শূন্য আসনের উপনির্বাচনে আ.লীগের প্রার্থিতা

জয় ছাড়া উত্তরাধিকারীদের কেউ মনোনয়ন পাচ্ছেন না

সিরাজগঞ্জ-১ আসনে প্রয়াত সংসদ সদস্য (এমপি) মোহাম্মদ নাসিমের অবর্তমানে ওই আসনটিতে তার ছেলে তানভীর শাকিলের দলীয় মনোনয়ন নিশ্চিত প্রায়। তবে শূন্য হওয়া বাকি চার আসনের কোনোটিতেই প্রয়াত এমপির পরিবারের সদস্য বা স্বজনদের ওপর এবার আর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ভরসা করছে না বলে জানিয়েছেন সিনিয়র কয়েক নেতা। পাবনা-৪ আসনে উপনির্বাচনে ইতিমধ্যে প্রার্থী ঘোষণা করেছে ক্ষমতাসীন দলটি। সেখানে প্রয়াত এমপি শামসুর রহমান শরীফ ডিলু পরিবারের কোনো সদস্যকে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। অথচ টানা পাঁচবার ওই আসনে এই ডিলুই এমপি হয়ে আসছেন। এবার পরিবারটির বাইরে ওই আসনের নেতৃত্ব বেছে নেওয়া হয়েছে, মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি নুরুজ্জামান বিশ্বাসকে। দলের সিনিয়র নেতারা জানিয়েছেন, ঢাকা-৫ ও নওগাঁ-৬ আসনেও প্রয়াত এমপির পরিবারের সদস্যকে মনোনয়ন দেওয়া হচ্ছে না। আসনগুলোতে প্রয়াত এমপিরা বারবার নির্বাচিত হলেও তাদের পরিবারের সদস্যদের ওপর আস্থাহারা আওয়ামী লীগ। এটিকে পারিবারিক বলয় থেকে বের হয়ে আসার স্পষ্ট ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা।

গত ৩১ আগস্ট রাতে পাবনার ওই আসনে উপনির্বাচনে জেলার সহ-সভাপতি নুরুজ্জামান বিশ্বাসকে মনোনয়ন দিয়েছে আওয়ামী লীগের সংসদীয় বোর্ড। ওইদিন অন্য আসনগুলোতেও মনোনয়ন কাকে দেওয়া হবে তা সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছেন বোর্ড সভাপতি শেখ হাসিনা। জানা গেছে, তানভীর শাকিল জয় ছাড়া প্রয়াত আর কোনো সংসদ সদস্যের পরিবারের সদস্য বা স্বজন কারও মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। পারিবারিক বলয় থেকে বেরিয়ে আসার যে রীতি দীর্ঘদিন চলে আসছিল তা থেকে এবার বেরিয়ে আসায় সারা দেশের আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা খুশি হয়েছেন এবং সাধুবাদ জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে। এই ঘটনায় সারা দেশের নেতাকর্মীদের ভেতরে উৎসাহ-উদ্দীপনাও দেখা দিয়েছে। 

কোনো এমপি প্রয়াত হলে তার পরিবারের সদস্যকেই বেছে নেওয়া হয় পরবর্তী সময়েএমন অভিযোগ মানতে নারাজ আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ফারুক খান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ ধরনের ঘটনা দু-এক জায়গায় ঘটেছে। তাছাড়া সবখানেই ব্যতিক্রম। তিনি বলেন, এবার শূন্য হওয়া আসনে কাউকে মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে আমরা আগে বিবেচনায় নিয়েছি ওই ব্যক্তির দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততা কেমন, পরিচিতি কী ও দায়িত্বপালনে দক্ষতা রয়েছে কি না? এবার বাড়তি দেখা হয়েছে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি-দুর্নাম এসব রয়েছে কি না। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে শূন্য পাঁচটি আসনে মনোনয়ন চূড়ান্ত করা হয়েছে। যোগ্যতাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে। তিনি বলেন, অমুক এমপি মারা গেছে সেখানে তার পরিবারের সদস্যকে মনোনয়ন দেওয়া হবে এমন কিছু মাথায় সেট করে রাখা হয়নি।  

আওয়ামী লীগের সংসদীয় বোর্ডের এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, পাবনায় নুরুজ্জামান বিশ্বাসকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। ওই দিনের বৈঠকেই বাকি চারটি আসনে দল কাকে মনোনয়ন দেবে তা চূড়ান্ত করে রাখা হয়েছে। তফসিল ঘোষণা করা হলেই আমরা প্রার্থীর নাম ঘোষণা করব। তিনি বলেন, মনোনয়ন বোর্ডের সদস্যরা অপর চারটি আসনে কাকে মনোনয়ন দেওয়া যায় তা বিচার-বিশ্লেষণ করে বোর্ড সভাপতি শেখ হাসিনাকে জানিয়েছেন। অবশ্য, পরবর্তী সময়ে চাইলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তা পরিবর্তনও করতে পারেন।

আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাকর্মীরা বলছেন, দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে পারিবারিক বলয় ভেঙে দেওয়া হচ্ছে বলে ধারণা তৈরি হয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সর্বস্তরে। এই নিয়ে দলটির তৃণমূলে স্বস্তি দেখা দিয়েছে। দলটির তৃণমূলের নেতাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগে পারিবারিক একটি বলয় তৈরি হয়ে আছে। বাবা এমপি হলে বাবার অবর্তমানে ছেলে বা পরিবারের অন্য কাউকে বেছে নিয়ে মনোনয়ন দেওয়ার ধারা আওয়ামী লীগে পুরনো। আর দীর্ঘদিনের এই ধারার কারণে আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা তৈরি হয়েছে। পরিবারকে মনোনয়ন না দেওয়ায় হতাশায় নিমজ্জিত তৃণমূলের বড় অংশটি এখন চাঙ্গা। আশার আলো জেগেছে তাদের ভেতরে। তাদের অনেকের দাবি, বাবার অবর্তমানে ছেলে অথবা পরিবারের অন্য সদস্যকে রাজনীতিতে ‘প্রোভাইড’ করার ধারা পাল্টে গেলে নতুন নেতৃত্ব তৈরি হবে। পাশাপাশি চাঙ্গা হবে সংগঠনও।

পাবনা, গাজীপুর, বগুড়া ও মাদারীপুরের বেশ কয়েকজন তৃণমূল নেতার সঙ্গে কথা হয় দেশ রূপান্তরের এই প্রতিবেদকের। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা প্রতিবেদককে বলেন, পরিবারের সদস্যকে রাজনীতিতে উঠিয়ে আনার এক ধরনের প্রবণতা আওয়ামী লীগে দীর্ঘদিনের। অথচ দেখা যায় ওই এলাকায় আরও যোগ্য, দক্ষ ও ত্যাগী নেতা রয়েছেন, কিন্তু পারিবারিক ত্যাগ বিবেচনায় নিয়ে এমপি ও দলীয় নেতা ওই পরিবার থেকে হয়ে যান। বঞ্চিত হন অন্যরা। ফলে ওইসব অঞ্চলে একনায়কতন্ত্রও তৈরি হয়। রাজনৈতিকভাবে সংগঠন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ওঠে। পাবনার ডিলু পরিবারকে মনোনয়ন না দেওয়ার মধ্য দিয়ে অনেক দিন পর হলেও এই ধারা পরিবর্তন হচ্ছে। এটিও ইতিবাচক অনেকের কাছে।