ফকিরাপুল থেকে ছাপা হচ্ছে জাল স্ট্যাম্প ও কোর্ট ফি

দুই হাজার টাকা দামের স্ট্যাম্প ও কোর্ট ফি খুচরা বিক্রেতাদের কাছে বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৬০ থেকে ৭০ টাকায়। তবে সেগুলো আসল নয়, জাল। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সারা দেশে ছড়িয়ে দিচ্ছে এসব জাল স্ট্যাম্প ও কোর্ট ফি। এই চক্রের রয়েছে নিজস্ব এজেন্ট ও প্রেস। রাজধানীর ফকিরাপুল এলাকায় সেসব প্রেসের অবস্থান। সেখান থেকে নিখুঁতভাবে ছাপা হওয়া স্ট্যাম্প ও কোর্ট ফি যে জাল তা অনেক আইনজীবীও দেখে বুঝতে পারেন না। এমনকি খোদ ঢাকা ট্যাক্সেস বার অ্যাসোসিয়েশনের মধ্যেই বছরের পর বছর ধরে কেনাবেচা হতো এসব জাল স্ট্যাম্প ও কোর্ট ফি। কিছু আইনজীবীও কম টাকায় জাল স্ট্যাম্প ও কোর্ট ফি কিনে আর্থিক সুবিধা নিচ্ছেন। অনেকেই এই কারবার করে রাতারাতি ফুলেফেঁপে হয়েছেন কোটিপতি।

তবে সরকার হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব। জালিয়াত এসব চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হলেও জামিনে মুক্তি পেয়ে ফের একই কাজ জানা গেছে, জাল স্ট্যাম্প-কোর্ট ফি তৈরি ও বাজারজাতকরণে রাজধানীতে রয়েছে বেশ কয়েকটি চক্র। সম্প্রতি পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে এসব তথ্য। এছাড়া পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগও (ডিবি) বিভিন্ন সময়ে জাল স্ট্যাম্প উৎপাদন চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার করেছে। এর পরও থেমে নেই এসব চক্র। জাল স্ট্যাম্পের তদন্ত নিয়ে কাজ করা ডিবির একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেক আইনজীবী, ভেন্ডার ও দলিল লেখকও জড়িত এই চক্রের সঙ্গে। এদের অনেকে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে গেলেও জামিনে বের হয়ে একই কাজ করছে। সর্বশেষ গত ২৭ আগস্ট রাতে রাজধানীতে অভিযান চালিয়ে জাল স্ট্যাম্প, ডলার, কোর্ট ফি তৈরি ও বিক্রির একটি চক্রের হোতা দেওয়ান মাসুদ রানা (৩৭) ও খুচরা বিক্রেতা আলফাজ উদ্দিনকে (৬০) গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রমনা থানা। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গত ২ সেপ্টেম্বর রাতে রাজধানীর ফকিরাপুল শুক্কুর পাগলার গলির জেবি প্রিন্টার্সে অভিযান চালিয়ে জাল স্ট্যাম্প ও কোর্ট ফি ছাপানোর সরঞ্জামসহ প্রেসের কর্মী হাবিবুর রহমান (৫৫), মো. অভি (২০) ও রোজিনা আক্তারকে (৫০) গ্রেপ্তার করে পুলিশ। উদ্ধার করা হয় বিপুল পরিমাণ জাল স্ট্যাম্প, কোর্ট ফি এবং এসব তৈরির সরঞ্জাম।

পুলিশ বলছে, আলফাজ উদ্দিন গত ২৭ বছর ধরে ঢাকা ট্যাক্সেস বার অ্যাসোসিয়েশনে হিসাবরক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাকে গ্রেপ্তারের পরই মাসুদের তথ্য পাওয়া যায়। জিজ্ঞাসাবাদে আলফাজ জানান, তিনি গত ৬ থেকে ৭ মাস ধরে জাল স্ট্যাম্প ও কোর্ট ফি বিক্রি করে আসছিলেন। একসময় আসলগুলো বিক্রি করলেও মাসুদের প্ররোচনায় পরে জাল স্ট্যাম্প ও কোর্ট ফি বিক্রি শুরু করেন। অনেক আইনজীবী জেনেবুঝেই কম দামে তার কাছ থেকে এসব কিনত। ফকিরাপুলের ওই প্রেস থেকে দীর্ঘদিন ধরেই ছাপা হচ্ছিল জাল স্ট্যাম্প ও কোর্ট ফি। 

আইনজীবীরা বলছেন, ট্যাক্সেস বার অ্যাসোসিয়েশনে কোনো ভেন্ডার নিয়োগ না দেওয়ায় আলফাজ দীর্ঘদিন ধরেই অনুমতি ছাড়া কোর্ট ফি ও স্ট্যাম্প বিক্রি করতেন। নির্ধারিত দামের থেকে ১ টাকা করে বেশি নিতেন তিনি। সেগুলো আসল না জাল তা বোঝা যেত না।

ডিএমপির রমনা বিভাগের জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার (এসি) এসএম শামীম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অন্তত পাঁচ কোটি টাকা মূল্যের জাল স্ট্যাম্প, ডলার, কোর্ট ফি ও টাকাসহ প্রথমে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এই চক্রের হোতা মাসুদ। চক্রটি সরকারের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি করছে। তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। আমরা চক্রের অন্যদের ধরার চেষ্টা করছি।’

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, চক্রের হোতা মাসুদ রাজধানীর যাত্রাবাড়ী বিবির বাগিচা এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে গড়ে তোলেন জাল স্ট্যাম্প, কোর্ট ফি, ডলার ও টাকা তৈরির কারখানা। তার বাসায় এগুলো ছাপানোর প্লেট ও ফিল্ম পাওয়া গেছে। ছাপানোর কাজে সেন্টু নামে এক ব্যক্তির সহায়তা নিতেন মাসুদ। সেন্টু বিভিন্ন ছাপাখানা থেকে এগুলো ছাপিয়ে দিত। ১০ ও ৫ টাকা দামের স্ট্যাম্প বেশি ছাপাত চক্রটি। ১০ টাকা দামের ২০০ পিসের এক পাতা জাল স্ট্যাম্প ছাপাতে মাসুদের খরচ হতো ৮ থেকে ১০ টাকা। এগুলো খুচরা বিক্রেতার কাছে প্রতি পাতা বিক্রি করত ৬০ থেকে ৭০ টাকায়। এ চক্রের অন্তত ৭ থেকে ৮ সদস্যকে শনাক্ত করা হয়েছে। এদের মাধ্যমেই মাসুদ সারা দেশে ছড়িয়ে দিত জাল স্ট্যাম্প ও কোর্ট ফি।

রমনা থানায় করা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. সহিদুল ইসলাম মাসুম দেশ রূপান্তরকে জানান, মাসুদ দীর্ঘদিন ধরে জাল স্ট্যাম্প, ডলার, কোর্ট ফি, টাকা ছাপানো ও বিক্রি করে আসছে। তার বিরুদ্ধে একই অপরাধে ২০১৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিরপুর মডেল থানায় এবং ২০১৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ঢাকার আশুলিয়া থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা হয়। এসব মামলায় এর আগে গোয়েন্দা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয় মাসুদ। জামিনে মুক্তি পেয়ে ফের একই কাজ শুরু করে। সে গত ৮ বছর ধরে এ কাজ করছে বলে স্বীকার করেছে। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ফকিরাপুলের জেবি প্রেস থেকে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

জানতে চাইলে ঢাকা ট্যাক্সেস বার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সুফি মো. আল মামুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের প্রতিদিনই কোর্ট ফি লাগে। অ্যাসোসিয়েশনের হিসাবরক্ষক আলফাজ দীর্ঘদিন ধরে এগুলো বিক্রি করত। আইনজীবীরা এতদিন বুঝতে পারেনি কোনটি আসল কোনটি জাল। সম্প্রতি এক আইনজীবীর সন্দেহ হওয়াতে আলফাজকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সে জাল কোর্ট ফি ও স্ট্যাম্প বিক্রির কথা স্বীকার করায় তাকে পুলিশে সোপর্দ করা হয়। সে কোনো আইনজীবীর সম্পৃক্ততার কথা আমাদের কাছে বলেনি। যদি কোনো আইনজীবীর সম্পৃক্ততার তথ্যপ্রমাণ সে দিতে পারে, তাহলে অবশ্যই আমরা ব্যবস্থা নেব।’