১৫৮ হাসপাতালের ডাক্তার যাচ্ছেন স্বরাষ্ট্রের অধীনে!

পুলিশ, বিজিবি ও আনসার সদস্য এবং কারারক্ষীদের চিকিৎসার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে থাকা হাসপাতালগুলোর চিকিৎসকরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে চলে যাচ্ছে। এজন্য গঠন করা হচ্ছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মেডিকেল ইউনিট। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সম্প্রতি এ সংক্রান্ত একটি চিঠি মন্ত্রিপরিষদ সচিবের কাছে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে। এর আগে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে আরেকটি চিঠি দিয়ে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে। পাশাপাশি নতুন করে ২৫টি পদ সৃষ্টি করতেও অনুরোধ করা হয়েছে ওই চিঠিতে।

জানা গেছে, গত বছরের জানুয়ারি মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পরিদর্শনে গিয়ে মেডিকেল ইউনিট গঠন করাসহ নানা বিষয়ে পরামর্শ দেন। বর্তমানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ১৫৮টি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তবে ওই হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক অনেকাংশে কম থাকায় তারা উন্নতমানের চিকিৎসা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। এ থেকে উত্তরণের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নানা উদ্যোগ নিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন।

তারা আরও জানান, দীর্ঘদিন ধরেই পুলিশ, বিজিবি ও আনসার সদস্য এবং কারারক্ষীরা হাসপাতাল ও চিকিৎসক সংকটের কারণে উন্নতমানের সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ নিয়ে অভিযোগের অন্ত নেই। এই প্রেক্ষাপটে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা দফায় দফায় বিশেষ বৈঠক করেন। সর্বশেষ চলতি বছরের পুলিশ সপ্তাহে বাহিনীটির প্রধানসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীর কাছে হাসপাতাল ও চিকিৎসাসেবা নিয়ে নানা অভিযোগ করেন। উন্নতমানের চিকিৎসার জন্য আলাদা মেডিকেল ইউনিট গঠন করার অনুরোধ জানান তারা। এতে প্রধানমন্ত্রী সম্মতি দেন। গত বছরের ২০ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পরিদর্শন করার সময়ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি মেডিকেল ইউনিট গঠন করার নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা পেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিশেষ বৈঠক করেছেন কয়েক দফা। গত বছরের ৫ নভেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর হাসপাতালে চিকিৎসক সংকটের পাশাপাশি উন্নতমানের সেবা পাওয়া যায় না বলে আলোচনা হয়। পুলিশ ও বিজিবিসহ সবকটি সংস্থার সদস্যদের আরও উন্নতমানের সেবা দিতে মন্ত্রণালয়ের অধীনে চিকিৎসক নেওয়ার ব্যাপারে আলোচনা হয়। এতদিন চিকিৎসকরা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা দিয়ে আসছেন।   

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা থেকে শুরু করে প্রতিটি সদস্যের উন্নত চিকিৎসার জন্য আমরা বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছি। পুলিশ, বিজিবি, আনসার ও কারাগারের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক বাড়াতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। এজন্য ইতিমধ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে চিঠি পাঠানো হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি নিয়ে মেডিকেল ইউনিট গঠন করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। দেশের  উন্নয়নের জন্য সরকার নানাভাবে কাজ করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উন্নয়নের স্বার্থে আমরা নিরলসভাবে কাজ করছি।’

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখার একজন কর্মকর্তা জানান, গত ১০ আগস্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপসচিব তাহমিনা বেগম স্বাক্ষরিত একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের কাছে। ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী জননিরাপত্তা বিভাগের অধীনে মেডিকেল ইউনিট গঠন করার নির্দেশ দিয়েছেন। জননিরাপত্তা বিভাগ ও সুরক্ষা সেবা বিভাগের আওতাধীন হাসপাতালগুলোর ৩-১০ নম্বর গ্রেডের পদগুলোতে নিয়োগ, পারস্পরিক বদলি ও ক্যারিয়ার প্ল্যানিং গতিশীল করাসহ অন্যান্য কার্যক্রম জননিরাপত্তা বিভাগের মাধ্যমে সম্পন্ন করার জন্য একটি মেডিকেল ইউনিট গঠন করা হবে। এই জন্য ২৫টি নতুন পদ তৈরি করতে হবে। আর তাতে আপনার সম্মতি প্রয়োজন। এর আগে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কেও বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে কারা অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশের ৬৮টি কারাগারে ১৪১টি পদের বিপরীতে চিকিৎসক মাত্র ৯ জন। কারা অধিদপ্তর সরাসরি চিকিৎসক নিয়োগ দিতে পারে না। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ থেকে বিসিএস ক্যাডারের সহকারী সার্জন বা সমমানের পদ থেকে প্রেষণে কারা চিকিৎসক পদায়ন করতে হয়। ২০১৮ সালের ২৮ জানুয়ারি ১৬ কারা চিকিৎসকের শূন্যপদে পদায়ন চেয়ে জনপ্রশাসন সচিব ও স্বাস্থ্য বিভাগকে অনুরোধ জানিয়ে কয়েকবার চিঠি দিয়েছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগ। কিন্তু চিঠি চালাচালির পরও চিকিৎসক পদায়ন করা হয়নি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে হাসপাতালের চিকিৎক নিয়োগ পেলে আমাদের জন্য অনেক ভালো। এতে সার্বক্ষণিক উন্নতমানের সেবা পাওয়া যাবে।’

নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক নেই বললেই চলে। চিকিৎসক নিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করেও চিকিৎসক পাওয়া যায় না। পুলিশ ও কারাগারের বেশি হাসপাতাল আছে। তার মধ্যে ৬৮টি কারাগারেই হাসপাতাল থাকলেও চিকিৎসক কম। ইতিমধ্যে ১১৭টি শূন্যপদে চিকিৎসক নিয়োগের নির্দেশ দিয়েছে উচ্চ আদালত। তাছাড়া পুলিশের ঢাকায় একটি কেন্দ্রীয় হাসপাতাল, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল ও সিলেটে ১০০ বেডের হাসপাতাল, রাজশাহীর সারদা পুলিশ অ্যাকাডেমিতে ৭৫ বেডের হাসপাতাল, ১৬টি জেলায় ২০ বেডের হাসপাতাল এবং বাকি জেলাগুলোতে ৬৩টি মেডিকেল ইনভেস্টিগেশন সেন্টার রয়েছে। সেখানেও চিকিৎসক সংকট প্রকট।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, বিজিবিতে ৫টি ও আনসারের মাত্র একটি হাসপাতাল থাকলেও চিকিৎসকের অভাবে উন্নত সেবা পাচ্ছে না বলে অভিযোগ আছে। আর এসব কারণে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে চিকিৎসকদের নেওয়া হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাসপাতালগুলোতে চিকিৎক নিয়োগ দেওয়া হবে।

প্রায় একই কথা বলেছেন পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘পুলিশ হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা নেই বললেই চলে। এর অন্যতম কারণ চিকিৎসক সংকট। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে মেডিকেল ইউনিট গঠন করা হচ্ছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে উইংটি হয়ে গেলে হাসপাতালের সেবার মান বেড়ে যাবে, এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়।’