করোনার সংক্রমণ হার নিয়ে বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সার্ভিলেন্স বলছে, গত এক সপ্তাহ ধরে দেশে করোনার আর-নট (ভাইরাসের রিপ্রোডাকশন রেট) রেট দশমিক ৮ থেকে দশমিক ৯-এর মধ্যে ওঠানামা করছে। এর অর্থ হলো বর্তমানে একজন আক্রান্ত ব্যক্তি একজনের কম লোককে সংক্রমিত করছে। অর্থাৎ পাঁচজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে তিনজন নতুন করে সংক্রমিত হচ্ছেন।

এই আর-নট রেট অনুযায়ী দেশে করোনার সংক্রমণ তুলনামূলক হারে কমছে বলে মনে করছে সংস্থাটি। সংস্থার প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এএসএম আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, সংক্রমণের এই হার যদি সপ্তাহ দুয়েক এভাবেই থাকে তাহলে এরপর পরিস্থিতি একটা সহনশীল পর্যায়ে আসতে পারে।

তবে আইইডিসিআরের এ পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, পরীক্ষা কম হওয়ায় এবং র‌্যানডম টেস্ট (সবার পরীক্ষা) না হওয়ায় করোনার সঠিক চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না। একই কারণে দেশে করোনার ‘সর্বোচ্চ চূড়া’ বা ‘পিক’ বোঝা যাচ্ছে না। বিশেষ করে কম পরীক্ষার কারণে আইইডিসিআর যে আর-নট রেটের কথা বলছে, সেই পরিসংখ্যান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এসব বিশেষজ্ঞ।

এমনকি দেশে করোনার সংক্রমণ কমেছে এমনটা বলতে নারাজ আইইডিসিআর পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরিন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশে করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতি একই রকম আছে। একটু কমেছে, সেটা বলা যাবে না। বলাটা ঠিক হবে না। আমাদের সার্ভিলেন্সগুলো বলছে, কম বলা যাবে না, কমতির দিকেও বলা যাবে না। এখনো ঝুঁকির মধ্যেই আছি। নিয়ন্ত্রণে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

আইইডিসিআরের সার্ভিলেন্সের পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কভিড পরীক্ষার ল্যাবরেটরি জেনম সেন্টারের সহযোগী পরিচালক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. ইকবাল কবির জাহিদ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, আইইডিসিআর যে আর-নট রেটের কথা বলছে, সেটা নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। কারণ সংক্রমণ হার বোঝার জন্য যে পরিমাণ টেস্ট ও র‌্যানডম টেস্ট (উপসর্গ ও উপসর্গবিহীন বেশিসংখ্যক মানুষের করোনা পরীক্ষা) প্রয়োজন, সেটা দেশে হয়নি। পাঁচজনের টেস্ট ও ১০ জনের টেস্ট, দুটোর মধ্যে পরিসংখ্যানগত পার্থক্য হবে। এ কারণে মনে হয়েছে কম টেস্টের কারণে আমরা সংক্রমণ হারের সঠিক চিত্র পাচ্ছি না।

তবে বর্তমান আর-নট রেটকে সংক্রমণ পরিস্থিতি বোঝার সঠিক নির্দেশক বলে মনে করছেন আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এএসএম আলমগীর। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, বর্তমান আর-নট পয়েন্ট ৮ ও পয়েন্ট ৯-এর মধ্যেই আছে। এর অর্থ হলো এখন আর একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে একজনের কমসংখ্যক মানুষকে সংক্রমিত করছে। পাঁচজন থেকে তিনজনে ছড়াচ্ছে। এ রেট অনুযায়ী সংক্রমণ তুলনামূলক হারে কমছে। এখন পরীক্ষা অনুপাতে সংক্রমণের হার ১৫-১৭ শতাংশের মধ্যে। এটা যদি সপ্তাহ দুয়েক চলে তারপর একটা সহনশীল পর্যায়ে আসতে পারে।

আর-নট রেট কত হলে করোনা পরিস্থিতি সহনশীল পর্যায়ে বলা যাবে জানতে চাইলে এ বিশেষজ্ঞ বলেন, আর-নট হচ্ছে ভাইরাসের সংক্রমণ হার। আর-নট ১ মানে একজন থেকে একজনে ছড়ায়। দুই মানে দুজন থেকে দুজনে ছড়ায়, এই দুজন আবার চারজনে ছড়ায়। সারা পৃথিবীতে এ ভাইরাসের আর-নট ছিল ২ থেকে ৩ পয়েন্ট ৮, একজন থেকে চারজন পর্যন্ত ছড়িয়েছে। পৃথিবীর সব দেশে সংক্রমণ যখন অনেক ওপরে থাকে তখন লক্ষ্য থাকে আর-নট প্রথমে ২-এ আনতে হবে। ২-এর পর লক্ষ্য থাকে ১-এ আনতে হবে। আর-নট-১ হলেও মহামারী। একের নিচে যখন নামে তখন সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসার একটা সম্ভাবনা থাকে। আমাদের দেশে আর-নট-১-এর নিচেই আছে। সপ্তাহখানেক ধরে পয়েন্ট ৮ ও পয়েন্ট ৯-এর মধ্যেই ওঠানামা করছে। ঈদের আগে কমেছিল। পরে আবার বেড়ে পয়েন্ট ৯৬ হয়েছিল। এখন আবার কমেছে। যেহেতু রোগটির সংক্রমণ ছড়ানোর সময় দুই সপ্তাহ তাই এ সময় পর যদি সংক্রমণ কমে তখন সংক্রমণ হার ১০ শতাংশে নেমে আসতে পারে। মানুষ যদি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে তাহলে একটা সহনশীল পর্যায়ে আসবে।

সংক্রমণ পরিস্থিতি বুঝতে আইইডিসিআর আরও কিছু সার্ভিলেন্স করছে বলেও জানান এই প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ঢাকার মধ্যে আরও তিনটি বস্তির সার্ভিলেন্স করা হচ্ছে। এর আগে ঢাকার পাঁচটি বস্তির ফল প্রকাশ করেছিলাম। আগামী সপ্তাহে এটার পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হবে। তবে ঢাকার বাইরে তেমন সার্ভিলেন্স হয়নি। সার্ভিলেন্স করার জন্য যে প্রস্তুতি সেটা ঢাকার বাইরে নেই।

আইইডিসিআরের আর-নট রেট সম্পর্কে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা মহামারীকে নিয়ন্ত্রণ করিনি। সহনীয় পর্যায়েও নিইনি। মহামারীর পাশাপাশিই আছি। সামান্য একটু কমে আছি। সুতরাং সঠিক কৌশল ঠিক করে সঠিক পরিকল্পনা করে এটাকে কীভাবে কমিয়ে আনা যায় সেই চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু আমরা যেসব উদ্যোগ নিচ্ছি, সেটা করোনা কমানোর জন্য সহায়ক নয়। বরং এগুলো বাড়ানোর সহায়ক।

তিনি বলেন, গণপরিবহন খুলে দেওয়া, সমাবেশ শুরু করা, হোটেল-রেস্টুরেন্ট বাজার খুলে দেওয়া, শপিং মল খুলে দেওয়া হচ্ছে। জনসাধারণকে স্বাস্থ্যবিধি মানতে বলা হচ্ছে। কিন্তু ২৫ শতাংশ জনসংখ্যার মধ্যেই এসব মানার প্রবণতা নেই। সবাই যদি মানত এবং সরকার যেসব উদ্যোগ নিচ্ছে সেগুলো যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হতো, তখন আমরা বলতে পারতাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারব। ওটা না পারলে সংক্রমণ বৃদ্ধি পেতে পারে এবং সেই ঝুঁকি বাংলাদেশের আছে। সুতরাং আমাদের অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিয়ে বাস্তবায়ন করতে হবে।

এই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, আমাদের যেকোনোভাবে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সংক্রমণ যদি নিয়ন্ত্রণ না করি ও দীর্ঘায়িত হয়, স্বাভাবিক কর্মকান্ড না থাকে, সেটা জাতির জন্য বিরাট ক্ষতিকর দিক। সেজন্য নিয়ম হলো মহামারীর সময় যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রোগ নিয়ন্ত্রণ করে মানুষ যাতে স্বাভাবিক জীবনযাপনে ফিরে আসতে পারে এমন কৌশল নেওয়া। যেসব দেশ এসব কৌশল নিতে দেরি করেছে তাদের বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। যারা তাড়াতাড়ি নিয়েছে তারা নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে ও দ্রুত স্বাভাবিক জীবনযাপনে ফিরতে পেরেছে। নিউজিল্যান্ড থেকে শুরু করে আমেরিকার অনেক রাষ্ট্র স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে গেছে। অনেক দেশে একটা সংক্রমণ ও একটা মৃত্যুও নেই।

দেশে করোনা সংক্রমণের সঠিক পরিসংখ্যানের অভাবে করোনা পরিস্থিতির সঠিক চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না বলে মনে করেছেন অধ্যাপক ডা. ইকবাল কবির জাহিদ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের দেশে পরীক্ষার অভাবে ঠিক কী পরিমাণ মানুষ করোনায় আক্রান্ত, সে সংখ্যা পাচ্ছি না। আর ভাইরাস মিউটেশনের কারণে উপসর্গযুক্ত মানুষের সংখ্যা কমে যাওয়ায় প্রকৃত আক্রান্ত সংখ্যা পাচ্ছি না। ফলে বোঝা যাচ্ছে না ঠিক কী হারে সংক্রমণ ছড়াচ্ছে।

এই বিশেষজ্ঞ বলেন, যেখানেই করোনা মহামারী হয়েছে, সেখানে একবার সর্বোচ্চ চূড়ায় উঠে নেমেছে। বাংলাদেশে কখনই সেই প্রবণতা পেলাম না। আমাদের দেশে সবসময়ই একই প্রবণতা পেলাম। অথচ কোনো একটা সময় ‘পিক’ পাওয়ার কথা ছিল। সেই ‘পিক’ যদি বুঝতে পারতাম, তাহলে এখন আমরা বলতে পারতাম আস্তে আস্তে কমছে। আমাদের দেশে যে নমুনা নেওয়া হচ্ছে সেটা ইনটেনশনাল নমুনা, কারও রোগ হয়েছে, তার নমুনা। র‌্যানডম যদি পরীক্ষা করা হতো তাহলে প্রকৃত চিত্র বোঝা যেত। বাংলাদেশে করোনার সঠিক গতিপ্রকৃতি বোঝার জন্য যেসব উপাত্ত দরকার, সেগুলো সঠিক সময়ে সঠিকভাবে পাইনি। র‌্যাপিড স্ক্রিনিং হয়নি। তবে আমার ব্যক্তিগত ধারণা আমাদের দেশে ‘পিক’ হয়েছিল, আমরা সেটা ধরতে পারিনি পরীক্ষার অভাবে।