দেশের পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একের পর এক যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটলেও যৌন নিপীড়ন বন্ধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনগুলোর ভূমিকা বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠন করার বিষয়ে উচ্চ আদালতের রায়ের এক দশক পেরিয়ে গেলেও যথাযথভাবে তা বাস্তবায়নে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিষ্ক্রিয়তা স্পষ্টতই দৃশ্যমান। তার ওপর যৌন নিপীড়নের নানা ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে যে ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে তা অনেক সময়ই লোক দেখানো আনুষ্ঠানিকতা রক্ষা মাত্র হয়ে দাঁড়ায়। একদিকে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী যৌন নিপীড়ন অভিযোগ সেল নেই; আরেকদিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যে প্রক্রিয়ায় যৌন নিপীড়নের অভিযোগের তদন্ত ও বিচার করে থাকে সেটা ত্রুটিপূর্ণ বলে মনে করেন মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবীরা। পাশাপাশি, যৌন নিপীড়নের মতো একটি ফৌজদারি অপরাধের বিচারে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কেবলই প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে নাকি রাষ্ট্রীয় আইনে মামলা ও শাস্তি হবে সেই প্রশ্নও অনালোচিত রয়ে যাচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক কর্র্তৃক ছাত্রী বা সহকর্মী নারী শিক্ষকদের যৌন নিপীড়নের অগুনতি ঘটনার একটি সম্প্রতি আবার সংবাদ মাধ্যমের আলোচনায় এসেছে। মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরে ‘যৌন নিপীড়ক শিক্ষককে বহাল রাখল জবি’ শিরোনামে এক প্রতিবেদনে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগে যৌন নিপীড়নের ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষক আবদুল হালিম প্রামাণিকের বিরুদ্ধে ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পরও তার চাকরি বহাল রেখে অভিযুক্ত শিক্ষককে বিভিন্ন ধরনের শাস্তি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট। ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে আবদুল হালিম প্রামাণিকের বিরুদ্ধে একাধিক যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা তার শাস্তির দাবিতে আন্দোলন করেন। ঘটনার প্রাথমিক সত্যতা পেয়ে ওই বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয় এক চিঠিতে ওই শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত ও তিরস্কার করে। এরপর ২০১৮ সালের এপ্রিলে সিন্ডিকেট সভায় তাকে তিরস্কার করে দুই বছরের জন্য তার পদোন্নতি পিছিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু যৌন নিপীড়নের শিকার ছাত্রী এই শাস্তিতে অসন্তুষ্ট জানিয়ে উপাচার্য বরাবর চিঠি দিলে ফের উচ্চতর তদন্ত কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ। সর্বশেষ গত সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮২তম সিন্ডিকেট সভায় শিক্ষক আবদুল হালিম প্রামাণিকের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় যৌন নিপীড়ক শিক্ষক আবদুল হালিম প্রামাণিকের বিরুদ্ধে যে চারটি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে সেগুলো হলো সহযোগী অধ্যাপক থেকে অধ্যাপক হওয়ার জন্য চার বছরের বদলে তার আট বছর লাগবে, দ্বিতীয়ত যে দুই ছাত্রী যৌন নিপীড়নের অভিযোগ করেছেন তাদের কোনো ক্লাসে অভিযুক্ত শিক্ষক পাঠদান করতে পারবেন না। তৃতীয়ত ওই শিক্ষক যেসব কোর্স পড়াবেন সে সবের বাইরে আর কোনো পরীক্ষা কমিটি বা পরীক্ষার ডিউটিতেও তিনি থাকতে পারবেন না। চতুর্থত আগামী ১০ বছর চেয়ারম্যান, ডিনসহ কোনো প্রশাসনিক দায়িত্বে তিনি যোগ দিতে পারবেন না। যৌন নিপীড়নের অভিযোগ প্রমাণ হওয়া কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের কেবল এ ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ যথাযথ শাস্তি কি না সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। কেননা, শিক্ষকতা ধারণাটির সঙ্গে উচ্চ নৈতিকতার যে যোগ রয়েছে সে বিচারে বলতে হয় এমন অপরাধ প্রমাণ হওয়ার পর কোনো ব্যক্তির আর শিক্ষকতা পেশায় থাকার অধিকার থাকে না। এ প্রসঙ্গে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়েরই আরেকটি ঘটনা বিবেচ্য। ২০১৭ সালে কয়েকজন ছাত্রীকে যৌন হয়রানি এবং বিভাগের অন্য শিক্ষকদের সম্পর্কে বাজে মন্তব্য করায় বিশ্ববিদ্যালয়টির গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মীর মোশারেফ হোসেনকে (রাজীব মীর) চাকরিচ্যুত করা হয়। ফলে এই প্রশ্ন ওঠাও স্বাভাবিক যে, একই অপরাধে দুই শিক্ষকের শাস্তি ভিন্ন হবে কেন?
সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠন করতে ২০০৯ সালে একটি যুগান্তকারী রায় দিয়েছিল উচ্চ আদালত। এক দশক আগে দেওয়া ওই রায়ে যৌন নিপীড়নের সংজ্ঞাসহ তা রোধে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছিল আদালত। কিন্তু বেশিরভাগ স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসায় যেমন এই রায়ের আলোকে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠিত হয়নি তেমনি বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ও এক্ষেত্রে দায়সারা পদক্ষেপ নিয়েছে মাত্র। অথচ ওই রায়ে বলা হয়েছিল, জাতীয় সংসদে যৌন হয়রানি রোধে আইন প্রণয়ন না হওয়া পর্যন্ত সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী উচ্চ আদালত নির্দেশিত এই নীতিমালাই বাধ্যতামূলকভাবে কার্যকর থাকবে। তাই দেশের সব পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একজন নারীর নেতৃত্বে সংখ্যাগরিষ্ঠ নারী সদস্য নিয়ে যৌন নিপীড়ন অভিযোগ সেল গঠন করা অপরিহার্য। একইসঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমন অভিযোগ সেলগুলোর জন্য নিপীড়নের ঘটনা তদন্তে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও আইনি সহায়তার ব্যবস্থা করা জরুরি। আর যে কোনো ধরনের যৌন নিপীড়ন ফৌজদারি অপরাধ বলে গণ্য হলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি অভিযুক্তের বিরুদ্ধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরই বাদী হয়ে মামলা করা উচিত।