মাঝরাতে শোয়ার ঘরে হামলা জীবন সংকটে ইউএনও

দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে গভীর রাতে বাসায় ঢুকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াহিদা খানম ও তার বাবার ওপর হামলা হয়েছে। গত বুধবার রাতের কোনো একসময় অজ্ঞাতপরিচয় দুই দুর্বৃত্ত সরকারি বাসভবনের শৌচাগারের ভেন্টিলেটর ভেঙে শয়নকক্ষে ঢুকে ভারী কোনো বস্তু দিয়ে ইউএনও ওয়াহিদার মাথা ও মুখমণ্ডলে এলোপাতাড়ি আঘাত করে। এ সময় তাকে রক্ষা করতে গেলে বাবা ওমর আলীকে কুপিয়ে জখম করে হামলাকারীরা। গুরুতর আহত বাবা-মেয়েকে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে উদ্ধার করে প্রথমে ঘোড়াঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তাদের পাঠানো হয় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এরপর সংকটাপন্ন ইউএনও ওয়াহিদাকে বিমানবাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে ঢাকায় আনা হয়। সেখান থেকে বেলা ৩টার দিকে  নেওয়া হয় ঢাকার আগারগাঁওয়ের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালে।

ইউএনও ওয়াহিদার অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির চিকিৎসকরা। গতকাল রাত ৯টার পর অস্ত্রোপচারের জন্য তাকে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হয়। এরপর দুই ঘণ্টা ধরে অস্ত্রোপচারের পর চিকিৎসকরা জানান, তাকে পরবর্তী ৭২ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে রাখা হবে।

এদিকে ওয়াহিদার বাবা ওমর আলী (৬০) বর্তমানে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি আছেন। ওয়াহিদার স্বামী মেজবাহুল হোসেন রংপুরের পীরগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলে জানা গেছে।

ঘোড়াঘাট উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় পুলিশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বুধবার রাত আড়াইটার দিকে ইউএনও ওয়াহিদার সরকারি বাসভবনের শৌচাগারের ভেন্টিলেটর কেটে দুর্বৃত্তরা তার শয়নকক্ষে ঢুকে পড়ে। এর আগে দুর্বৃত্তরা ওই বাসভবনের নিরাপত্তা প্রহরীকে বেঁধে প্রহরীকক্ষে তালা দিয়ে আটকে রাখে। ইউএনওর বাবা ওমর আলী প্রতিদিন সকালে হাঁটতে বের হন। কিন্তু গতকাল সকালে তিনি হাঁটতে বের না হওয়ায় সঙ্গীরা তার খোঁজ নেওয়ার জন্য বাসভবনে যান। অনেক ডাকাডাকি করেও কোনো সাড়া না পেয়ে তারা পুলিশে খবর দেন। পরে পুলিশ গিয়ে ইউএনও, তার বাবা ও প্রহরীকে উদ্ধার করে। এরপর ইউএনও ওয়াহিদা ও তার বাবাকে গুরুতর অবস্থায় প্রথমে ঘোড়াঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তাদের পাঠানো হয় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখান থেকে ইউএনও ওয়াহিদা খানমকে রংপুর কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়া হয়। এরপর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় পাঠানো হয়।

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান তোফায়েল হোসেন ভূঁইয়া জানান, ইউএনও ওয়াহিদার মাথার বাম দিকে বেশি আঘাত লেগেছে। এতে তার প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে। ধাতব কোনো বস্তু দিয়ে তার মাথায় আঘাত করা হয়েছে। এর ফলে তার শরীরের ডান দিক অবশ হয়ে গেছে।

হামলার বর্ণনা দিতে গিয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ওমর আলী (ওয়াহিদার বাবা) দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি ভোর সাড়ে ৪টার দিকে নামাজ আদায় করতে উঠে পাশের ঘর থেকে মেয়ের চিৎকার শুনতে পাই। সেখানে যাওয়ার চেষ্টা করলে একজন মুখে কাপড় বাঁধা অবস্থায় এসে আমাকে ভয় দেখিয়ে আলমারির চাবি চায়। বলে যে না দিলে মেরে ফেলা হবে। এরপর হাতুড়ি দিয়ে আমার মাথায় আঘাত করলে আমি লুটিয়ে পড়ি। এরপর আর কিছু মনে নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘ঘোড়াঘাটে মেয়ে একা থাকে। জামাতা রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার ইউএনও। মেয়ের সঙ্গে তিন বছর বয়সী নাতি থাকে। এ উপজেলায় আড়াই বছর ধরে মেয়ের সঙ্গে থাকছি। মাঝেমধ্যে নওগাঁর মহাদেবপুরের বাড়িতে যাই। আমার মেয়েকে কেউ কোনো হুমকি দিয়েছে কি না, তা আমার জানা নেই।’

একজন পিপিই পরে, আরেকজন মুখ ঢেকে হামলায় অংশ নেয় : ওয়াহিদা খানম ও তার বাবার ওপর হামলায় কমপক্ষে দুজনের অংশ নেওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে কারা এবং কী উদ্দেশ্যে হামলা চালিয়েছে সে ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ইউএনওর বাসভবনের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, হামলায় অংশ নেয় দুজন। এদের মধ্যে একজনের মুখে কাপড় বাঁধা এবং অন্যজন পিপিই (পার্সোনাল প্রটেকটিভ ইকুইপমেন্ট) পরা ছিল। রাতে তারা এক এক করে ইউএনওর বাসভবনে প্রবেশ করে এবং ঘটনার পর একই সঙ্গে বের হয়ে যায়। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে রংপুরের বিভাগীয় কমিশনার ওয়াদুদ ভুঁইয়া ও পুলিশের রংপুর অঞ্চলের ডিআইজি দেবদাস ভট্টাচার্য এসব তথ্য জানান। এর আগে একই ধরনের কথা জানান ঘটনাস্থলে উপস্থিত প্রশাসনের অন্য কর্মকর্তারা। ওই সিসিটিভি ফুটেজ ধরেই তদন্তে এগোচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।

ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর পুলিশের রংপুর অঞ্চলের ডিআইজি দেবদাস ভট্টাচার্য সাংবাদিকদের বলেন, ‘এটা একটা ফৌজদারি অপরাধ। এ ঘটনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যত ইউনিট আছে সবাই মাঠে নেমেছে এবং তদন্ত করছে। আমাদের এখন মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে দ্রুত সময়ের মধ্যে আসামিকে ধরে আইনের আওতায় আনা।’

সিসিটিভি ফুটেজের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে এখনো কাউকে আটক করা হয়নি। সিসিটিভি ফুটেজের বিষয়ে তদন্তের স্বার্থে এখন কিছু বলা যাচ্ছে না। এ মামলার যে তদন্তকারী কর্মকর্তা তিনি সব বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েই তদন্ত পরিচালনা করবেন। তবে সিসিটিভি ফুটেজে বাড়ির ভেতরে দুজনকে দেখা গেছে। তার মধ্যে একজন ছিল পিপিই পরা আরেকজন মুখ ঢাকা। তবে এ দুজন বা আরও বেশি কেউ ছিল কি না এটা নিশ্চিত হওয়ার জন্য আমরা সিসিটিভি ফুটেজ আরও ভালোভাবে দেখছি।’

ইউএনওর ওপর হামলা ডাকাতির ঘটনা নয় : ইউএনওর ওপর হামলার খবর পেয়ে গতকাল সকালে দিনাজপুর-৬ আসনের সাংসদ শিবলী সাদিক, জেলা প্রশাসক মো. মাহমুদুল আলম ও পুলিশ সুপার মো. আনোয়ার হোসেন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। সেখানে সাংসদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘এটি কোনো ডাকাতির ঘটনা নয়। কারণ ঘরের কোনো মালামাল খোয়া যায়নি। তাকে মেরে ফেলার উদ্দেশ্যেই এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে বলে আমার ধারণা।’ তিনি আরও বলেন, ‘এ উপজেলায় বড় কোনো শিল্পকারখানা নেই। অধিকাংশই কৃষক। স্থানীয়ভাবে তার শত্রু থাকার কথা নয়।’

ঘোড়াঘাট থানার ওসি আমিরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঘটনার কারণ জানার জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি। তবে কী কারণে ইউএনও এবং তার বাবার ওপর সন্ত্রাসীরা হামলা করেছে তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।’

ওয়াহিদার অবস্থা আশঙ্কাজনক হলেও অস্ত্রোপচার ‘আশাব্যঞ্জক’ : অস্ত্রোপচারের জন্য ওয়াহিদা খানমকে গতকাল রাত ৯টার পর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হয়। এর আগে তার সিটি স্ক্যান ও রক্তচাপ পরীক্ষা করা হয়। হাসপাতালে উপস্থিত ওয়াহিদার সহকর্মীরা দেশ রূপান্তরকে এ তথ্য জানান।

অস্ত্রপচারের আগে নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. কাজী দীন মোহাম্মদ বলেন, ওয়াহিদা খানমের শারীরিক অবস্থা সংকটাপন্ন। হাতুড়ির আঘাতে তার মাথায় দেড় ইঞ্চি পরিমাণ গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে। তিনি নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের আইসিইউতে অধ্যাপক ডা. জাহিদুর রহমানের অধীনে চিকিৎসাধীন।

তবে অস্ত্রোপচার শেষে ওয়াহিদার পরিস্থিতি ‘আশাব্যঞ্জক’ বলে উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা। রাত ৯টা ২০ থেকে ১১টা ১০ মিনিট পর্যন্ত ওয়াহিদার অস্ত্রোপচার চলে। ইনস্টিটিউটের উপপরিচালক অধ্যাপক ডা. বদরুল আলম সাংবাদিকদের বলেন, ‘অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হয়েছে। তবে অস্ত্রোপচার সাকসেস হয়েছে কি না, সেটা বলতে সময় লাগবে। সেটা আমরা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। তবে আশার কথা হল, অপারেশন পূর্ববর্তী ও বর্তমান সব প্যারামিটার ভালো। এটা আশাব্যঞ্জক।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা তাকে ৭২ ঘণ্টার অবজারভেশনে রেখেছি, এরপর তার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে আমরা বলতে পারব।’

উন্নত চিকিৎসার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর : ইউএনও ওয়াহিদা খানমকে উন্নত চিকিৎসা দেওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল বিকেলে রাজধানীর নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে ইউএনও ওয়াহিদা খানমকে দেখতে গিয়ে জনপ্রসাশন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন এ কথা জানান।

হামলায় জড়িতদের গ্রেপ্তারে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘স্থানীয় পুলিশ সুপার আমাদের আশ্বস্ত করেছেন। আশা করছি দ্রুত হামলাকারীদের গ্রেপ্তার সম্ভব হবে। ক্লু পেতে কাজ করছেন তারা।’ তিনি আরও বলেন, ‘চিকিৎসাধীন ওয়াহিদা খানমের সেন্স আছে এবং স্পষ্ট কথা বলতে পারছেন। তিনি হামলাকারী কাউকে চেনেন না বলে জানিয়েছেন।’

হাসপাতালে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা : ওয়াহিদা খানমের চিকিৎসার খোঁজখবর নিতে হাসপাতালে যান জনপ্রসাশন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন ও প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আহমদ কায়কাউস। গতকাল বিকেলে তারা রাজধানীর নিউরো সাইন্স হাসপাতালে ওয়াহিদাকে দেখতে যান। এ সময় জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে আরো ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব, স্বাস্থ্য সচিব আবদুল মান্নান, বিসিএস সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এলজিআরডি সচিব হেলাল উদ্দিন, অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি ও স্থানীয় সরকারের অ্যাডিশনাল সেক্রেটারি মেসবাহ উদ্দিন।

হামলার ঘটনায় মামলা : ওয়াহিদা খানমের উপর হামলার ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। গতকাল রাত সাড়ে ১১টার দিকে ঘোড়াঘাট থানায়  এ বিষয়ে এজাহার জমা দেন আক্রান্ত ইউএনও’র ভাই মো. শেখ ফরিদ উদ্দিন। এজাহারে অজ্ঞাত ৪ থেকে ৫ জনকে আসামি করেছেন তিনি। ঘোড়াঘাট থানা পুলিশ এজাহারটি আমলে নিয়ে মামলা হিসেবে লিপিবদ্ধ করেছে।

হামলার ঘটনা তদন্তে ৩ সদস্যের কমিটি : ইউএনও ওয়াহিদার ওপর হামলার ঘটনা তদন্তে অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) জাকির হোসেনকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন রংপুর বিভাগীয় কমিশনার। গতকাল রাতে দিনাজপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আবু সালেহ মো. মাহফুজুল ইসলাম এ তথ্য জানান। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন পুলিশের রংপুরের ডিআইজির একজন প্রতিনিধি এবং দিনাজপুরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আসিফ মাহমুদ।