২০১০ সালের ২৪ মার্চ রাজধানীর ফার্মগেট এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ইউসুফ আলী সুজনকে তুলে নিয়ে যায় সাদাপোশাকধারী কয়েকজন ব্যক্তি। এর পর থেকে পুলিশ-র্যাবসহ প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে ধরনা দিয়ে এখনো তার খোঁজ পায়নি স্বজনরা। বড় ভাই মাহবুবুর রহমান জানান, সুজনের ব্যবসার টাকায় চলত তাদের সংসার। অর্থসংকটে বর্তমানে অনেকটা খেয়ে না খেয়ে দিন কাটছে তাদের। একই কথা জানায় ২০১৭ সালের ৫ এপ্রিল নিখোঁজ হওয়া সাইদুর রহমান শাওনের পরিবার। শত চেষ্টা করে কোথাও শাওনের সন্ধান মেলেনি। ছেলে নিখোঁজের পর শাওনের মা হীরা খাতুন পুলিশের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেছিলেন। শেষে তিনি চাপের মুখে মামলাটি তুলে নেন। নিখোঁজ সুজনের পরিবারের মতো শাওনের পরিবারও এখন অর্থকষ্টে দিন পার করছে বলে জানান তার বড় ভাই ফয়সাল মির্জা। আর শুধু সুজন বা শাওনই নন, তাদের মতো আরও অনেক নিখোঁজের পরিবার অর্থকষ্টে দিন কাটাচ্ছে বলে দেশ রূপান্তররের অনুসন্ধানে জানা গেছে।
আজ ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। ২০১১ সাল থেকে প্রতি বছর ৩০ আগস্ট গুম হওয়া মানুষগুলোকে স্মরণ এবং সেই সঙ্গে তাদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানোর জন্য দিবসটি পালন করা হচ্ছে বিশ^ব্যাপী। গুমের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রাজনৈতিক নেতাকর্মীর পাশাপাশি আছে সাধারণ লোকজনও। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পরিচয়ে বিভিন্ন ব্যক্তিকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা বন্ধ না হলেও অনেকটাই কমেছে। নিখোঁজ বা গুম নিয়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কোনো কর্মকর্তা কথা বলতে রাজি হননি। তবে বিভিন্ন সময়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কোনো সদস্য কাউকে গুম বা নিখোঁজ করে না। অভিযোগ আসার পর তারা বিষয়গুলো খতিয়ে দেখেন।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, ১৪ বছরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেওয়ার পর ৬০৪ জন নিখোঁজ হয়েছেন বলে অভিযোগ ওঠে। তাদের বেশির ভাগের জীবিত বা মৃত সন্ধান পাওয়া গেলেও ২০০-এর বেশি মানুষ এখনো নিখোঁজ আছেন। তাদের স্বজনরা পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে হারিয়ে মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন। স্বজনদের খুঁজে পেতে গিয়ে তারা হয়রানি, ভয়ভীতিসহ নানা অনাকাক্সিক্ষত অভিজ্ঞতারও মুখোমুখি হচ্ছেন। মানবাধিকারকর্মী ও অপরাধ বিশ্লেকরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে নিখোঁজের ঘটনা কমেছে। তবে আগের ঘটনাগুলোর তদন্ত করে রহস্য উন্মোচন না করায় আইনের শাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হচ্ছে। এ জন্য স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠনের ওপর জোর দিয়েছেন তারা।
আসকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে নিখোঁজ বা গুম হওয়ার পরিস্থিতি ভালোর দিকে। প্রথম সাত মাসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে মাত্র দুজনকে ধরে নেওয়ার পর নিখোঁজ দাবি করা হয়। পরবর্তী সময়ে তাদের দুজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ২০১৯ সালে নিখোঁজ হয়েছে ১৩ জন। এদের মধ্যে চারজন ফেরত এসেছে। একজনকে পরবর্তীকালে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ২০১৮ সালে নিখোঁজ হয়েছে ৩৪ জন। এর মধ্যে দুজন ফেরত এসেছেন। ১৭ জনকে পরবর্তী সময়ে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বাকি ১৫ জনের এখনো হদিস নেই। তবে ১৪ বছরের হিসাব দেখলে পরিস্থিতি অনেকটা উদ্বেগজনক। এ সময় ৬০৪ জনকে অপহরণের পর নিখোঁজ থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৭৮ জনের লাশ পাওয়া যায়। ৬২ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। এ ছাড়া ফিরে আসেন ৫৭ জন। এর বাইরে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দপ্তরে এবং বিভিন্নভাবে আরও কিছু ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া যায়। তবে গণমাধ্যমের সূত্রে সন্ধান পাওয়া ব্যক্তিদের তথ্য বাদ দিয়ে এখনো মোট নিখোঁজ থাকা ব্যক্তিদের তথ্য হালনাগাদ করা নেই আসকের তথ্যে।
২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর সাজেদুল ইসলাম সুমনকে সাদাপোশাকধারী পুলিশ সদস্য পরিচয় দিয়ে রাজধানীর নাখালপাড়া থেকে তুলে নেওয়া হয়। তারপর থেকে আজও ফিরে আসেননি তিনি। সুমনের বোন মারুফা ইসলাম বলেন, ‘ভাইয়া না থাকায় সংসারে মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে পরিবারের সবাই আজ দিশেহারা। ভাইয়া বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে গিয়েও ভাইয়ের সন্ধান পাইনি। তার ব্যাংক হিসাবও বন্ধ করে রাখা হয়েছে।’
অর্থকষ্টে থাকার কথা জানিয়েছেন বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশিদীর লুনা। তিনি বলেন, ‘ইলিয়াস আলীর সব কটি ব্যাংক হিসাব বন্ধ করে রাখা হয়েছে। অভাব-অনটনের মধ্যে দিন কাটাচ্ছি। এখনো আশা করছি, ইলিয়াস আলী আমাদের মাঝে ফিরে আসবেন।’
এই দুটি পরিবারের মতোই নিখোঁজদের বেশির ভাগ পরিবারই অর্থকষ্টে দিন কাটাচ্ছে। স্বজনরা নিখোঁজ ব্যক্তিদের ব্যাংক হিসাব থেকে টাকা উত্তোলন করতে পারছেন না।
গত ১০ মার্চ দৈনিক পক্ষকাল পত্রিকার সম্পাদক ও ফটোসাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজলকে সাদাপোশাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করে তার পরিবার। গুম হওয়ার দীর্ঘ ৫৩ দিন পর বিজিবি যশোর সীমান্ত থেকে কাজলকে আটক করে। কাজলের বিরুদ্ধে অবৈধ অনুপ্রবেশের মামলা দেয় বিজিবি। ওই মামলায় কাজল এখনো কারাগারে। দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকার পর কাজল গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন বলে তার ছেলে মনোরম পলক জানিয়েছেন। পলক তার বাবার আশু মুক্তি দাবি করেছেন। গত ১৮ এপ্রিল দুপুরে কুষ্টিয়া সদর থানা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক আবদুল মাজেদকে খাজানগর এলাকা থেকে সাদাপোশাকে তুলে নেওয়া হয়। ডিবি পরিচয়ে ৮ ব্যক্তি তাকে তুলে নেওয়ার পর তার আটকের বিষয়টি অস্বীকার করে ডিবি। পরে কুষ্টিয়া থানার একটি মামলায় তাকে আটক দেখিয়ে আদালতে পাঠায় পুলিশ। মাজেদের আত্মীয়রা বলেন, নিখোঁজ থাকাকালে তারা মাজেদের প্রাণহানির আশঙ্কা করে দিন কাটিয়েছেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেওয়ার পর নিখোঁজের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) চেয়ারপারসন আইনজীবী জেড আই খান পান্না দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গুম হোক বা হেফাজতে মৃত্যু হোক, বিচারবহির্ভূত প্রতিটি ঘটনারই প্রতিবাদ এবং তদন্তের পর বিচার হওয়া দরকার। আমি মনে করি, একদিন গুম দিবস পালন নয়, প্রতিদিনই সবাইকে এর বিরুদ্ধে কথা বলতে হবে। বিচার বিভাগকেও মনোযোগ দিতে হবে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলো ফিরে পাওয়ার আশায় অনেক সময় কথা বলে না। তাদেরও আদালতে যাওয়া প্রয়োজন বলে মনে করি।’
অন্যদিকে মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এক দশকে আমরা ৬০০ থেকে ৭০০ মানুষকে বলপূর্বক অপহরণের শিকার বা গুম হতে দেখেছি। এদের কারও কারও বুলেটবিদ্ধ লাশ খালে-বিলে বা রাস্তার পাশে পাওয়া গেছে। কেউ কেউ এক সপ্তাহ, ১৫ দিন বা দেড় বছর পরে ফিরে এসেছে। কেউ কেউ এখনো ফিরে আসেনি। তাদের অধিকাংশই বিরোধী মতের রাজনৈতি দলের কর্মী-সমর্থক। যারা ফিরে এসেছে তারা ওই সময়টি কোথায় কেমন থেকেছে, এ নিয়ে মুখ খুলতে চায় না। নাম প্রকাশ না করে দুয়েকজন যারা আমাদের কাছে বক্তব্য দিয়েছেন, তাদের কাছ থেকে আমরা গুম থাকাকালে লোমহর্ষক বর্ণনা পেয়েছি। তাদের সঙ্গে কথা বলে দেখেছি, থানা পুলিশের হাজত ও কারাগারের বাইরেও লোকজনকে আটকে রাখার মতো আলাদা ব্যবস্থা রাষ্ট্রের আছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশকারী, মানবাধিকারকর্মী ও সচেতন নাগরিক অনেকেই গুমের স্বীকার হয়েছেন। যারা গুমের শিকার হয়েছেন, যাদের হত্যা করা হয়েছে, তাদের বিষয়ে তদন্তে একটি স্বাধীন ও আস্থাশীল বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করার প্রস্তাব আমরা বহু দিন থেকে দিয়ে আসছি। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে এ প্রস্তাব বাস্তবায়নে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নিতে দেখিনি। এ ছাড়া রাষ্ট্রের বড় বড় পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিরা গুম নিয়ে কটূক্তিমূলক মন্তব্য করেন। কেউ কেউ বলেছেন, গুমের শিকার ব্যক্তিরা ঋণ নিয়ে পালিয়ে গেছেন। কেউ কেউ বলছেন, গুম নিয়ে আইনে কিছু নেই। যারা এসব গুমের সঙ্গে জড়িত রাষ্ট্র তাদের নানা কৌশলে পুরস্কৃত করছে। এটা রাষ্ট্রের একধরনের দুর্বলতা।’