অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, বিশ্বজুড়ে করোনা মহামারীর মধ্যেও চলতি বছরের জুলাই ও আগস্ট মাসে আসা রেমিট্যান্সের মতো রপ্তানিতেও রেকর্ড হবে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সম্পদ অনেক বেশি। সেগুলোকে ধীরে ধীরে মূল স্রোতধারায় নিয়ে আসা হচ্ছে। এতে অর্থনীতির গতিশীলতা আরও বাড়বে।
গতকাল বুধবার সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানান। অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামালের সভাপতিত্বে এ ভার্চুয়াল সভায় কমিটির সদস্য, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সিনিয়র সচিব, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যোগ দেন। এর আগে অর্থমন্ত্রী জানান, বেঠকে মোট ১০টি ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। এ টাকার মধ্যে বিভিন্ন দেশীয় ব্যাংক থেকে ঋণ হিসেবে ১ হাজার ১৬৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, রেমিট্যান্স যেভাবে ওপরের দিকে এগোচ্ছে, ঠিক তেমনভাবে রেকর্ড সৃষ্টি হবে জুলাই-আগস্টের রপ্তানি বাণিজ্যে। আমি মনে করি, এটা অব্যাহত থাকবে। এ দেশের মানুষ আমাদের প্রাণশক্তি। তাদের কারণেই সব সম্ভব হবে। তারা ব্যবসা-বাণিজ্য করছেন, এর ফল তারা পাচ্ছেন। রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ার কারণ হিসেবে মুস্তফা কামাল বলেন, আমি যখন পরিকল্পনামন্ত্রী ছিলাম তখন নিজ উদ্যোগে একটি স্টাডি করেছিলাম। তাতে দেখা গেছে, ৫১ শতাংশ রেমিট্যান্স আসে বৈধপথে আর ৪৯ শতাংশ আসে অবৈধ বা হুন্ডির পথে। তখন থেকেই ভাবতে শুরু করলাম যে শতভাগ রেমিট্যান্স বৈধপথে আনতে হবে। তিনি বলেন, আমরা চাই প্রবাসে আমাদের কর্মীরা যে পরিমাণ আয় করেন তার পুরোটাই বৈধপথে দেশে আসুক। সেজন্য আমরা দুটি কাজ করি। একটি হচ্ছে রেমিট্যান্সে ২ শতাংশ হারে প্রণোদনা দেওয়া। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে বৈধপথে রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রক্রিয়া সহজ করা।
করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের জন্য প্রধানমন্ত্রী ১ লাখ কোটি টাকারও বেশি প্রণোদনার ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু এসএমই উদ্যোক্তারা কোনো লোন পাচ্ছেন না। এ প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, আমরা চাই ক্যাশ ট্রান্সফার। যাদের অ্যাকাউন্ট নেই, তাদের আমরা স্বীকার করি না বা করতে পারি না। এর ফলে যার টাকা পাওয়ার কথা তার হাতে গিয়ে টাকা পৌঁছায় না। আমরা এগুলো দূর করতে চাই। তিনি বলেন, আজকে যারা স্মল, এক দিন তারা মিডিয়াম হবে, এরপর তারা লার্জ হবে, এটাই নিয়ম। আমি বলব, যাদের অ্যাকাউন্ট আছে এবং ব্যবসা করে, এটা প্রমাণ করে আবেদন করলে আমরা তাদের যতটা সহায়তার দরকার করব। তাদের সহায়তার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে আলাদা উইং আছে। সুতরাং প্রধানমন্ত্রী যে ঘোষণা দিয়েছেন, এর বাইরে কেউ থাকবে না। তিনি নিজেও এগুলো তদারকি করেন। ফলে এবার হইচই কম হয়েছে। সবাই সরাসরি সহায়তা পাচ্ছে।
১০ প্রকল্পে ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন : সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি গতকাল ১০টি প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। এর মধ্যে এলএনজি আমদানিসংক্রান্ত প্রস্তাব রয়েছে। এতদিন কয়েকটি দেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানি করত সরকার। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে আমদানি করায় এ ক্ষেত্রে দর কষাকষির তেমন সুযোগ ছিল না। তবে এবার প্রথমবারের মতো স্পট মার্কেট তথা খোলাবাজার থেকে এলএনজি আমদানির একটি ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন করেছে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। এর ফলে সাশ্রয়ী মূল্যে এলএনজি আমদানি সম্ভব হবে বলে মনে করছে সরকার।
বৈঠক শেষে ভার্চুয়াল ব্রিফিংয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের আওতায় পেট্রোবাংলা কর্তৃক সিঙ্গাপুরের ভাইটোল এশিয়া পেট্রোলিয়ামের কাছ থেকে ৩৪ লাখ ৪৯ হাজার ২০০ এমএমবিটিই এলএনজি আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে খরচ হবে ১৩২ কোটি ৯৩ লাখ টাকা।
এ প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, আমরা এবারই প্রথম স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনছি। এর আগে আমরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লংটার্ম চুক্তির মাধ্যমে কিনতাম। কিন্তু এবারই প্রথম স্পট মার্কেটে গেলাম। এটা নতুন একটা উইন্ডো আমাদের জন্য খোলা হলো। আমি মনে করি এখান থেকে সবসময় কম্পিটিটিভ প্রাইসে (প্রতিযোগিতামূলক মূল্য) এলএনজি ক্রয় করতে পারব।
অন্যদিকে পুলিশ সদস্যদের আবাসন সমস্যা কাটাতে ঢাকা ও চট্টগ্রামের দুটি ২০ তলা ভবন নির্মাণ করছে সরকার। এতে ব্যয় হবে ১৬৪ কোটি ৮ লাখ টাকা। মরক্কো ও কাফকো থেকে ৩ লাখ ৬০ হাজার মেট্রিক টন সার আমদানির প্রস্তাব অনুমতি দিয়েছে কমিটি। এছাড়া কাফকোর কাছ থেকে ৩০ হাজার টন ব্যাগড গ্র্যানুলার ইউরিয়া সার কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ১৬৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকা।
ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের জন্য বহুতলবিশিষ্ট ভবন ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণে ডেভেলপমেন্ট ডিজাইন কনসালট্যান্টস লিমিটেডকে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ ২০২২-এর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২৪ মাস বৃদ্ধি করা হয়েছে। এজন্য ব্যয়ও বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ।
বৈঠকে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের শতভাগ পল্লী বিদ্যুতায়নের জন্য বিতরণ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে কনটেক কন্সট্রাকশন লিমিটেড থেকে ১ লাখ ১৯ হাজার ২১২টি এসপিসি পোল ক্রয়ের প্রস্তাব অনুমোদন পায়। এতে মোট ব্যয় হবে ১৫৯ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে রাজশাহী, রংপুর, খুলনা ও বরিশাল অঞ্চলে।
বৈঠকে মোংলা বন্দর চ্যানেলের আউটারবার প্রকল্প এলাকায় প্রায় ৪১ দশমিক ৯৫ লাখ ঘনমিটার অতিরিক্ত ড্রেজিং করার জন্য হংকং রিভার ইঞ্জিনিয়ারিং এবং চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কন্সট্রাকশন করপোরেশনের সঙ্গে সংশোধিত চুক্তি সম্পাদনের অনুমোদন দেওয়া হয়। এতে ভেরিয়েশন বাবদ অতিরিক্ত ব্যয় হবে ৮৮ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। এ নিয়ে মোট খরচ ৬৮০ কোটি ৬৮ লাখ টাকা দাঁড়িয়েছে।