দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে সরকারি বাসভবনের ভেন্টিলেটর দিয়ে ভেতরে ঢুকে ইউএনও ওয়াহিদা খানম ও তার বাবা ওমর আলীকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে গুরুতর আহত করে দুর্বৃত্তরা। তিনজনকে গ্রেপ্তারের পর তাদের জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে র্যাব বলেছে, চুরি করার জন্য ইউএনওর বাসায় ঢোকার পর বাধা পেলে হামলার ওই ঘটনা ঘটে। তবে গ্রেপ্তারদের বরাত দিয়ে র্যাবের দেওয়া ওই ভাষ্য মানতে নারাজ ঘোড়াঘাটের বাসিন্দাদের অনেকেই। তারা মনে করছেন, চুরির পরিকল্পনা থেকেই ইউএনও ওয়াহিদা খানমের ওপর হামলার ভাষ্য নিছক একটি সাজানো নাটক। এর মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা ভিন্ন খাতে চলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী। হত্যার উদ্দেশ্যে, নাকি শুধুমাত্র ভয়ভীতি দেখাতে ইউএনও ওয়াহিদার ওপর হামলা হয় সে বিষয়ে নিশ্চিত নয় এলাকাবাসী। তবে গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতের ওই হামলা পরিকল্পিত ছিল এটা নিশ্চিত বলে দাবি করছেন স্থানীয়রা।
এদিকে ইউএনও ওয়াহিদার ওপর ঘটে যাওয়া ঘটনাটি নিয়ে দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে আরও কিছু নতুন তথ্য উঠে এসেছে। দিনাজপুর-৬ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) শিবলি সাদিক এবং ঘোড়াঘাট উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুর রাফে খোন্দকার সাহানশার মধ্যে বিরোধকে কেন্দ্র করে এলাকায় আধিপত্য ধরে রাখার এক ধরনের লড়াই চলে আসছিল ঘোড়াঘাটে। সেই লড়াইও ইউএনওর ওপর হামলার ঘটনার পেছনের একটি কারণ হতে পারে।
জানা গেছে, এমপি আর উপজেলা চেয়ারম্যানের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হওয়ার পর উভয়ের ন্যায়-অন্যায় যেকোনো কিছু নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা কৌশলে ম্যানেজ করে আসছিলেন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের এই দুই জনপ্রতিনিধিকে। ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াহিদা খানমও একই কৌশলে ম্যানেজ করে আসছিলেন এমপি ও উপজেলা চেয়ারম্যানকে। স্থানীয়রা বলছেন, সর্বশেষ ঘোড়াঘাট পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি ইউনুস আলীর বালুমহাল উচ্ছেদ করার ঘটনা নিয়ে ইউএনও ওয়াহিদার অবস্থান উপজেলা চেয়ারম্যান সাহানশার বিপক্ষে যায় বলে মনে করা হয়। ইউনুস আলী ও সাহানশা একই পক্ষের হওয়ায় বালুমহাল উচ্ছেদে ইউএনওর অবস্থানকে বাড়াবাড়ি বলে মনে করতে থাকে সাহানশার বলয়ের লোকজন। এ কারণেও ইউএনওর ওপর হামলার ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয় অনেকে। তাছাড়া খাসজমি দখল, মাদক কারবার ও চাঁদাবাজিতে বাধাসহ নানা সময়ে সাহানশার সঙ্গে ইউএনও ওয়াহিদার মতের অমিল ঘটার তথ্যও পাওয়া গেছে স্থানীয় প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তার কাছ থেকে। গতকাল শনিবার দেশ রূপান্তরে এসব বিষয় নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনটিও এলাকায় সাড়া ফেলে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর আবদুর রাফে খোন্দকার সাহানশার সঙ্গে স্থানীয় এমপি শিবলী সাদিকের ক্ষমতাকেন্দ্রিক দূরত্ব বেশ প্রকটভাবেই তৈরি হয়। ঘোড়াঘাট উপজেলার ইউএনওর কাছে এই দুজনের আধিপত্যের এক ধরসেনর ঠান্ডা লড়াইও চলে আসছে বেশ কিছুদিন ধরে। তাই ইউএনওর বাসায় হামলার ঘটনায় এমপি শিবলী সাদিকের সম্পৃক্ততার বিষয়টিও একেবারেই উড়িয়ে দিচ্ছেন না স্থানীয় আওয়ামী লীগের অনেকেই। কেননা শিবলী সাদিক, সাহানশা ও ইউনুস আলীর মধ্যে সম্প্রতি দূরত্ব তৈরি হলেও তারা দীর্ঘদিন একই বলয়ে ছিলেন। ইউএনও ওয়াহিদার ওপর হামলার ঘটনায় আলোচিত ঘোড়াঘাট যুবলীগের বহিষ্কৃত আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর আলমকে নীতি-নৈতিকতা ভুলে গিয়ে নেতা বানান শিবলী ও সাহানশা। পরবর্তী সময়ে জাহাঙ্গীরসহ স্থানীয় যুবলীগের সব নেতাকর্মীকে সাহানশাই নিয়ন্ত্রণ করতেন এবং তাদের নানা সুযোগ-সুবিধা দিতেন। এভাবে একপর্যায়ে জাহাঙ্গীর সাহানশার বিশ্বস্ত শিষ্য হয়ে ওঠেন। সাহানশার নির্দেশে জাহাঙ্গীর যেকোনো কাজ করতে পারেন বলে স্থানীয়দের মধ্যে জনশ্রুতি রয়েছে। স্থানীয়রা আরও বলেছেন, উপজেলা নির্বাচনে নৌকার প্রার্থী আরেকজন ছিলেন। জোরজবরদস্তি করে জাহাঙ্গীরসহ স্থানীয় অনুসারীদের ব্যবহার করে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন সাহানশা।