বেবিচকের স্টিয়ারিং কমিটির সভা

সাড়ে ২৫ হাজার কোটি টাকার ১২ প্রকল্পে স্থবিরতা কাটছে

দেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তা জোরদার করতে ৬টি বডি স্ক্যানার ও ২টি এক্সক্লুসিভ ডিটেকশন সিস্টেম (ইডিএস) বসানোর উদ্যোগ নিয়েছিল বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। মালামাল দেশে এলেও তা স্থাপন করা যাচ্ছে না। কারণ করোনার কারণে জাপানি পরামর্শকরা দেশে আসছেন না। এখন পরামর্শক এনে যন্ত্রপাতিগুলো স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এমন ১২ প্রকল্পের স্থবিরতা কাটানোর উদ্যোগ নিয়েছে বেবিচক। এসব প্রকল্পে বরাদ্দ রয়েছে ২৫ হাজার ৬৩২ কোটি টাকা। গত ১ সেপ্টেম্বর বেবিচকের জ্যেষ্ঠ সচিব মহিবুল হকের সভাপতিত্বে এই ১২ প্রকল্প নিয়ে স্টিয়ারিং কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রকল্পগুলোর কাজে গতি আনতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সভার কার্যপত্র থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

বেবিচকের জ্যেষ্ঠ সচিব মহিবুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, জাইকার সহায়তায় চলমান প্রকল্পের পরামর্শকরা আগামী অক্টোবরের মধ্যে দেশে আসবেন বলে জানিয়েছে জাইকা। ওই সময় প্রকল্পের বাকি কাজ শেষ হবে। তিনি বলেন, করোনার কারণে চলমান প্রকল্পের গতি কমে এসেছিল, তবে এখন পুরোদমে কাজ চলছে। স্টিয়ারিং কমিটির সভায় চলমান প্রকল্পের কাজে যথাযথ গতি এনে নির্দিষ্ট মেয়াদে শেষ করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। বিদ্যমান সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

 স্টিয়ারিং কমিটির আলাদা আলাদা কার্যপত্র থেকে জানা গেছে, বিমানবন্দরগুলোয় গত বছর ৬টি বডি স্ক্যানার ও ২টি ইডিএস বসানোর প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। এতে জাপানের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকা অর্থ সহায়তা দিচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় অধিকাংশ মালামালও দেশে এসে পৌঁছেছে। কিন্তু করোনার কারণে জাপানি পরামর্শকরা আসতে না পারায় ইডিএসের অ্যালাইনমেন্ট ও প্রোগ্রামিং ইন্সটলেশনের কাজ হয়নি। ফলে মালামাল থাকা সত্ত্বেও তা স্থাপন করা যাচ্ছে না। এই অবস্থায় জাইকার সঙ্গে যোগাযোগ করে পরামর্শক এনে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শেষ করার উদ্যোগ নিতে চায় বেবিচক।

কার্যপত্র থেকে জানা গেছে, ২১ হাজার ৩৯৯ কোটি টাকা ব্যয়ে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ (১ম পর্যায়) শীর্ষক প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০১৭ সালে। প্রকল্পের কাজ চলতি বছরের জুনে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও হয়নি। পরে সংশোধন করে মেয়াদ ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়। প্রকল্পটিতে জাইকা ঋণ সহায়তা বাবদ দিচ্ছে ১৬ হাজার ১৪১ কোটি টাকা। আর জিওবি থেকে বরাদ্দ ৫ হাজার ২৫৮ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছর এ প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ রয়েছে ২ হাজার ৮৫৬ কোটি টাকা। কিন্তু করোনার কারণে প্রকল্পের কাজে গতি নেই। সভায় বলা হয়, প্রকল্পে সর্বমোট ৩ হাজার পাইল স্থাপন করা হবে। ইতিমধ্যে ৮০০টি স্থাপন করা হয়েছে। আগামী ডিসেম্বর নাগাদ সব পাইল স্থাপন করা সম্ভব হবে বলে মনে করা হচ্ছে। করোনার মধ্যে কাজ চালাতে ৯০০ কর্মীর জন্য ইনডোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতিদিন ১০০ শ্রমিকের করোনা পরীক্ষা হচ্ছে। তবে ইমপোর্ট কার্গো এলাকায় বিমানের বিভিন্ন জিনিসপত্র ছড়ানো-ছিটানো রয়েছে। এগুলো পরিষ্কার না করলে প্রকল্প বাস্তবায়ন যথাসময়ে শেষ হবে না। সভায় এ বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

বিমানবন্দরের সিকিউরিটি উন্নয়ন শীর্ষক প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয় ৫৯ কোটি ৬২ লাখ টাকা। এর মধ্যে জাইকা দেবে ৫৪ কোটি ১০ লাখ টাকা, বাকি অর্থায়ন হবে বেবিচক নিজস্ব তহবিল থেকে। দেড় বছর মেয়াদি এ প্রকল্প চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। গত জুন পর্যন্ত প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ৩২ কোটি ৪০ লাখ টাকা, যা মোট বরাদ্দের ৫০ দশমিক ৭৫ শতাংশ। সভায় মহিবুল হক বলেন, পরামর্শের সঙ্গে যোগাযোগ করে বাকি কাজ দ্রুত শেষ করতে হবে। ইডিএস বিষয়ক সমস্যা সমাধানে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।

কক্সবাজার বিমানবন্দরে আন্তর্জাতিক প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল ভবন নির্মাণে প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে। ২৬৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্পের কাজ ২০১৮ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কাজের গতি না থাকায় পরপর দু’বার মেয়াদ বাড়ানো হয়। এতে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ২৭৭ কোটি ৮৮ লাখ টাকায়। কিন্তু এখনো টার্মিনাল ভবনের গ্রাউন্ড ফ্লোরের ড্রয়িং ও ডিজাইন অনুমোদন পায়নি। প্রকল্পে অন্যান্য নকশাও রয়েছে অনুমোদনের অপেক্ষায়। এতে কাজে দেরি হচ্ছে বলে জানায় নিয়োগপ্রাপ্ত ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান। সভায় এগুলো দ্রুত অনুমোদনের নির্দেশনা দেওয়া হয়।

কক্সবাজার বিমানবন্দর উন্নয়নে কাজ শুরু হয় ২০০৯ সালে। এরপর তিনবার সংশোধন করে প্রকল্পটির ব্যয় ও মেয়াদ বাড়ানো হয়। এতে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকায়। গত জুনে এর কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এ পর্যন্ত সময়ে বাস্তব কাজের অগ্রগতি হয়েছে ৮০ শতাংশ। রানওয়ের পাশে ৬০০ পরিবারকে খুরুমকুল নামক এলাকায় পুনর্বাসন করা হলেও অনেকে এখনো এসব এলাকায় বসবাস করছেন। ফলে জায়গা বুঝে নিতে সমস্যা হচ্ছে। সভায় এ বিষয়ে জেলা প্রশাসকের সহায়তা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। খালি জায়গায় সার্বক্ষণিক আনসার নিয়োগের কথা বলা হয়েছে।

সভায় গতি আনার বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া অন্য প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে-  প্রায় ৪৫২ কোটি টাকা ব্যয়ে সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরে বিদ্যমান রানওয়ে ও ট্যাক্সিওয়ের শক্তি বৃদ্ধিকরণ, ৫৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরে বিদ্যমান রানওয়ে ও ট্যাক্সিওয়ে শক্তি বৃদ্ধিকরণ, ৩৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে কক্সবাজার বিমানবন্দরের রানওয়ে সম্প্রসারণ, ২৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে সিলেট ওসমানী বিমানবন্দর উন্নয়ন, হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরের জন্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে ৫৫ কোটি ৬৩ লাখ টাকা ব্যয়ে বেবিচকের সক্ষমতা বৃদ্ধি, ২৭৭ কোটি টাকা ব্যয়ে কক্সবাজার বিমানবন্দরে আন্তর্জাতিক প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল ভবন নির্মাণ। হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে জেনারেল এভিয়েশন হ্যাঙ্গার, হ্যাঙ্গার এপ্রোন এবং ফায়ার স্টেশনের উল্টো দিকে এপ্রোন নির্মাণ- ব্যয় ৪৩০ কোটি টাকা,  শাহজালাল বিমানবন্দরে বিদ্যমান এক্সপোর্ট কার্গো এপ্রোনের উত্তর দিকে এপ্রোন সম্প্রসারণ- ব্যয় ১৭৫ কোটি টাকা। এছাড়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিমানবন্দর প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।