ওয়াহিদার অবস্থার কিছুটা উন্নতি, ডান পাশ এখনো অবশ

দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াহিদা খানমের শারীরিক অবস্থা কিছুটা উন্নতির দিকে। ডাকলে সাড়া দিচ্ছেন। ক্ষুধার কথা বলছেন। পানি খেতে চাইছেন। রক্তচাপ স্থিতিশীল আছে। তবে শরীরের ডান পাশের অবশ অংশটা আগের মতোই রয়েছে।

রাজধানীর জাতীয় নিউরোসায়েন্স ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ওয়াহিদা খানমের চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের সদস্য সচিব ও হাসপাতালের যুগ্ম পরিচালক অধ্যাপক ডা. বদরুল আলম দেশ রূপান্তরকে এসব তথ্য জানান।

এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, ওয়াহিদা খানমের শারীরিক অবস্থা আগের চেয়ে একটু ভালো। বেশ কিছু প্যারামিটার (ভালোর নির্দেশিকা) ইতিবাচক। এর মধ্যে জ্ঞানের মাত্রা (কনশাসনেস লেভেল) আগের চেয়ে ভালো। কোনো কিছু বললে উনি সাড়া দেন। কখনো পানি খেতে চান। ক্ষুধা লেগেছে বলেন। এ ছাড়া অক্সিজেন ছাড়াই উনি ভালো থাকেন। মাঝেমধ্যে ১-২ লিটার অক্সিজেন লাগে। তা ছাড়া উনার রক্তচাপ স্থিতিশীল আছে। তবে শরীরের ডান পাশটা এখনো পুরোটা অবশ আছে।

এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ওয়াহিদা খানমের শারীরিক অবস্থার কিছু শঙ্কার দিকও জানান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ভয়ের মধ্যে একটা হলো কোনো সময় মস্তিষ্কে ইনফেকশন (সংক্রমণ) হয়ে যায় কি-না। কারণ মাথায় যে ধরনের জিনিস দিয়ে আঘাত করা হয়েছে, তাতে কিছু জিনিসপত্র মাথার চুলের সঙ্গে ব্রেনে ঢুকে যেতে পারে। আমরা যদিও ব্রেন টয়লেটিং করেছি, কিন্তু সেটা শতভাগ পরিষ্কার করা সম্ভব হয় না, সংক্রমণের একটা ভয় থেকেই যায়। ব্রেনের ইনফেকশন খুব খারাপ জিনিস।

এই চিকিৎসক বলেন, আরেকটা ভয় হলো ওনার ব্রেনের ভেতর রক্তক্ষরণ নিয়ে। প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে। ব্রেন থেকে রক্ত শতভাগ বের করা যায় না, কিছু থেকে যায়। সেটা হঠাৎ করে ব্রেনে রক্ত সঞ্চালন বন্ধ করে দেয়। তখন আবার আরেকটা অপারেশন করতে হয়। সেটাও খারাপ জিনিস। এসব আশঙ্কা আছে।

ডান পাশের অবশ অংশ প্রসঙ্গে ডা. বদরুল আলম বলেন, উনি সুস্থ হয়ে উঠলে ফিজিওথেরাপি করে আস্তে আস্তে হাতের অবশ অংশ কিছুটা অর্থাৎ ৭০-৮০ শতাংশ সেরে উঠবে। এটা ঠিক কতটুকু সেরে উঠবে, সেটা এখনই বলা খুব কঠিন। তবে ওনার বয়স কম। সেদিক থেকে সেরে ওঠার আশা আমরা করতেই পারি। পুরো স্বাভাবিক না হলেও কিছুটা তো ভালো হবেই।

‘তবে এটা ঠিক তার ব্রেন কাজ করছে। উনি বুঝতে পারছেন। তবে তিনি ঠিক কতটুকু বুঝতে পারছেন, সে ব্যাপারে তাকে কিছু জিজ্ঞাস করিনি। কারণ এতে তার সাইকোলজিক্যাল ট্রমা হতে পারে। এ ধরনের ট্রমা হলে আবার একটা স্ট্রোক হতে পারে। তাই তাকে এ ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞাস করিনি’ বলেন এই চিকিৎসক।

ওয়াহিদা খানমের চিকিৎসায় গতকাল শনিবার সকালে হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. দ্বীন মোহাম্মদকে প্রধান করে সাত সদস্যের একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। বোর্ডের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা সকালেই তার শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন।

অধ্যাপক ডা. বদরুল আলম দেশ রূপান্তরকে জানান, গতকাল মেডিকেল বোর্ড ওয়াহিদা খানমের চিকিৎসায় কিছু ওষুধপত্র যোগ-বিয়োগ করেছে। গতকালও তাকে রক্ত দিয়েছে। আজ রবিবার থেকে তাকে স্যুপ, দুধ বা ডাবের পানি জাতীয় কিছু খাবার দেওয়া যায় কি-না, সেটা দেখবে। এ ছাড়া আগামীকাল সোমবার সকাল ৯টা পর্যন্ত তাকে আইসিইউতে রাখা হবে। পরে সাধারণ বেডে নেওয়া যায় কি-না, সেটা দেখবে। এগুলো মেডিকেল বোর্ডের সিদ্ধান্ত।

ওয়াহিদা খানমের অস্ত্রোপচার দলের প্রধান অধ্যাপক ডা. জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, তার শরীরের ডান পাশটা এখনো অবশ আছে। বাকি প্যারামিটারগুলো আগের চেয়ে অনেকখানি উন্নতি হয়েছে। ওনার এখন জ্ঞান আছে। কথাবার্তা বলছেন। তার আত্মীয়স্বজনদের চিনতে পারছেন। তবে ঠিক কবে নাগাদ অবশ অংশ ভালো হতে পারে সেটা নির্ভর করে তার ব্রেন ঠিক কতটা সুস্থ হয়, সেটার ওপর। কারণ সব প্যারালাইজড এক রকম নয়। যেসব রোগীর ব্রেন ড্যামেজ হয়ে যায়, সেসব রোগীর ক্ষেত্রে অবশ অংশ খুব বেশি স্বাভাবিক হয় না। যাদের ড্যামেজ কম হয়, তাদের অবস্থার কিছু উন্নতি হয়। তার ক্ষেত্রে কী হয়, সেটা বুঝতে তিন-চার মাস সময় লাগবে।

গতকাল দুপুরে ওয়াহিদা খানমের শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নিতে হাসপাতালে যান মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়–য়া ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এ বি এম খুরশীদ আলম। পরে তাদের উপস্থিতিতে ওয়াহিদা খানমের শারীরিক অবস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমকে জানানো হয়।

এ সময় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এ বি এম খুরশীদ আলম বলেন, ইউএনও ওয়াহিদা খানমের অবস্থা ভালো আছে। আপাতত বিদেশ নেওয়ার প্রয়োজন নেই। তার চিকিৎসার ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সজাগ রয়েছে।

গত ২ সেপ্টেম্বর রাতে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটের ইউএনও ওয়াহিদা খানমের সরকারি বাসভবনে ঢুকে তার ও তার বাবার ওপর হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। গুরুতর অবস্থায় তাকে রংপুরে একটি ক্লিনিকের আইসিইউতে রাখা হয়। অবস্থার অবনতি হলে ৩ সেপ্টেম্বর জরুরি ভিত্তিতে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে ঢাকায় আনা হয়। ওইদিন রাতেই জাতীয় নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে সফলভাবে তার অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়।