চাহিদা অনুযায়ী টাকা না পেয়ে বন্দুকযুদ্ধের নামে চারজনকে হত্যার অভিযোগে কক্সবাজারের টেকনাফ থানার বরখাস্ত হওয়া ওসি প্রদীপ কুমার দাশের বিরুদ্ধে আদালতে আরও তিনটি মামলার আবেদন জমা পড়েছে। গতকাল বুধবার কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের আদালতে ভুক্তভোগীদের পরিবারের সদস্যরা এসব অভিযোগ জমা দেন। এর মধ্যে কক্সবাজারের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (টেকনাফ-৩)হেলাল উদ্দীনের আদালতে টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নে মুছা আকবর ও সাহাব উদ্দিন নামে দুই যুবককে ক্রসফায়ারের নামে হত্যার অভিযোগে প্রদীপসহ ৫৩ জনের বিরুদ্ধে দুটি মামলা নথিভুক্তের আবেদন করা হয়েছে। কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত মুছা আকবরের স্ত্রী শাহেনা আকতার ও সাহাব উদ্দিনের বড় ভাই হাফেজ আহামদ বাদী হয়ে এ দুটি আবেদন করেন। আদালত অভিযোগ দুটি আমলে নিয়ে টেকনাফ থানার ওসিকে প্রতিবেদন দাখিলের আদেশ দিয়েছে।
অন্যদিকে চট্টগ্রামের চন্দনাইশ থেকে দুই ভাইকে ধরে নিয়ে গিয়ে টেকনাফে বন্দুকযুদ্ধের নামে হত্যার অভিযোগে প্রদীপ কুমার দাশসহ পাঁচ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন হয়েছে চট্টগ্রামের আদালতে। গতকাল দুপুরে চট্টগ্রামের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কামরুন নাহারের আদালতে অভিযোগটি জমা দেন নিহতদের বোন জিনাত সুলতানা শাহীন। আদালত অভিযোগ আমলে নিয়ে তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য আনোয়ারা সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দিয়েছে। এ নিয়ে বরখাস্ত পুলিশ কর্মকর্তা প্রদীপের বিরুদ্ধে বন্দুকযুদ্ধের নামে হত্যার অভিযোগে আদালতে আটটি অভিযোগ জমা পড়ল। এর সবকটিতেই এখনো তদন্ত প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছে আদালত।
কক্সবাজারের আদালতে করা দুটি মামলার আবেদনের মধ্যে একটিতে হোয়াইক্যং পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মশিউর রহমানকে প্রধান ও প্রদীপ কুমার দাশকে ২ নম্বর আসামি করা হয়েছে। অন্যটিতে এসআই দীপক বিশ্বাসকে প্রধান এবং প্রদীপকে ৩ নম্বর আসামি করা হয়েছে।
নিহত মুছা আকবরের স্ত্রী শাহেনা আকতারের অভিযোগে বলা হয়েছে, গত ২৭ ফেব্রুয়ারি মুছা আকবরের বড় ভাই আলী আকবরের বাড়ি পুড়িয়ে দেয় টেকনাফ থানার একদল পুলিশ সদস্য। এ ঘটনায় কক্সবাজার প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে তাদের পরিবার। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে গত ২৮ মার্চ রাতে মুছাকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। পরে ‘ক্রসফায়ারে’ দেওয়ার ভয় দেখিয়ে মুছার পরিবারের কাছে ২০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। ৩ লাখ দিতে সমর্থ হয় মুছার পরিবার। কিন্তু ৩ লাখ টাকা নিয়েও ওইদিন ভোরে মুছাকে ক্রসফায়ারের নামে গুলি করে হত্যা করা হয়।
বাদীপক্ষের আইনজীবী রিদুয়ান আলী জানান, অভিযোগটি আমলে নিয়েছে আদালত। এছাড়া ওই ঘটনায় থানায় কোনো মামলা আছে কি না তা টেকনাফ থানার ওসিকে আগামী ১০ কার্যদিবসের মধ্যে আদালতকে জানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে নিহত সাহাব উদ্দিনের বড় ভাই হাফেজ আহামদের করা অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালের ১৭ এপ্রিল টেকনাফ থানার এসআই দীপক বিশ্বাসের নেতৃত্বে একদল পুলিশ সাহাব উদ্দিনকে তার বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়। পরে ‘ক্রসফায়ারে’ দেওয়ার ভয় দেখিয়ে তার পরিবারের কাছে ৫ লাখ টাকা দাবি করা হয়। সাহাবের পরিবার ৫০ হাজার টাকা দেয়। বাকি সাড়ে ৪ লাখ টাকা না পেয়ে ২০ এপ্রিল রাতে ক্রসফায়ারের নামে সাহাবকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
এ মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী শাহা আলম জানান, অভিযোগটি আমলে নিয়েছে আদালত। এছাড়া ওই ঘটনায় থানায় কোনো মামলা আছে কি না তা আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে আদালতকে জানাতে টেকনাফ থানার ওসিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে চট্টগ্রামে করা মামলার আরজিতে বলা হয়েছে, ৮ লাখ টাকা চাঁদার দাবিতে বাদী জিনাত সুলতানার দুই ভাইকে চন্দনাইশ থেকে মাদক কারবারি আখ্যা দিয়ে ধরে নিয়ে গিয়ে ক্রসফায়ারের নামে হত্যা করা হয়। গত ১৩ জুলাই বাদীর ভাই আজাদকে চন্দনাইশ থানা পুলিশের সহায়তায় বাসা থেকে ধরে নিয়ে যান টেকনাফ থানার তৎকালীন ওসি প্রদীপসহ অন্য পুলিশ সদস্যরা। এরপর ১৫ জুলাই বাদীর আরেক ভাই ফারুকের বাসায় পুলিশ গিয়ে তল্লাশি করে কিছু না পেয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের কথা বলে নিয়ে যায়। ৮ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে ওই দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে মাদক মামলা দেয় পুলিশ। পরে চাঁদার টাকা না পেয়ে আজাদ ও ফারুককে ক্রসফায়ারের নামে হত্যা করা হয়।
সিনহা হত্যা মামলায় তিনজনের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি : অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান নিহতের ঘটনায় পুলিশের করা মামলার তিন সাক্ষী আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। গতকাল কক্সবাজারের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে জবানবন্দি দেওয়ার পর বেলা ৩টার দিকে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়। এর আগে তারা জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম তামান্না ফারাহর খাস কামরায় জবানবন্দি দেন। তারা হলেন টেকনাফের মারিশবুনিয়া এলাকার নুরুল আমিন, নিজামউদ্দিন ও মো. আয়াছ।
গত ৩১ জুলাই রাতে টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা।