নারী শ্রমিকদের চোখ কেন শুকিয়ে যাচ্ছে

বাংলাদেশের জিডিপি বা মোট দেশজ উৎপাদনে তৈরি পোশাক শিল্প তথা গার্মেন্টস শিল্প খাতের অবদান ১৬ শতাংশ। আর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন তথা রেমিট্যান্সে গার্মেন্টস শিল্পের অবদান ৮৩ শতাংশ। এই হিসাবে বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় খুঁটি হচ্ছে তৈরি পোশাক খাত। অর্থনীতির এই খুঁটি যাদের হাত ধরে নির্মিত হয়েছে তারা এদেশের শ্রমিক শ্রেণি, যাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই নারী। গত ২৬ আগস্ট বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের স্বাস্থ্যগত সমস্যা নিয়ে সুইজারল্যান্ডের পিয়ার রিভিউড জার্নাল ‘এমডিপিআই’ একটি ভয়াবহ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে (সূত্র : দৈনিক দেশ রূপান্তর, ৩১ আগস্ট)। গবেষণা প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে অনুপযুক্ত পরিবেশে কাজ করা, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চয়তার সমস্যা, হতাশাসহ বেশ কিছু কারণে তাদের চোখের পানি শুকিয়ে গেছে তথা চোখের পানির গুণগত মান নষ্ট হয়ে গেছে। যেটাকে ‘ড্রাই আই’ রোগ বলা হয়। এই গবেষণাতেও দেখা যাচ্ছে ‘ড্রাই আই’ সমস্যার শিকার শ্রমিকদের বেশির ভাগই নারী। এমন জটিল রোগ বাদে আরও নানাবিধ স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে বাংলাদেশের নারী গার্মেন্টস শ্রমিকরা।

বাংলাদেশি গবেষক মামুনুর রশীদের নেতৃত্বে দেশি-বিদেশি গবেষকদের দলটি গাজীপুরের ১ হাজার ৫০ জন গার্মেন্টস শ্রমিকের ওপর এই গবেষণাটি চালিয়েছে। ওই শ্রমিকদের ওপর মারাত্মক ড্রাই আই রিস্ক ফ্যাক্টরগুলো শনাক্ত করে দেখেছে ৬৪ দশমিক ২ শতাংশ শ্রমিক এই সমস্যায় ভুগছে। শ্রমিকদের মধ্য ৫৩ দশমিক ৮ শতাংশই নারী শ্রমিক। পারিবারিক ও অর্থনৈতিক নানাবিধ সমস্যা নিয়ে বেঁচে থাকার তাগিদে, আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়া ও পরিবারের দায়িত্ব মাথায় নিয়ে গার্মেন্টসে কাজ করতে আসা নারী শ্রমিকরা অনুপযুক্ত কর্মপরিবেশে বাড়তি সময় কাজ করছে। ফলে তাদের ঘুম কম হয়। পর্যাপ্ত ঘুমের সমস্যা নিয়ে যখন সেলাইয়ের কাজ করছেন তখন এর প্রভাব পড়ছে তাদের চোখের ওপরে। অন্যদিকে পুষ্টিকর খাবারের অভাবেও নারী গার্মেন্টস শ্রমিকরা নানাবিধ স্বাস্থ্য সমস্যার শিকার।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র তথ্য মতে, ৪০ লাখ শ্রমিক এই খাতে কর্মে নিয়োজিত রয়েছেন। তার মধ্যে ৫৬ শতাংশ তথা ২৬ লাখ নারী। ২০১৭ সালে ২৬০০ নারী তৈরি পোশাক কর্মীর ওপর চালানো আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর’বি) এর গবেষণায় দেখা গেছে ৮০ শতাংশ নারী শ্রমিক রক্তস্বল্পতায় ভুগছে। গবেষণায় দেখা গেছে ১৮ থেকে ৪৯ বছর বয়সের প্রতি ১০ জন নারী শ্রমিকের মধ্যে ৮ জনই রক্তস্বল্পতার শিকার। এর কারণ নারী শ্রমিকরা পর্যাপ্ত খেতে পারছে না এবং যা খাচ্ছে সেগুলোও পুষ্টিকর খাবার নয়। যার ফলে তাদের পরিশ্রমের তুলনায় পুষ্টি ও খাদ্য সরবরাহ কম। এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ‘পোশাক শিল্প খাতে মৌলিক পুষ্টি ও খাদ্য সরবরাহ বিষয়ক প্রশিক্ষণ’ বিষয়ক কর্মশালায় প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা গেছে ৪৩ শতাংশ শ্রমিক দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টির শিকার (সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন, ৫ এপ্রিল ২০২০)। আর আইসিডিডিআরবি’র তথ্য বলছে, কেবল রক্তস্বল্পতাই নয় নারী শ্রমিকরা খাদ্য ঘাটতি ও অপুষ্টিজনিত কারণে নানাবিধ জটিল শারীরিক সমস্যারও শিকার।

বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম উৎস তৈরি পোশাক খাতে নিয়োজিত নারী শ্রমিকরা একদিকে যেমন নানাবিধ শারীরিক জটিলতায় ভুগছে অন্যদিকে কর্মক্ষেত্রেও নারী শ্রমিকরা নিরাপদ নয়। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের এক জরিপ মতে, ৭৬ শতাংশ নারী শ্রমিক মনে করে কাজের ক্ষেত্রে তাদের আর্থিক নিরাপত্তা নেই। ৪০ শতাংশ নারী শ্রমিক তাদের জন্য নির্ধারিত ন্যূনতম বেতন পান না। ৩০ শতাংশ নারী শ্রমিক কাজ করতে গিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। ২০১৮ সালের আগস্টে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ’র (সিডিপি) করা এক জরিপে নারী ও পুরুষ শ্রমিকদের মধ্যে বেতন বৈষম্য রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’র এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে বাংলাদেশের গার্মেন্টসগুলোতে কর্মরত নারী শ্রমিকদের ২২ শতাংশ কখনো না কখনো যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে। প্রায় ৮৩ শতাংশ নারী শ্রমিক নিরাপত্তার অভাব বোধ করে। ঢাকার চারটি এলাকার আটটি কারখানার ওপর জরিপ চালিয়ে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছিল। প্রতিবেদন মতে, ৬৮ শতাংশ নারী শ্রমিক জানিয়েছে, কর্মক্ষেত্রে কার্যকর কোনো যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি নেই (সূত্র : বিবিসি, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯)।

এত সমস্যার মাঝে বড় সমস্যা হলো চাকরির অনিশ্চয়তা, ন্যূনতম মজুরি ও নিয়মিত মজুরি না পাওয়ার মতো ঘটনা। বাংলাদেশের গার্মেন্টস কারখানাগুলোতে শ্রমিকের চাকরি নির্ভর করে মালিক পক্ষের মর্জির ওপর। গার্মেন্টসে বিনা বেতনে, বেতনসহ কিংবা লে-অফ করে শ্রমিক ছাঁটাই করা নিত্য ঘটনা। এর উদাহরণ প্রায়ই সংবাদমাধ্যমে মেলে। অনেক সময় দেখা যায় সারা মাস কাজ করার পর হঠাৎ কোনো ধরনের নোটিস না দিয়েই পরদিন সকালে কারখানার ফটকে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। শ্রমিকের সারা মাসের মজুরিও শোধ করা হয়নি। বাংলাদেশে গার্মেন্টস শ্রমিকদের যে বেতন দেওয়া হয় সেটা বর্তমান সময়ে একটি পরিবার চালানো তো দূরে থাক শ্রমিকের নিজের জীবন ধারণের জন্যও যথেষ্ট নয়। শ্রমিকদের আন্দোলনের মুখে ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছে ৮ হাজার টাকা। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মজুরি বোর্ড গার্মেন্টস শ্রমিকদের সর্বোচ্চ মজুরি (গ্রেড-১) ১০ হাজার ৯৩৮ টাকা নির্ধারণ করেছে। এর সঙ্গে ৫০ শতাংশ বাড়ি ভাড়া ৫৪৬৯, চিকিৎসা ভাতা ৬০০, যাতায়াত ভাড়া ৩৫০ এবং খাদ্য বাবদ ৯০০ টাকা যোগ করে সর্বমোট মজুরি ১৮ হাজার ২৫৭ টাকা করা হয়েছে। অন্যদিকে সর্বনিম্ন গ্রেড-৭ এ একজন শ্রমিকের মূল বেতন ৪ হাজার ১শ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর সঙ্গে বাড়ি ভাড়া ২০৫০, চিকিৎসা ভাতা ৬০০, যাতায়াত ৩৫০ এবং খাদ্য বাবদ ৯০০ টাকা যোগ করে সর্বমোট ৮ হাজার করা হয়েছে।

তৈরি পোশাক শিল্প এলাকায় শ্রমিকদের কলোনিগুলোতে গেলে দেখা যায় তাদের বাসস্থানের কী দশা! কারণ যে টাকা বেতন তা দিয়ে এরচেয়ে ভালো পরিবেশে বাসা ভাড়া করা সম্ভব নয়। ফলে তারা বাধ্য হয়েই অনুপযুক্ত পরিবেশে বাস করছে। অন্যদিকে আর্থিক অনটনের কারণে শ্রমিকরা বাধ্য হয়ে বাড়তি সময় কাজ করছে। এছাড়া দীর্ঘ সময় একটানা দাঁড়িয়ে বা বসে কাজ করার ফলে শ্রমিকরা মাথাব্যথা, ঘাড় ব্যথা, চোখে সমস্যা, কাঁধে ব্যথা, হাঁটু ব্যথা, কোমরের জয়েন্টে ব্যথা, মেরুদন্ড ব্যথাসহ নানা ধরনের শারীরিক সমস্যার শিকার হচ্ছে। মজুরি কম তাই তাদের খাবারের তালিকাতেও পুষ্টিকর খাদ্য অনুপস্থিত থাকে। মাছ, মাংস কিংবা সবুজ সবজি, দুধ, ডিম, কলা তাদের পক্ষে নিয়মিত খাওয়া সম্ভব নয়। অন্যদিকে অসুস্থ হলে অর্থাভাবের কারণে উঁচুমূল্যের ভালো চিকিৎসাও তাদের ভাগ্যে জোটে না।

অনুপযুক্ত পরিবেশে কাজ, অনুপযুক্ত পরিবেশে থাকা, দীর্ঘ সময় কাজের ফলে নানাবিধ শারীরিক সমস্যা সৃষ্টি, নিম্নমানের ও অপুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ, অসুস্থতায় চিকিৎসার অভাব এসব কিছু মিলে গার্মেন্টস শ্রমিকদের নিত্য দুঃসহ জীবন। আর এর বেশির ভাগই নারী শ্রমিক। এদের বেশির ভাগই পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে জীবিকার তাগিদে গার্মেন্টসে এসেছেন। এই বাস্তবতা দেখে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক যে, দেশের সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স অর্জনকারী এই তৈরি পোশাক শিল্প খাতের বেশিরভাগ শ্রমিকের জীবনবাস্তবতা কেন এতটা মানবেতর হবে?   

লেখক : সাংবাদিক ও শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

sadikiu099@gmail.com