পুলিশ সদস্যরা বছরের পর বছর একই থানা বা জেলায় দায়িত্ব পালন করছেন। মাঝেমধ্যে বদলি করা হলেও তদবির করে আগের জায়গায় ফিরছেন। এরই সুযোগে ওইসব পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে অপরাধীদের সখ্য গড়ে উঠছে, এলাকায় বাড়ছে নানা অপরাধ। ঘুরেফিরে একই স্থানে থাকাদের চিহ্নিত করে দ্রুত সরানোর উদ্যোগ নিতে হবে পুলিশ সদর দপ্তরকে। তাহলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও উন্নতি হবে।
গতকাল মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এসব তথ্য উঠে আসে। বৈঠকে উপস্থিত সংশ্লিষ্ট সূত্র দেশ রূপান্তরকে জানায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকার, রাষ্ট্র ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যেসব প্রোপাগান্ডা বা গুজব রটানো হচ্ছে, তা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে আনতে বলা হয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের পাশাপাশি প্রয়োজনে নতুন আইন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ইউটিউব চ্যানেল নিয়ন্ত্রণের আওতায় প্রত্যেক চ্যানেল নিবন্ধনের পরামর্শ দেওয়া হয়। এছাড়া ফেইসবুক ও ইউটিউব কর্র্তৃপক্ষকে ঢাকায় অফিস খোলার অনুরোধ করা হবে।
বৈঠকে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদ বলেন, ‘পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যেভাবে মামলা হচ্ছে, তাতে পুলিশ সদস্যরা কাজের উৎসাহ হারিয়ে ফেলছেন। এটি কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়, তার কর্মকৌশল তৈরি করা দরকার।’ তার এই বক্তব্যে উপস্থিত সবাই সম্মতি দেন।
এদিকে, বৈঠকে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটের ইউএনও ওয়াহিদা খানমের ওপর হামলার পেছনের রহস্য ও এর সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। তার বাসায় চুরির ঘটনা মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়নি বলে বলা হয়। শুধু ইউএনওদের বাসভবনে নয়, পুরো উপজেলা কমপ্লেক্সই নিরাপত্তার আওতায় আনা হচ্ছে। এজন্য জেলা প্রশাসক, এসপি ও নির্বাহী কর্মকর্তাদের আলোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
বৈঠকে উপস্থিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির প্রধান ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের সভাপতিত্বে বেলা ১১টায় শুরু হওয়া বৈঠক বিকেল ৩টায় শেষ হয়। শুরুতেই ইউএনও ওয়াহিদা খানমের ওপর হামলার বিষয়ে বিশদ আলোচনা হয়। প্রকৃত হামলাকারীদের খুঁজে বের করার নির্দেশ দেওয়া হয়। থানার নির্বাহী কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারের সদস্য এবং সারা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। এ সময় অনেকে বলেন, পুলিশের অনেক কর্মকর্তা বা সদস্য বছরের পর বছর একই থানা বা জেলায় কর্মরত। কাউকে বদলি করলে নানা তদবিরের মাধ্যমে ফিরে আসেন। তাদের সঙ্গে এলাকার অপরাধীদের সখ্য গড়ে উঠেছে বলে তথ্য রয়েছে। এদের চিহ্নিত করে দ্রুত সরানোর উদ্যোগ নিতে পরামর্শ দেওয়া হয়।
বৈঠকে কমিটির প্রধান বলেন, বৈঠকে উপস্থিত সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে যেসব পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, সবগুলো একত্রিত করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রতিকারের ব্যবস্থা নিতে পারে। ওনাদের (গোয়েন্দা সংস্থা) কাজ আমরা অবজ্ঞা বা অবমূল্যায়ন করছি না। যারা নির্যাতিত, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মেইন ফাংশন, কেন এ ঘটনা ঘটল, উৎস কী বা যেসব ক্রাইম সেগুলো দেখার। হয়তো একেক গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্ট একেক রকম আসতে পারে। সেজন্য আমরা একটা কমিটি গঠনের পরামর্শ দিয়েছি। ফলে সব শুনে একটা সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দায়িত্ব দিয়েছি, উনি কমিটি গঠন করবেন।
বৈঠকে কর্মকর্তারা জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাষ্ট্র, সরকার ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়ে প্রোপাগান্ডা ও গুজব রটানো হচ্ছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন দিয়েও তাদের নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে না। এজন্য নতুন করে একটি আইন করা দরকার। এতে সবাই একমত পোষণ করে বলেন, নতুন আইনের জন্য আইন মন্ত্রণালয় উদ্যোগ নেবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে ইউটিউব চ্যানেল নিবন্ধনের আওতায় আনার পাশাপাশি চ্যানেলের কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ এবং তদারকি করা হবে।
বৈঠক সূত্র জানায়, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন সমন্বয় করে আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে উপস্থাপনের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার পর আনসার সদস্য মোতায়েনের পর এবার উপজেলা কমপ্লেক্সে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
বৈঠকে আইজিপি বলেন, সম্প্রতি পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা হচ্ছে। এতে পুলিশের মনোবল ভেঙে যাচ্ছে। কাজের গতি কমে যাচ্ছে। এ থেকে কীভাবে উত্তরণ পাওয়া যায়, সেজন্য সবার সহযোগিতা চান তিনি। পরে কমিটির সভাপতি বলেন, ‘বিষয়টি খতিয়ে দেখতে হবে। পুলিশের জন্য দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখন অনেক ভালো। এই পরিস্থিতি সবাইকে ধরে রাখতে হবে।’
মেজর (অব.) সিনহা হত্যা : আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, ‘সিনহা হত্যা যৌথভাবে তদন্ত হচ্ছে। তদন্ত রিপোর্ট অনুসারে দোষীদের বিরুদ্ধে আইন খুব কঠোরভাবে প্রয়োগে আমরা দৃঢ়প্রত্যয়ী।’ তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশে বিএনপির দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘রিপোর্ট প্রকাশের বিষয়টি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিবেচনায় নিতে পারে। আমাদের কাছে প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেই।’
রোহিঙ্গাদের ২৪ ওয়াচ টাওয়ার মনিটর : বৈঠকে বলা হয়, রোহিঙ্গাদের বিষয়ে সেখানে কিছু আন্তর্জাতিক পৃষ্ঠপোষকতা আছে এনজিওদের নামে, যাতে রোহিঙ্গারা বিভিন্নভাবে দ্বিধাবিভিক্ত হয়ে মারামারি বা মাদকদ্রব্য ও অপরাধের সঙ্গে জড়িত হচ্ছে। এগুলো নিয়ন্ত্রণের জন্য সিদ্ধান্ত হয়েছে। অচিরেই ভালোভাবে ফাইন্যান্সিংয়ের ব্যবস্থা করা হবে এবং ২৪টি টাওয়ার নির্মাণ করে ২৪ ঘণ্টা মনিটর করা হবে। কোন এনজিও অপব্যবহার করছেএমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘গোয়েন্দা সংস্থা কিছু কিছু নাম বলেছে। সুনির্দিষ্টভাবে তারা কী খারাপ কাজ বা অন্যায় কাজ করছে, তার রিপোর্ট আমরা তাদের পেশ করতে বলেছি।’
মাদকের পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিতের নির্দেশ : বৈঠকে জানানো হয়, দেশের বিশাল এলাকা সীমান্ত, অনেক দুর্গম এলাকাও রয়েছে। সেখান দিয়ে অপরাধীরা সহজেই প্রবেশ করে। আমাদের ধারণা, ১০/২০ টাকার মাদকের ট্যাবলেট ৩০০-৪০০ টাকায় বিক্রি হয়। ফলে সহজেই অনেকের মাথা কিনে ফেলে কারবারিরা। গোয়েন্দা সংস্থাকে বলা হয়েছে, আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদের চিহ্নিত করতে। আরও বেশি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অভিযানের সঙ্গে মাদকবিরোধী নতুন আইনও হয়েছে।
পুরো উপজেলা কমপ্লেক্সে নিরাপত্তা : শুধু ইউএনওর বাসভবন নয়, পুরো উপজেলা কমপ্লেক্সেই নিরাপত্তা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন মোজাম্মেল হক। তিনি বলেন, ‘ইতিমধ্যে ইউএনওদের বাসভবনে আনসার মোতায়েন করেছি। আজকে আমরা সংশোধন করে বলেছি- পুরো উপজেলা কমপ্লেক্সে নিরাপত্তা দিতে। কারণ, সেখানে আরও অফিসার ও তাদের পরিবার বাস করে, তাদেরও নিরাপত্তার প্রশ্ন রয়েছে।’
বৈঠকে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহম্মদ কায়কাউস, স্বরাষ্ট্র সচিব মোস্তাফা কামাল উদ্দীন, পুলিশের মহাপরিদর্শক ড. বেনজীর আহমেদ, র্যাব মহাপরিচালক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন, ডিএমপি কমিশনার সফিকুল ইসলাম, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধি, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। এছাড়া ভার্চুয়ালি বৈঠকে যুক্ত হন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী।