প্রতিদিনই সত্য মারা যাচ্ছে, মিথ্যা জেগে উঠছে

দুর্নীতির ভয়াবহ রূপটি আমরা বহন করে চলেছি শতাব্দীর পর শতাব্দী। জানা মতে, কয়েকশ বছর ধরে ক্ষমতার উৎসের কাছাকাছি যাওয়ার জন্য বিপুল পরিমাণ উৎকোচ নজরানা, উপহার এসবের আয়োজন করে আসছেন ক্ষমতাবান মানুষরা। নবাব আলিবর্দীকন্যা ঘসেটি বেগম নানাভাবে অর্থ উপার্জন করতেন। উপার্জনের কোনো উৎস জানা যেত না। তাই ফন্দি-ফিকির করে উপার্জিত অর্থ নানা জায়গায় লুকিয়ে ছাপিয়ে রাখতেন। নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা এসব জানতে পেরে তার সব সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেন। বাজেয়াপ্ত করা টাকার পরিমাণ চার কোটি এবং সেই সঙ্গে সোনা, হীরে, জহরত এগুলোর মূল্য তার চেয়েও বেশি। মীরজাফর তার ছেলে মীরনকে মুর্শিদাবাদের ক্ষমতায় বসানোর জন্য ক্লাইভকে দুই কোটি সত্তর লাখ টাকা উৎকোচ দিয়েছিল। ইংরেজরা লুণ্ঠন, চুরি-চামারি, ঘুষ ইত্যাদির মাধ্যমে যে পরিমাণ টাকা বাংলা থেকে লুট করে নিয়ে গেছে, তার হিসাব নেই। বলা হতো, শুধু বাংলায় যত সোনা আছে সারা ইংল্যান্ডে তত সোনা নেই। অথচ পলাশীর যুদ্ধের মাত্র দুই বছর পর দেখা গেল ইংল্যান্ডের একটি কাউন্টিতে যত সোনা, সারা বাংলায় তত সোনা নেই।

ক্ষমতার জন্য উৎকোচ দেওয়ার একটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে গেছে ব্রিটিশরা। আমরা সেই ধারাবাহিকতায় ঘুষ, উপহার (নজরানা এখন আর নেই কিন্তু তার বদলে উচ্চমূল্যের উপহার) দেওয়ার ব্যবস্থা বহাল রেখেছি। কয়েক দিন আগে আমার এক ব্যর্থ ব্যবসায়ী বন্ধু গলদঘর্ম হয়ে ধপ করে আমার সামনে চেয়ারে বসে পড়লেন এবং বললেন, আমি তো কোনো উপায় দেখছি না। কোথাও কোনো সরকারি অফিসে ঘুষ ছাড়া কাজ হচ্ছে না। ঠিকমতো ঘুষ দিলে কাজ না করলেও টাকা পাওয়া যায়। আমার আরেক বন্ধু সরকারি কর্মকর্তা সেও ঘর্মাক্ত হয়ে আমার সামনে বসে একের পর এক সরকারি অফিসের দুর্বৃত্তায়নের গল্প করে গেল এবং জানাল ২৫ বছর হয়ে গেলে আমি আর চাকরি করব না।

এসব ঘটনার ঢেউ আমাদের মিডিয়া জগতে ঢুকে পড়েছে। যেখানে মানের ওপর সবকিছুর বিচার হতো, এখন আর তা নেই। সব জায়গায়ই সংঘবদ্ধ চক্র গড়ে উঠেছে। যারা আমাদের দিন-রাতের নিরাপত্তা দেয়, সেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও দুর্নীতির বেড়াজালে এমন আটকা পড়েছে, যার সংবাদ আমরা প্রতিনিয়ত বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে পেয়ে যাচ্ছি। প্রতিদিনই সত্য মারা যাচ্ছে, মিথ্যা জেগে উঠছে। আর জ্ঞানের বাজার ক্রমাগতভাবে কমে যাচ্ছে। বিভিন্ন সংস্থায় যারা এখনো সত্যের প্রদীপটি টিমটিম করে জ্বালিয়ে রেখেছেন, তাদের অবস্থা শোচনীয়। পরিবারে তারা প্রতি মুহূর্তেই নিন্দিত হচ্ছেন। অফিসে ঊর্ধ্বতন ও অধস্তন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে তারা করুণার পাত্র এবং যেকোনো সময় ফেঁসে যাওয়ার ভয়ে আতঙ্কগ্রস্ত। এ অবস্থা থেকে মুক্তির কোনো আপাত উপায় খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ রাজনীতি একটা বড় ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। রাজনীতির সঙ্গে বহুকাল আগে থেকেই পেশিশক্তির একটা সম্পর্ক ছিল। প্রতিপক্ষকে হত্যা করা, জীবন বিপন্নকারী ব্যবস্থা নেওয়া এগুলো নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। দুর্বৃত্তদের হাতে কোটি কোটি টাকার সম্পদ কুক্ষিগত হয়েছে এবং এই সম্পদের ছিটেফোঁটা দিয়েই আত্মরক্ষার ব্যবস্থা করা সম্ভব হচ্ছে।

এসব পত্রপত্রিকা, টেলিভিশনে, ফেইসবুকে প্রচার হলেও কোনো আশু পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা থাকলেও আইনের দীর্ঘ দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে সত্যিকার সুরাহার কাছে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ছে। সরকার এতই অসহায় হয়ে পড়ছে যে,  দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ তো দূরের কথা, দুই মাস ধরে কাঁচা মরিচের মূল্য ২০০ টাকা থেকে নামিয়ে আনাই তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। সব জায়গায় সিন্ডিকেটগুলো এত সক্রিয় যে, তাদের সঙ্গে পেরে উঠতে গেলে যে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক শক্তি দরকার, তাও সীমিত হতে হতে হারিয়ে যাওয়ার পথে।

এই অবস্থা যে শুধু রাজধানী বা বড় বড় শহরে বিরাজ করছে তা নয়, এর বিস্তৃতি একেবারে গ্রামপর্যায়েও। সব জায়গায়ই সরকারি-বেসরকারি অফিস, সিটি করপোরেশন বা মিউনিসিপ্যালিটিতে ওত পেতে বসে আছে কীভাবে কোথায় ফাঁকি দিয়ে কিছু টাকা উপার্জন করা যায়। দেশের যান্ত্রিক যাননিয়ন্ত্রক সংস্থায় প্রচণ্ড ভিড় এবং এই ভিড় ঠেলে সঠিক জায়গায় পৌঁছাতে বহু কষ্ট করতে হয়। তাই সহজ পন্থা হচ্ছে গাড়িটি নিরাপদ দূরত্বে রেখে কিছু পয়সার বিনিময়ে ফিটনেস থেকে শুরু করে সবকিছু করিয়ে নেওয়া। শহরে যেসব বাস চলাচল করে, তার গায়ে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন। কালো ধোঁয়া মানুষের ফুসফুসকে আক্রান্ত করে দিচ্ছে। কিন্তু ফিটনেস সার্টিফিকেটের কোনো সমস্যা নেই। গাড়িতে সয়লাব হয়ে যাচ্ছে শহর কিন্তু রুট পারমিটের কোনো অসুবিধা নেই। প্রতিদিন শত শত গাড়ি রাস্তায় নামছে কিন্তু আমাদের রাস্তা কতটা গাড়িকে আশ্রয় দিতে পারে, তার হিসাব বোধ করি কর্তৃপক্ষের কাছে নেই। ব্যাংক ও লিজিং কোম্পানি গাড়ির জন্য ঋণ দেওয়ার ব্যাপারে একেবারে দিলদরিয়া। অথচ দেশে একটিও মোটরগাড়ির কারখানা নেই। ব্যাংকগুলো যদি কারখানার জন্য ঋণ দিতে শুরু করে, তাহলে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হয়। প্রতিদিন পত্রিকায় বিদেশি মোটরসাইকেলের বিজ্ঞাপন আসে। কি দুর্ভাগ্য, আমার দেশের একটা মোটরসাইকেল বানানোরও ক্ষমতা নেই। অথচ চার-পাঁচটি ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয় আছে। মোটরসাইকেল বানানোর প্রযুক্তিটাও আমাদের হাতে নেই। বুয়েট একদা মিশুক আবিষ্কার করে হাস্যরসের পাত্র হয়েছিল! কিন্তু মোটরগাড়ি বা মোটরসাইকেলের কারখানা করেও আমাদের প্রকৌশলীরা একটা কিছু দেখাতে পারত। দেশে শিল্প-কারখানা করতে গেলেও উদ্যোক্তাদের কত জায়গায় কত ধরনের টাকাপয়সা খরচ করতে হয়, তা সহজেই অনুমান করা যায়।

এসব বিবেচনায় প্রথমেই যেটা মনে হয়, দেশে যুগোপযোগী, নীতিবোধ সৃষ্টি করতে পারে এ ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা নেই। আর এই শিক্ষাব্যবস্থা নানাভাবে কলুষিত হচ্ছে। শিক্ষাঙ্গনে অপরাজনীতি, শিক্ষকদের সত্যিকার শিক্ষার ক্ষেত্রে উদাসীনতা, দুর্নীতি যেকোনোভাবে অর্থ উপার্জনের প্রতিযোগিতা সম্পূর্ণ ব্যবস্থাটাকেই পঙ্গু করে দিয়েছে। সব জায়গায়ই একই আকাক্সক্ষা টাকা চাই, টাকা। টাকা দিয়েই নাকি সব হয়, এই যে টাকা দিয়েই সব হয়, এই শিক্ষা নিয়ে যে তরুণটি বিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে আসে, তার সামনে কোনো নৈতিক জায়গা আর থাকে না। এরপরই সে খোঁজে কীভাবে এই টাকা উপার্জন করা যায়। উপার্জনের সহজ যে পথ তার সামনে খুলে যায় তা হলো রাজনীতি। রাজনৈতিক দলে নাম লিখিয়ে অর্থ উপার্জন করার ফন্দি বা ফিকির করতে থাকে। কোনো দলীয় কাজে তার অংশ নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না, সে খোঁজে ব্যবসা। আর এই ব্যবসার বিরাট দিগন্ত তার সামনে। ব্যবসায় সুবিধা না হলে চাঁদাবাজি তো আছেই। এর মধ্যে আবার কিছুসংখ্যক নিরীহ শিক্ষার্থী নানা ধরনের পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয় সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থায় চাকরির ইন্টারভিউ দিতে থাকে। সেখানেও টাকা এবং টাকার অঙ্কটি ভয়াবহ। এখন নাকি দশ লাখের নিচে কোনো সরকারি চাকরি পাওয়ার উপায় নেই। একটি পিয়ন পোস্টের চাকরির বিক্রিও শুরু হয় ছয় লাখ টাকা থেকে।

এই যে সর্বব্যাপী দুর্নীতির ডালপালা, এখান থেকে মুক্তির উপায় কী? রাজনীতিকে স্বচ্ছ করার কোনো উপায় কি বাকি আছে? শিক্ষাব্যবস্থাটা ঢেলে সাজানোর কোনো প্রক্রিয়া কি শুরু করা সম্ভব? সব ব্যাপারটাই সরকারের ওপর ছেড়ে দিলে এসব সমস্যার সমাধান হবে না। চাই গণ-উদ্যোগ।

লেখক নাট্যকার, অভিনেতা ও কলামনিস্ট

mamunur530@gmail.com