মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় রাশিয়া

এশিয়ার দুই শক্তিশালী রাষ্ট্র চীন ও ভারতের মধ্যে সীমান্ত সমস্যা ক্রমশ বাড়ছে। সীমান্ত সমস্যায় সম্প্রতি ভারতীয় বিশেষ বাহিনীর এক সেনা সদস্য নিহত হন। ওই ঘটনার পর থেকে উভয় দেশের মধ্যে চলমান উত্তেজনা প্রতিদিনই নতুন মোড় নিচ্ছে।

রাশিয়ার মস্কোতে চীনা প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েই ফংহর সঙ্গে অনুষ্ঠিত ভারতীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংহের ২ ঘণ্টা ২০ মিনিটের বৈঠকে সীমান্ত উত্তেজনা নিরসনের পথ নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছে একাধিক ভারতীয় মিডিয়া। গত শুক্রবার রাশিয়ার মধ্যস্থতায় ওই বৈঠক হয়।

সাংহাই করপোরেশন (এসসিও) সম্মেলন উপলক্ষে তিন দিনের সফরে রাশিয়া গেছেন রাজনাথ। সম্মেলনে হাজির চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রীও। প্রথমে সম্মেলনের ফাঁকে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পার্শ্ব-বৈঠকের সম্ভাবনা খারিজ করে দিয়েছিল নয়াদিল্লি। তবে গতকাল রাতে চীনের পক্ষ থেকে আলোচনার ইচ্ছা প্রকাশ করা হয়। এ ব্যাপারে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নেয় মস্কো। কারণ, কূটনীতিকদের মতে এশিয়ার দুই শক্তিশালী দেশ সংঘাতে জড়িয়ে পড়ুক তা রাশিয়ার কাছে কোনোভাবেই কাম্য নয়।

গত মে মাসের গোড়ায় লাদাখের গালওয়ানে দুই দেশের সেনাদের মধ্যে প্রাণঘাতী সংঘর্ষের পরে এই প্রথম তাদের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের মধ্যে মুখোমুখি বৈঠক হলো। মস্কোর আগ্রহে শেষ পর্য়ন্ত আলোচনায় রাজি হয় দিল্লি। শুক্রবার ভারতীয় সময় রাত সাড়ে ৯টা নাগাদ ফংহ’র সঙ্গে রাজনাথের বৈঠকে প্রতিরক্ষা সচিব অজয় কুমার এবং রাশিয়ায় ভারতের রাষ্ট্রদূত ডি বি ভেঙ্কটেশ বর্মাও উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে রাজনাথ বলেছেন, ‘বিশ্বাসের আবহ সৃষ্টি করা, আগ্রাসী মনোভাব পরিহার এবং আন্তর্জাতিক রীতি মেনে মতবিরোধ দূর করার ওপরই গোটা এলাকার শান্তি এবং নিরাপত্তা নির্ভর করছে।’ এর আগে ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল পৃথকভাবে টেলিফোনে কথা বলেন চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইয়ের সঙ্গে। সেনাবাহিনী পর্যায়ের বৈঠক চলছে ধারাবাহিকভাবে।

তবে বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, চীন-ভারতের মধ্যে মধ্যস্থতা করতে রাশিয়া সফল নাও হতে পারে। এক্ষেত্রে তারা কারণ হিসেবে রাশিয়ার সঙ্গে চীনের সীমান্ত সমস্যার কথা তুলে ধরেন। চীন অনেক দিন ধরেই দাবি করে আসছে, ভøাদিভোস্টক অঞ্চলটি তাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে রাশিয়া। এ নিয়ে উভয় দেশের মধ্যে একাধিকবার বিতণ্ডাও হয়েছে। ফলে এশিয়ায় অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে থাকা চীন রাশিয়ার মধ্যস্থতা মানবে কি-না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (জেএনইউ) আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক সঞ্জয় ভরদোয়াজ বলেন, লাদাখ সীমান্তে চীন ও ভারতের মধ্যে যা হচ্ছে তা দু’দেশের মধ্যে বৃহত্তর সংকটের একটি ‘উপসর্গ মাত্র’। দুই, চার বা ছয় মন্ত্রীর বৈঠক থেকে সেই বৃহত্তর সংকটের সমাধান হবে না। বড়জোর সংকট আয়ত্তে রাখার ক্ষেত্রে কিছু ভূমিকা হয়তো রাখতে পারে। তার বেশি কিছু প্রত্যাশা করা ঠিক হবে না।

ভারত ও চীনের মধ্যে বৃহত্তর সেই সংকট ঠিক কী?

অধ্যাপক ভরদোয়াজ মনে করেন, দক্ষিণ এশিয়াকে তার প্রভাব বলয়ের মধ্যে আনতে চীনের যে অভিলাষ ভারত সেটাকে চ্যালেঞ্জ করার কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং চীন যে তাতে ক্ষুব্ধ। ভারত মনে করে লাদাখ সীমান্তে হঠাৎ করে তৈরি হওয়া এই সংকট মূলত সেই ক্ষোভেরই বহির্প্রকাশ। তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের উচ্চাভিলাষী বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে ভারত কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।