দল বড় হলে সেখানে নানা ধরনের ব্যক্তির সমাবেশ ঘটে। আর দল ক্ষমতায় থাকলে তো কর্মীর কোনো অভাব ঘটে না। মধুর আশায় মৌমাছিরা যেমন একত্র হয়, ঠিক তেমনি ক্ষমতার লোভে সবাই ক্ষমতাসীন দলে ভিড় জমায়। ক্ষমতাসীন দলের সদস্য হওয়ার অনেক সুবিধা। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো যা খুশি তা-ই করার লাইসেন্স পাওয়া যায়। ক্ষমতাসীন দলের সদস্যদের সাধারণত কেউ ঘাঁটাতে চায় না। বলা তো যায় না, কার সঙ্গে ওপর মহলের কার ভালো সম্পর্ক। কিছু বললে শেষে চাকরি, পেশা ও জীবন নিয়ে টানাটানি শুরু হয়ে যায়। আর এই সুবিধাটা কাজে লাগিয়ে দেশে দুর্বৃত্তায়ন ঘটছে। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন। ক্ষমতাসীন দলের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে গড়ে ওঠা, বেড়ে ওঠা এই দুর্বৃত্তদের এখন জয়-জয়কার। দেশে কোনো অপকর্ম ঘটলে অনিবার্যভাবেই এর সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের কর্মীদের যোগ খুঁজে পাওয়া যায়। দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াহিদা খানম এবং তার বাবার ওপর হামলা চালিয়ে গুরুতর জখম করার ঘটনায়ও এর ব্যতিক্রম নয়। এখানেও ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গসংগঠন যুবলীগের ঘোড়াঘাট উপজেলার আহ্বায়ককে এই হামলায় জড়িত সন্দেহে আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বাসায় গিয়ে তাকে গুরুতর জখম করে নিরাপদে সটকে পড়ার ঘটনাটি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। দুর্বৃত্তরা যখন স্থানীয় প্রশাসনের সর্বোচ্চ ব্যক্তির গায়ে হাত তোলার সাহস পায় তখন ওই জনপদেরই কেবল নয় রাষ্ট্রের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে হয়। পরিস্থিতি কোন পর্যায়ে গেলে দুর্বৃত্তরা প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদে থাকা একজন ব্যক্তির গায়ে হাত তোলার সাহস পায়? দুর্বৃত্তরা ইউএনও ওয়াহিদাকে কুপিয়েছে তার সরকারি বাসভবনে ঢুকে। একজন ইউএনও যদি সরকারি বাসভবনে নিরাপদ না থাকেন, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার চিত্রটির কথা ভাবলে যেকোনো শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের মনেই ভীতির সঞ্চার করবে।
ঘটনার পরদিন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াহিদা খানম এবং তার বাবার ওপর হামলা চালিয়ে গুরুতর জখম করার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর আলম এবং সদস্য আসাদুল ইসলামকে যুবলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। ঘোড়াঘাট উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক জাহাঙ্গীরের ছত্রচ্ছায়ায় ইউএনও ওয়াহিদা খানমের ওপর হামলার সব কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন দিনাজপুর-৬ (হাকিমপুর, বিরামপুর, নবাবগঞ্জ ও ঘোড়াঘাট) আসনের এমপি শিবলী সাদিক। তিনি বলেছেন, ‘আসাদুল, জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব খাঁটিয়ে এলাকায় সন্ত্রাস ও মাদকের বিস্তারের একাধিক মামলা রয়েছে। এ কারণে তাদের দল থেকে বহিষ্কারসহ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আমি আড়াই থেকে তিন মাস আগে যুবলীগকে জানাই। স্থানীয় নেতাদের এবং সেন্ট্রালে একাধিকবার জানাই। স্থানীয় পর্যায় থেকেও জেলা কমিটিকে চিঠি দিয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত চিঠির কোনো রিপ্লাই আসেনি। এদের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হলো না, দেশবাসীসহ সেটা আমারও প্রশ্ন, আমিও জানতে চাই।’
এ ঘটনায় অপরাধী ও অভিযুক্তদের প্রতি দলের দৃষ্টিভঙ্গির চিত্রও প্রকাশিত হয়েছে। যদি চিহ্নিত মাদকসেবী, মাদক ব্যবসায়ী, জমি দখলকারীরা দলে পদ পায়, তাদের বিরুদ্ধে খোদ এমপি অভিযোগ করার পরও ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না, তখন সাধারণের মধ্যে একটা ভিন্ন বার্তা যায়। বার্তাটি হচ্ছে, দল খারাপ মানুষদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করে না। এখানে বরং চাঁদাবাজ, দখলবাজ, জুলুমবাজ, মাদক ব্যবসায়ী, মাদকসেবী, মামলার আসামিরাই প্রাধান্য পায়। তা না হলে ওই ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দল ব্যবস্থা গ্রহণ করবে না কেন? এর আগে অবৈধ ক্যাসিনো ব্যবসা, চাঁদাবাজি, দখল ও অর্থ পাচারের অভিযোগে যুবলীগের বেশ কয়েকজন ডাকসাইটে কেন্দ্রীয় নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার ও গ্রেপ্তার করা হয়। দলে শুদ্ধি অভিযান পরিচালনার ঘোষণা দেওয়া হয়। যুবলীগের কেন্দ্রীয় সম্মেলনে অপেক্ষাকৃত পরিচ্ছন্ন ইমেজের ব্যক্তিদের নেতৃত্বে আনা হয়। কিন্তু ওইটুকু। পরিস্থিতির আর কোনো উন্নতি হয়নি। জেলায়, উপজেলায় এমনকি ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পর্যায়ে এখনো শত শত দুর্বৃত্ত দলের নাম ভাঙিয়ে অপকর্ম করে যাচ্ছে। ঘোড়াঘাটের আসাদুল-জাহাঙ্গীর তারই সর্বশেষ উদাহরণ মাত্র।
প্রশ্ন হলো, যুবলীগের মতো একটি ঐতিহ্যবাহী দলে মাদকসেবী, চোর-ছেঁচ্চোর, চাঁদাবাজরা স্থান পায় কীভাবে? দলের নেতারা তাহলে কী করেন? রাজনৈতিক দলে নাম লিখিয়ে বিত্তবৈভব, প্রভাব-প্রতিপত্তি বাড়ানোর উৎকট প্রতিযোগিতাকেই কি তবে নেতারা প্রশ্রয় দিয়ে চলবেন?
এর আগে গেল বছরের ২০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত যুবলীগের সম্মেলনে সংগঠনের প্রধান হিসেবে দায়িত্বভার অর্পণ করা হয়েছে শেখ ফজলে শামস পরশকে। পরশ পরিচ্ছন্ন ইমেজের একজন মানুষ। বর্তমান তরুণ-যুবকরা যে রাজনীতিকে ঘৃণা করে, রাজনীতি থেকে নিজেদের দূরে রাখতে চায়, পরশ সেটা জানেন এবং সেজন্যই তিনি যুবলীগের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেওয়ার পর বলেছিলেন, “যুবসমাজ যেন ‘আই হেট পলিটিকস’ নীতি থেকে বেরিয়ে এসে ‘জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু’ বলে কাজ করতে প্রেরণা পায় সেই লক্ষ্যে তিনি কাজ করবেন।” যুবলীগ চেয়ার্যমানের এই বক্তব্য অনেকের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছিল। ভাবা হয়েছিল, এরপর সারা দেশে যুবলীগের নেতৃত্বে ও চরিত্রে বদল আসবে। মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলো বাতিল করা হবে। পরিচ্ছন্ন ইমেজের নতুন নেতা খুঁজে বের করা হবে। কিন্তু ফজলে শামস পরশ দায়িত্ব নেওয়ার পর যুবলীগে তেমন কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। অবশ্য করোনা মহামারীর কারণে ছয় মাস ধরে সারা দেশে সব ধরনের রাজনৈতিক তৎপরতাই থমকে আছে।
সমস্যা হলো রাজনৈতিক কর্মতৎপরতা থেমে থাকলেও নেতাকর্মীদের অপকর্ম থেমে নেই। লোভ আর লাভের নেশায় দলের নাম ভাঙিয়ে এই রাজনৈতিক দুর্বৃত্তরা দেশের বিভিন্ন স্থানে ঠিকই বেপরোয়া কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। ন্যূনতম নীতি-আদর্শের ধার ধারছে না। এমনকি দলের প্রধান নেত্রীর বক্তব্যও গায়ে মাখছে না। যুবলীগের সর্বশেষ সম্মেলনের উদ্বোধনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা শুদ্ধি অভিযান অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়ে বলেছিলেন, ‘কী পেলাম, কী পেলাম না, সে চিন্তা নয়, মানুষকে কতটুকু দিতে পারলাম, কতটুকু মানুষের জন্য করতে পারলাম, সেটা হবে রাজনীতিবিদের চিন্তাভাবনা। একজন রাজনীতিবিদ যে হবে, তার জীবনে ত্যাগ ও মানুষের কল্যাণের আদর্শ থাকতে হবে।’ শেখ হাসিনার অনুসারীরা তার কথা মেনে চলে শুধু পাওয়ার জন্য রাজনীতিতে না এসে কিছু দেওয়ার মনোভাবও যদি তৈরি করতেন, তাহলে আসলে রাজনীতিতে যে অপসংস্কৃতির চর্চা হচ্ছে, তা দূর হয়ে যেত। কিন্তু আমরা সেই নমুনা দেখছি না।
বাস্তবতা হচ্ছে, মানুষ এখন রাজনীতিতে জড়ায় নগদপ্রাপ্তির আকর্ষণে। কারণ, রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হলে নানা ধরনের অন্যায় সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়। বড় বড় প্রকল্পও গৃহীত হয় রাজনৈতিক সহচরদের ফায়দা দেওয়ার উদ্দেশ্যে। এ ধরনের সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার আকর্ষণেই চারদিকে আওয়ামী লীগ এবং তার অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনে নীতিহীন লোকরা ভিড় জমিয়েছেন এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প থেকে অন্যায় সুযোগ-সুবিধা নিয়ে ফুলে-ফেঁপে দুর্বৃত্তে পরিণত হয়েছেন। ব্যাংক ও শেয়ার মার্কেট লুটের সুযোগ এবং শাসনকাঠামোর অকার্যকারিতা তাদের অনেককে দানবে পরিণত করেছে। তাই ফায়দাতন্ত্রের অবসান না করলে, লুটপাটের সুযোগ বন্ধ না হলে, শাসনকাঠামো কার্যকর, তথা সুশাসন প্রতিষ্ঠা হবে না এবং নীতি ও আদর্শভিত্তিক রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত না হলে আমাদের পক্ষে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়াও সম্ভব হবে বলে মনে হয় না।
লেখক লেখক ও কলামনিস্ট
chiros234@gmail.com