আ.লীগ সম্পাদকমন্ডলীর সভায় প্রধানমন্ত্রী

বিশ্বব্যাংক সংকটেও পাশে ছিলেন প্রণব মুখার্জি

দেশের মানুষকে নিয়েই আওয়ামী লীগের চিন্তা ও কাজ উল্লেখ করে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘দেশের মানুষ কীভাবে একটু ভালো থাকবেসেটাই আমাদের করতে হবে।’ এজন্য দলটির কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যায়ের সব নেতাকর্মীকে কাজ করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। গতকাল বুধবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলটির সম্পাদকমণ্ডলীর বৈঠকে এসব কথা বলেন শেখ হাসিনা। গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি সভায় যোগ দেন তিনি। নেতাকর্মীদের উদ্দেশে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ‘বাংলাদেশের আনাচেকানাচে আমাদের সংগঠনের নেতাকর্মীরা আছে। আমাদের মানুষকে নিয়েই চিন্তা, মানুষকে নিয়েই আমাদের কাজ। সেটাই আমাদের করতে হবে। আমি আশা করি, সকলেই আন্তরিকতার সঙ্গে সেই কাজ করবে। আমাদের জাতির পিতার আদর্শ নিয়েই চলতে হবে। তিনি বাংলাদেশকে নিয়ে যে স্বপ্ন দেখেছিলেন তা আমরা পূরণ করতে চাই।’

তিনি বলেন, ‘আমরা মুজিববর্ষ উদযাপন করছি, যদিও যে কর্মসূচিগুলো নিয়েছিলাম তা পালন করতে পারছি না করোনাভাইরাসের কারণে। যদিও আমরা লক্ষ্য স্থির করেছি, আমরা গাছ লাগাব প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায়। আর দেশের মানুষের পাশে আমরা দাঁড়াব। যাতে গৃহহারা, ভূমিহীন বিশেষ করে ভূমিহীনদের ভূমি ও গৃহ আমরা নির্মাণ করে দেব।’

সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘প্রত্যেকে যার যার নিজ নিজ বিষয়ভিত্তিক দায়িত্বটা পালন করা দরকার। জাতির কাছে আমাদের দেওয়া কী কী প্রতিশ্রুতি এই পর্যন্ত আমরা রক্ষা করতে পেরেছি বা কোনটা কতটুকু করা হয়েছে বা ভবিষ্যতে কতটুকু করব সেই বিষয় আলোচনা করা।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা প্রথমবার ২০১০ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ১০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছিলাম। এবার আমরা নিয়েছি ২০২১ থেকে ২০৪১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশকে আমরা কীভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইসেই পরিকল্পনাগুলো আমাদের দলের প্রতিটি নেতাকে দেওয়া উচিত, দেখা উচিত। আমাদের যারা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য আছেন তারা যার যার বিষয়গুলো দেখে নিয়ে সেটার ওপর কাজ করলে আমরা অনেকখানি এগিয়ে যেতে পারব। দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারব।’

করোনাভাইরাস চলাকালে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য আওয়ামী লীগ, সহযোগী এবং ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতাকর্মীদের ধন্যবাদ জানান দলীয় সভাপতি। তিনি বলেন, ‘করোনাভাইরাসের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, তাদের ত্রাণ দেওয়া, ধানকাটার সময় ধান কেটে কৃষকের ঘরে পৌঁছে দেওয়া, বন্যার সময় ত্রাণসামগ্রী নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো এ ধরনের কাজ আমাদের সবাই করেছে। এই জন্য সবাইকে ধন্যবাদ দিচ্ছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সংগঠনটাকে আরও সুসংগঠিত করতে হবে। করোনাভাইরাসের কারণে সম্মেলন হওয়া সত্ত্বেও আমাদের বিভিন্ন জেলার পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়নি, সেই কমিটিগুলো যাতে তাড়াতাড়ি হয় সেই ব্যবস্থা নিতে হবে।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘সামনে একটা উপনির্বাচন আছে। সেই নির্বাচনে জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস আমাদের ওপর রয়েছে। সব জায়গায় আওয়ামী লীগের ভোট অনেক বেশি। সেখানে দল ঐক্যবদ্ধ থেকে যাতে আমাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করেন সেটাও নিশ্চিত করতে হবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিকে ঘিরে সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি আগেও বলেছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিটাকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে চাই। সম্পূর্ণ আধুনিকভাবে টিএসসি প্রতিষ্ঠা করব। সেভাবে নতুন করে ডিজাইন ও প্ল্যান করে করব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির সঙ্গে কথা বলেছিলাম, আমি জানি বিশ্ববিদ্যালয় এটা করতে পারবে না। আমিতো এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী, জাতির পিতাও এখানকার ছাত্র ছিলেন। কাজেই এটা আমরাই করে দেব। সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘ঢাকা মেডিকেল কলেজটাকেও আমরা খুব সুন্দরভাবে করতে চাই। কারণ এই একটাই জাতীয় প্রতিষ্ঠান যাতে সারা বাংলাদেশ থেকে মানুষ চিকিৎসার জন্য আসে। কাজেই সেখানে যাতে ৫ হাজার রোগীর চিকিৎসা হতে পারে, সেইভাবে এটাকে আমরা নতুনভাবে গড়ে তুলতে চাই। পুরানো ঐতিহ্য কিছুটা আমরা ধরে রাখতে পারি সামনের ডিজাইন অনুযায়ী। কিন্তু ভেতরে সম্পূর্ণ আধুনিক একটা হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ আমরা নির্মাণ করব। ইতিমধ্যে সেই প্ল্যান তৈরি করা আছে। সেটার কাজ যাতে দ্রুত হয় তার ব্যবস্থা আমরা করতে চাই।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘ময়মনসিংহ নতুন বিভাগীয় শহর। সেখানে নতুন প্ল্যান কীভাবে হবে সেগুলোর বিষয়ে আমরা বলেছি। আমাদের প্রশাসন ক্যাডারদের ট্রেনিং ইনস্টিটিউট খুবই পুরানো ও জরাজীর্ণ, সেখানে একটা নতুন প্ল্যানও নতুন ডিজাইন আমরা করে দিতে চাচ্ছি। তার প্ল্যানটাও আমি দেখে অনুমোদন দিয়ে দিলাম। সেই সঙ্গে পাবলিক লাইব্রেরিটাকে আরও একটু আধুনিক লাইব্রেরি করতে চাই। কারণ এটা অনেক পুরানো এবং জরাজীর্ণ। বিশেষ করে মিলনায়তনটা খুবই খারাপ অবস্থায় আছে। যাতে এটা আধুনিক লাইব্রেরি গড়ে তোলা যায়, যেখানে ডিজিটাল লাইব্রেরি হবে। আবার এই লাইব্রেরিও থাকবে। সেখানে সুন্দর একটা সাইবার ক্যাফেরও ব্যবস্থা থাকবে, যাতে আমাদের ছেলেমেয়েরা সেখানে বসতে পারে।’

আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ‘করোনার কারণে সবার সঙ্গে দেখা হচ্ছে না। তোমরা কাজ করে যাও। আমি সীমিত আকারে ভাগে ভাগে মিটিং করব। প্রথমে একটা সভাপতিমণ্ডলীর মিটিং করব। তারপর কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠক করব। তারপর উপদেষ্টা পরিষদের মিটিং করব। আলাদা আলাদাভাবে মিটিংগুলো করব। এটা আমাদের পার্লামেন্ট সেশনের পরেই আমরা শুরু করব। করোনাভাইরাস আমাদের যথেষ্ট ক্ষতি করে যাচ্ছে। তারপরও আমরা আমাদের অর্থনীতিকে ধরে রাখতে পারছি।’

ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির মৃত্যুতে শোক জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তিনি বাংলাদেশের একজন অকৃত্রিম বন্ধু ছিলেন। সবচেয়ে বড় কথা হলো যেকোনো দুঃসময়ে তিনি আমাদের পাশে ছিলেন। আমি এইটুকু অন্তত বলতে পারি, পঁচাত্তরের পর আমরা যখন দিল্লিতে ছিলাম তখন তিনি (প্রণব মুখার্জি) ও তার পরিবার আমাদের দেখাশোনা, সব বিষয়ে সহযোগিতা করেছে। এর পরবর্তীতেও বিভিন্ন দুঃসময়ে সবসময় তিনি আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। বিশেষ করে পদ্মা সেতু নিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে যখন বিশ্বব্যাংক লাগল, ওয়ান-ইলেভেনে যখন আমি গ্রেপ্তার হলাম, আমার প্রতি মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করার চেষ্টা হয়েছে সেই সময়ও তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের পক্ষে ও আমার মুক্তির জন্য অনেক কাজ করে গেছেন। সেক্ষেত্রে ভারতের সরকার ও প্রণব মুখার্জি নিজেই উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তাছাড়া ১/১১ সময়ে যখন আমি বন্দিখানায় তখনও সবসময় খোঁজখবর নেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘তাকে আমরা সবসময় পাশে পেয়েছি। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ভারত আমাদের স্বীকৃতি দিয়েছে, সেখানেও তার ভূমিকা ছিল। আবার ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পরে যারা আশ্রয় নিয়েছিল তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তার অবস্থান শুধু ভারতে না, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তার একটা অবস্থান ছিল এবং আমাদের পাশে তিনি সবসময়ই ছিলেন। তিনি একজন প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ, লেখাপড়া জানতেন।’

এর আগে ভার্চুয়াল আলোচনার শুরুতে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ করে সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আমরা আমাদের সভাপতির একটা গাইডলাইন চাই। আমরা নিজেরা কিছু বিষয় আলোচনা করেছি। এর মধ্যে রয়েছে আমাদের যে সকল জেলা, মহানগর ও সহযোগী সংগঠনের সম্মেলন হয়েছে তাদের আগামী ১৫ তারিখের মধ্যে আপনার অফিসে (সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়, ধানমণ্ডি) পূর্ণাঙ্গ কমিটি জমা দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছি। আরেকটি হলো, এই সময়ের মধ্যে প্রত্যেক সম্পাদককে চেয়ারম্যানের সঙ্গে পরামর্শ করে ৩৫ সদস্যবিশিষ্ট উপকমিটি গঠনের রিকমেন্ডেশন তৈরি করেছি, সিদ্ধান্ত নেওয়ার মালিক আপনি।’

তিনি বলেন, ‘আর আমরা সীমিত আকারে সাংগঠনিক কর্মসূচি এখন থেকে পালন করার জন্য তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত একটি নির্দেশনা দিচ্ছি। আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর আপনার জন্মদিন। এটা আমরা খুব সীমিত আকারে পালন করব। এটা প্রতিবছরই করে থাকি। আপনি না বললেও করব।’

জবাবে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমার জন্মদিন পালনের প্রস্তাব আমি গ্রহণ করছি না। বাকিগুলোর মধ্যে সাব-কমিটিগুলো পূর্ণাঙ্গ করার সিদ্ধান্ত খুবই ভালো, এটা করা উচিত। যাতে সাব-কমিটিগুলো বসতে পারে বিষয়ভিত্তিক সেমিনার করা, আলোচনা করা। আমাদের ভবিষ্যৎ কর্মসূচি সেগুলো ঠিক করা। সাব-কমিটিগুলো এ ব্যাপারে যথযথ ব্যবস্থা নিতে পারবে।’

ওবায়দুল কাদেরের সভাপতিত্বে বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য মাহবুব-উল আলম হানিফ, দীপু মনি, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, বিএম মোজাম্মেল হক, মির্জা আজম, আফজাল হোসেন, অসীম কুমার উকিল, ফরিদুন্নাহার লাইলী, বিপ্লব বড়ুয়া, শাম্মী আহমেদ, ওয়াসিকা আয়েশা খান, আমিনুল ইসলাম, সায়েম খান প্রমুখ।

এই বন্ধ হচ্ছে সব থেকে ভালো সময় কাজ করবার : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, এখন যেহেতু (করোনাকাল) বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ, সবই বন্ধ। তার মানে এটাই হচ্ছে সব থেকে ভালো সময় কাজ করবার। নিরিবিলি কাজগুলো করা যেতে পারে। গতকাল গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বিপিএটিসির প্রশিক্ষণ সক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ প্রকল্পের ২০ তলাবিশিষ্ট ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক ভবন’-এর নকশা এবং ‘ময়মনসিংহ বিভাগীয় সদর দপ্তর স্থাপনের জন্য প্রস্তাবিত প্ল্যানের ভূমি ব্যবহার’ পরিকল্পনার উপস্থাপনার সময় এসব কথা বলেন তিনি।

চলমান প্রকল্পগুলো দ্রুত শেষ করার তাগিদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘করোনাভাইরাসের কারণে আমাদের অনেক কাজ স্থবির। কিন্তু আমরা এই কাজগুলো যদি শুরু করতে পারি, তাহলে শেষ করতেও পারি খুব তাড়াতাড়ি। আর এর জন্য যা অর্থ সংকুলান, সরকার থেকেই আমরা করে দেব। আমি দিতেও চাই। কিন্তু কাজগুলো আমি চাচ্ছি একটু তাড়াতাড়ি এগিয়ে যাক।’

আগামীর বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এই দেশটাকে আমরা সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে চাই এবং আমরা স্বাধীন দেশ ও স্বাধীন জাতি। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমরা চলতে চাই। জাতির পিতার যে স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশ উন্নত ও সমৃদ্ধ হোক বিশ্বসভায় মাথা উঁচু করে চলবে; আমরা সেভাবেই বাংলাদেশটাকে গড়ে তুলতে চাই। আজ বঙ্গবন্ধু নেই। তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এইটুকু বলব তার আকাক্সক্ষা পূরণ করতে হবে।’