প্রশাসনে জুনিয়ররা ক্ষুব্ধ সিনিয়ররা স্তব্ধ

দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াহিদা খানমের ওপর হামলার ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে মাঠ প্রশাসনে ও প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয়ে। তার আক্রান্তের খবর পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গেই সচিবালয়ে সিনিয়র কর্মকর্তাদের রুমে জড়ো হতে থাকেন বিভিন্ন ব্যাচের জুনিয়র কর্মকর্তারা। প্রাথমিক অবস্থায় ওয়াহিদা খানমের ওপর হামলার তীব্রতা পরিষ্কার না হলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কর্মকর্তারা ঘটনার ভয়াবহতা বুঝতে পারেন। একপর্যায়ে তাকে যখন ঢাকায় আনার সিদ্ধান্ত হয়, তখন জুনিয়র কর্মকর্তারা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। এ সময় তাদের সান্তনা দিতে দেখা যায় সিনিয়র কর্মকর্তাদের।

গতকাল বুধবার গভীর রাতে ঘোড়াঘাটের সরকারি বাসভবনে সন্ত্রাসীদের হামলায় গুরুতর আহত হন ইউএনও ওয়াহিদা খানম। তাকে কুপিয়ে জখম করা হয়েছে। ওয়াহিদাকে প্রথমে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে রংপুরে একটি ক্লিনিকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। সেখান থেকে দুপুরে হেলিকপ্টারে অচেতন ওয়াহিদা খানমকে ঢাকায় ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স অ্যান্ড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ওয়াহিদার প্রতিটি ধাপের ওপর নজর রাখছিলেন সারা দেশের মাঠ প্রশাসনে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা জুনিয়র কর্মকর্তরা। শুধু প্রশাসন ক্যাডারেরই নয়, অন্যান্য ক্যাডারের মধ্যেও ওয়াহিদার আক্রান্তের খবরে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। পুলিশ ক্যাডারের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গেছেন। পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাব, সিআইডি, পিবিআইসহ সরকারি অন্যান্য সংস্থাও কাজ করছে।

ওয়াহিদা খানমকে দেখার জন্য হাসপাতালে ছুটে যান জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন, জনপ্রশাসন সচিব শেখ ইউসুফ হারুনসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব, অতিরিক্ত সচিবসহ সরকারের বিভিন্ন পদে থাকা গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা। তাদের সঙ্গে প্রতিটি ধাপেই ছিলেন জুনিয়র কর্মকর্তারা। চিকিৎসাধীন ওয়াহিদা খানমকে দেখে হাসপাতাল থেকে বের হয়ে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘ওয়াহিদা হামলাকারী কাউকে চেনেন না। ওয়াহিদার সঙ্গে কারও কোনো ধরনের শত্রুতা ছিল না।’

ওয়াহিদা ৩১তম বিসিএসের প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা। ওই ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মাঠ প্রশাসনে ইউএনওদের নিরাপত্তা বরাবরই উপেক্ষিত ছিল। অনেক আগেই ইউএনওদের বাসার নিরাপত্তা নিাশ্চত করা দরকার ছিল। উপজেলা পর্যায়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এসব কর্মকর্তার বাসা থাকে পুরোটাই অরক্ষিত। এ সুযোগেই ওয়াহিদার ওপর হামলা হয়েছে। তবে হামলার পর তাকে দ্রুত ঢাকায় আনার সিদ্ধান্তে সিনিয়র কর্মকর্তারা প্রশংসনীয় ভূমিকা রেখেছেন; বিশেষ করে বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা পুরো পরিস্থিতির ওপর নজর রাখেন এবং যখন যা দরকার তখন তা করেছেন।’

ওয়াহিদা খানমের ব্যাচম্যাটরাও ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়েছেন। ৩১তম বিসিএস ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব আমিনুর রহমান বলেন, আমরা এ ঘটনায় গভীরভাবে মর্মাহত। ঘটনায় যারাই জড়িত তাদের চিহ্নিত করে শাস্তি দিতে হবে। ভবিষ্যতে যাতে আর এ ধরনের ঘটনা না ঘটে, সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। ওয়াহিদার দ্রুত সুস্থতাও কামনা করেন তারা।

ওয়াহিদা খানমের ওপর হামলার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন। প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের এই সংগঠন হামলার কারণ অনুসন্ধান করে দোষী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার দাবি করেছে। সংগঠনের সভাপতি ও স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ এবং মহাসচিব ও জনপ্রাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব শেখ ইউসুফ হারুনের সই করা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে গতকাল বৃহস্পতিবার এ দাবি জানানো হয়।

বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন বলছে, উপজেলা পর্যায়ে সরকারের সমন্বয়কারী হিসেবে ইউএনওরা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। একজন ইউএনওর ওপর এরূপ পাশবিক ও নির্মম হামলা খুবই দুঃখজনক ও অনভিপ্রেত। সংগঠনটি এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। একই সঙ্গে ওয়াহিদা খানমের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছে।

আনসার নিয়োগ হচ্ছে ইউএনওদের বাসভবনে : মাঠ প্রশাসনে দায়িত্ব পালনকারী ইউএনওদের নিরাপত্তায় তাদের বাসভবনে আনসার সদস্য নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন। গতকাল সন্ধ্যায় রাজধানীর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ইউএনও ওয়াহিদা খানমকে দেখে বের হয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ কথা জানান তিনি।

জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘ডিসি সম্মেলনে একটা দাবি ছিল যে ইউএনওদের জন্য নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার। সেটি প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসনেও আছে। ইতিমধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র সচিব ও জননিরাপত্তা বিভাগের সচিবের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। অর্থ সচিবের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। আগামী সপ্তাহের মধ্যে ইউএনওদের বাড়িতে পাহারা দেওয়ার মতো আনসার ব্যাটালিয়ন সদস্য নিয়োগ করা হয়, সে বিষয়টা আমরা নিশ্চিত করতে যাচ্ছি।’

বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হেলালুদ্দীন আহমদ সাংবদিকদের বলেন, ‘মাঠ প্রশাসনে কাজ করা ইউএনওদের নিরাপত্তার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়ে আছে। ইউএনওরা যেহেতু উপজেলা পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তাদের অনেক কাজ করতে হয়, যেগুলো অনেক সময় অনেকের কাছে পছন্দ না-ও হতে পারে। ইউএনও সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। অনেক লোক তাদের প্রতি বৈরী হতে পারে। তাদের নিরাপত্তার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী ইতিপূর্বে নির্দেশনা দিয়েছিলেন। সেটা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জননিরাপত্তা বিভাগকে চিঠি দিয়ে জানানো হয়েছে। সিদ্ধান্তটি এখন বাস্তবায়ন হওয়ার পথে।’

নিরাপত্তার বিষয়টি কীভাবে নিশ্চিত করা হবে জানতে চাইলে হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, ‘বাসায় হয়তো নিরাপত্তাটা নিশ্চিত করা হবে। আবার তিনি যদি কোথাও বেরও হন তাহলে নিরাপত্তার জন্য সঙ্গে থাকতে পারে। সচিব, জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারদের যেভাবে গানম্যান দেওয়া হয়, সেভাবে দেওয়া হবে না। বাসার নিরাপত্তার জন্য আনসার ব্যাটালিয়নের সদস্য নিয়োগ করা হবে।’

ইউএনও ওয়াহিদার অবস্থা সংকটাপন্ন, বিদেশে নেওয়ার পরিস্থিতিও নেই : ইউএনও ওয়াহিদা খানমের শারীরিক অবস্থার উন্নতি না হলে দেশের বাইরে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তার অবস্থার উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত অপারেশনও করা যাবে না বলে জানিয়েছেন নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের চিকিৎসকরা। মেডিকেল বোর্ডের সদস্যরা জানিয়েছেন, এ মুহূর্তে অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। ইউএনওর অবস্থা আশঙ্কাজনক। তার রক্তচাপ ও পালস স্বাভাবিক না হলে অবস্থা আরও সংকটাপন্ন হবে। তার ব্রেনে আঘাত লেগেছে। খুলি ভেঙে ঢুকে যাওয়ায় ভেতরে রক্তক্ষরণ হয়েছে। রক্তচাপ-পালসও ঠিকমতো নেই। উন্নতি হলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া যাবে।