার ৯০০ টাকার কেনাকাটায় দেওয়া বিভিন্ন কার্যাদেশের বিলে প্রচুর অসংগতি মিলেছে। এসব কেনাকাটায় বিভিন্ন যন্ত্রপাতি বাজারদরের চেয়ে ১০ গুণ বেশি দামে কেনা হয়েছে। একক ওয়ার্ক অর্ডারের মাধ্যমে নিজের পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দেওয়া হয়েছে। এমনকি হাসপাতালের চিকিৎসকদের হোটেলে থাকা ও খাবার বিলেও অসংগতি পাওয়া গেছে।

কেনাকাটার কাগজপত্র থেকে জানা গেছে, যে পিসিআর মেশিনের দাম ধরা হয়েছে ১ কোটি ৬৫ লাখ, সেটার বাজার মূল্য ২৫ লাখ টাকা। যা প্রায় ১০ গুণ বেশি দামে ক্রয়ের জন্য বলা হয়েছে। ডেফ্রিব্লেটর নামে একটি যন্ত্রের দাম ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৮১ হাজার টাকা। অথচ এটির দাম সর্বোচ্চ আড়াই লাখ টাকা। মাল্টিপারপাস প্যাশেন্ট মনিটর নামে যন্ত্রটির দাম ধরা হয়েছে ৫২ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এই মেশিনটির সর্বোচ্চ দাম ৮ লাখ টাকা। এভাবে প্রত্যেক জিনিসের দাম ধরা হয়েছে বাজারমূল্যের চেয়ে ৫-১০ গুণ বেশি দামে।

এসব অনিয়মের জন্য এককভাবে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোহাম্মদ সেহাব উদ্দীনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। গত এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত করোনা চিকিৎসায় যখন এসব অর্থ ব্যয় করা হয়, তখন হাসপাতালের পরিচালক নিয়োগ না থাকায় তত্ত্বাবধায়কই একাই দায়িত্ব পালন করতেন।

এমনকি মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত এসব কেনাকাটা হলেও গত বুধবার হঠাৎ করেই তত্ত্বাবধায়ক ক্রয় কমিটির দুই সদস্যকে ডেকে এসব কাগজপত্রে স্বাক্ষর নিয়েছেন বলেও জানা গেছে।

এসব ব্যাপারে কথা বলার জন্য গতকাল শনিবার রাতে কয়েকবার ফোন করলেও ফোন ধরেননি তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোহাম্মদ সেহাব উদ্দীন। এমনকি কথা বলার জন্য পরিচয় দিয়ে খুদেবার্তা পাঠালে তারও কোনো উত্তর দেননি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে হাসপাতালের পরিচালক ডা. এ কে এম সরওয়ারুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, এসব ব্যাপারে ওনার (তত্ত্বাবধায়ক) সঙ্গেই কথা বলেন। সেটাই ভালো হবে। আমি আপাতত এ ব্যাপারে কিছু বলতে পারছি না।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে এসব অভিযোগ লিখিত আকারে জমা পড়েছে। পরে এ সংক্রান্ত কার্যাদেশ ও বিলের তথ্য বিশ্লেষণ করে এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই হাসপাতালের কয়েকজন চিকিৎসক ও কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সে সময় তত্ত্বাবধায়কের একক সিদ্ধান্তেই চিকিৎসক ও নার্সদের জন্য বিভিন্ন হোটেল ভাড়া নেওয়া হয়। এ কাজে রিজেন্ট হাসপাতালের কেলেঙ্কারির কারণে বর্তমানে কারাগারে থাকা রিজেন্টের মালিক মোহাম্মদ সাহেদের সঙ্গে তত্ত্বাবধায়কের যোগাযোগ ছিল। তত্ত্বাবধায়ক কম দামে হোটেল ভাড়া বেশি দেখিয়ে দুই মাসে প্রায় ৯ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এ ছাড়া চিকিৎসক ও নার্সদের খাবার নিয়ে যে অসন্তোষ দেখা দেয়, সেখানেও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে তার নামে।

এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালের পরিচালক না থাকায় ডা. মোহাম্মদ সেহাব উদ্দীন হাসপাতালে করোনার চিকিৎসায় নিয়োজিত ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের থাকা-খাওয়া নিয়ে বিতর্কিত সাহেদের সঙ্গে কয়েকগুণ বেশি দামে চুক্তি করেন। অভিযোগ রয়েছে নার্সদের নিম্নমানের খাবার দেওয়ারও। যেখান থেকে বড় অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন ডা. সেহাব। আর ডা. সেহাবের এসব অপকর্মের প্রতিবাদ করায় ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. আলীমুজ্জামানকে বদলি করা হয়েছে বাগেরহাট সিভিল সার্জন অফিসে।

চিকিৎসকরা অভিযোগ করেছেন, তত্ত্বাবধায়কের এসব কাজের প্রতিবাদ করায় মার্চ থেকে এ পর্যন্ত বেশকিছু কর্মকর্তা ও চিকিৎসককে অন্যত্র বদলি করা হয়েছে। এমনকি জোরপূর্বক এসব বিলে সংশ্লিষ্টদের দিয়ে স্বাক্ষর করিয়ে নেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। সর্বশেষ গত ২৬ আগস্ট ক্রয় কমিটির দুই সদস্য ডা. সোহেলী পারভিন ও ডা. মামুনুর রশীদকে জরুরি তলব করে আগের বিভিন্ন তারিখের নামে প্রায় অর্ধ শতাধিক স্বাক্ষর নিয়েছেন।

বিভিন্ন সময়ে কেনাকাটার কাগজপত্র থেকে বাজারদরের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যে চিকিৎসা সরঞ্জামাদি কেনাকাটার তথ্য পাওয়া গেছে। গত ৩০ মার্চের এক কার্যপত্র অনুযায়ী দেখা যায়, মেসার্স আলী ট্রেডার্সের নামের প্রতিষ্ঠানকে ডিপিএম পদ্ধতিতে ১২ ধরনের যন্ত্রপাতি ক্রয়ে ৩ কোটি ১৮ লাখ ৪১ হাজার ৭৫০ টাকার কার্যপত্র দেওয়া হয়েছে। মার্চ মাসেই এভাবে আরও ৩টি কার্যপত্র দেওয়া হয়েছে একই নাম সর্বস্ব প্রতিষ্ঠানকে। ১২ মার্চের কার্যপত্রের মাধ্যমে ৭ ধরনের যন্ত্রপাতি ক্রয়ে ১ কোটি ৪২ লাখ ২৫ হাজার টাকা, ১৫ মার্চে ১১ ধরনের যন্ত্রপাতি ক্রয়ে ২ কোটি ৮৩ লাখ ৭ হাজার ৫শ’ টাকা এবং ২৫ মার্চে ৫ ধরনের যন্ত্রপাতি ক্রয়ে ১ কোটি ৪৬ লাখ ৭৫ হাজার টাকার কার্যাদেশ দেন ডা. মোহাম্মদ সেহাব উদ্দীন। এসব ভারী যন্ত্রপাতি ক্রয়ে ব্যয় করা হয়েছে ৮ কোটি ৯০ লাখ ৪৯ হাজার ২৫০ টাকা।   

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রতিটি যন্ত্রপাতিই প্রায় ১০ গুণ বেশি দামে কেনা হয়। ৩০ মার্চে স্বাক্ষর করা কার্যপত্রের ৬ নম্বর তালিকায় পিসিআর মেশিনের দাম ধরা হয়েছে ১ কোটি ৬৫ লাখ। অথচ এ মানের একটি পিসিআর মেশিনের দাম ২৫ লাখ টাকা। যা প্রায় ১০ গুণ বেশি দামে ক্রয়ের জন্য বলা হয়েছে। একই কার্যপত্রের ৪ নম্বরে ডেফ্রিব্লেটর নামে একটি যন্ত্রের দাম ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৮১ হাজার টাকা। অথচ এটির দাম সর্বোচ্চ আড়াই লাখ টাকা। ৫ নম্বরে সেন্ট্রাল মাল্টিপারপাস প্যাশেন্ট মনিটর নামে যন্ত্রটির দাম ধরা হয়েছে ৫২ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এই মেশিনটির সর্বোচ্চ দাম ৮ লাখ টাকা।

এমনকি কার্যপত্রে যেসব দেশ ও ব্রান্ডের নাম উল্লেখ করা হয়েছে সে অনুযায়ী মালামাল সরবরাহ করা হয়নি বলেও জানিয়েছেন হাসপাতালের কর্মকর্তা ও চিকিৎসকরা। তারা জানান, চীন থেকে যন্ত্রপাতি ক্রয় করে বিভিন্ন দেশের স্টিকার লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। যে প্রতিষ্ঠানের নামে (জিপিও নম্বর-১৯, মহাখালী সি/এ, বনানী ঢাকা) যন্ত্রপাতি কেনাকাটা দেখানো হয়েছে, সেখানে মেসার্স আলী ট্রেডার্স নামে কোনো প্রতিষ্ঠান পাওয়া যায়নি। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মেসার্স আলী ট্রেডার্সের প্যাড ব্যবহার করে ডা. মোহাম্মদ সেহাব উদ্দীন তার এক আত্মীয়কে এই কার্যাদেশ দেন।

ডা. মোহাম্মদ সেহাব উদ্দীন এসব অনিয়ম শুধু হাসপাতালের ভারী যন্ত্রপাতি ক্রয়েই সীমাবদ্ধ রাখেননি। হাসপাতালের এমএসআর/চিকিৎসা ও শৈল্য চিকিৎসা সরঞ্জামাদি ক্রয়েও একই চিত্র উঠে এসেছে। ফকিরাপুলের একটি প্রতিষ্ঠানের নামে ৩ কোটি ২০ লাখ ১৬ হাজার ৬৫০ টাকার কার্যাদেশ দিয়েছেন। পরে সেই বিলে গত ১৬ জুলাই প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. আলীমুজ্জামান নোট দেন। সেখানে তিনি লেখেন- ৪৮, ৯২ ও ৯৫ নম্বর বিল কাজ না করে বা সাপ্লাই না দিয়ে টাকা তুলে নিয়েছে।

এ ব্যাপারে হাসপাতালের ক্রয় কমিটির সদস্য ডা. সোহেলী পারভিন বলেন, প্রথমত কর্র্তৃপক্ষের পারমিশন ছাড়া কথা বলার নিয়ম নেই। গত মঙ্গলবার বিকেলে কল দিয়ে স্যার (তত্ত্বাবধায়ক) আমাকে হাসপাতালে যেতে বলেন। ওই দিন যেতে পারিনি। পরের দিন বুধবার আবার ফোন দেন এবং আমি হাসপাতালে যাই। তখন তিনি কতকগুলো কাগজে স্বাক্ষর করিয়ে নেন। তখন বলেন, কিছু কেনাকাটা প্রস্তাবনা আকারে আছে, পরে যাচাই-বাছাই কমিটি দেখে কেনাকাটা হবে। কিছু কাগজ পড়তেও দেননি। ওগুলো কী কাগজ সেগুলো জানারও সুযোগ দেননি। যদি কিছু করে থাকেন, উনি করেছেন। ব্যাক ডেটে সিগনেচার নিয়েছেন। এমনকি অনেকগুলোতে তারিখ ছাড়াই স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে।

একইভাবে ক্রয় কমিটির অপর সদস্য ডা. মামুনুর রশীদকে দিয়েও একইদিন স্বাক্ষর করানো হয়েছে বলেও জানান ডা. সোহেলী পারভিন।