খালেদাকে বিদেশ যেতে দিতে প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাজা স্থগিত করে দ্বিতীয় দফায় ছয় মাস মুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর যে সুপারিশ আইন মন্ত্রণালয় করেছে তার নির্দেশের কপি এখনো পায়নি তার পরিবার। খালেদা জিয়ার পরিবারের অনুরোধ, আইন মন্ত্রণালয়ের সুপারিশের কপি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে গেলে তিনি যেন উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়ার বিষয়টি অনুমোদন করেন। গতকাল বুধবার দেশ রূপান্তরকে এ কথা জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জিয়া পরিবারের এক সদস্য। পাশাপাশি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলটির নেতারা ও খালেদা জিয়ার আইনজীবীরাও একই দাবি করেছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জিয়া পরিবারের এক সদস্য বলেন, প্রথমে যে আবেদন করা হয়েছিল তাতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল পরিবার খালেদা জিয়ার মুক্তি চায় এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশ নিতে চায়। কিন্তু প্রথম দফায় সরকারের নির্বাহী আদেশে মুক্তির সময় বিদেশে না গিয়ে দেশেই চিকিৎসা নিতে বলা হয়। এ অবস্থায় দ্বিতীয় দফা আবেদনেও উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশ নেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারের কাছে আমাদের আবেদন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেন বিষয়টি বিবেচনায় নেন। এই মুহূর্তে বিদেশে না গেলেও বছরের শেষ দিকে যুক্তরাজ্যের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে যেন তাকে বিদেশে নিয়ে উন্নত চিকিৎসা দেওয়া যায়।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, দ্বিতীয় দফায় চেয়ারপারসনের মুক্তির মেয়াদ ছয় মাস বাড়ানোর বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্তের কপি এখনো পাননি তারা। খালেদা জিয়াকে বিদেশে নিয়ে উন্নত চিকিৎসা দেওয়া দরকার। কিন্তু সরকার সে বিষয়ে অনুমতি দেয়নি। আইনমন্ত্রী ছয় মাস সময় বাড়ানোর বিষয়ে মতামত দিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আবেদনটি প্রধানমন্ত্রীর কাছে যাবে। আমরা আশা করি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মানবিক কারণে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করবেন।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও দলটির চেয়ারপারসনের আইনজীবী ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার নির্বাহী ক্ষমতাবলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সাজা স্থগিত করে ছয় মাসের জন্য মুক্তি দিয়েছেন। উদ্দেশ্য তার চিকিৎসা। কিন্তু দেশে তার চিকিৎসা করানো সম্ভব হচ্ছে না। এ অবস্থায় আইন মন্ত্রণালয় পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে দ্বিতীয় দফায় ছয় মাস মুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। সেই সুপারিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে যাবে। সেখান থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে। আমরা আশা করি প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি বিবেচনা করবেন।

৩ সেপ্টেম্বর আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সাংবাদিকদের জানান, খালেদা জিয়ার মুক্তির মেয়াদ আরও ছয় মাস বাড়ানোর অভিমত দিয়েছে আইন মন্ত্রণালয়। করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশে বাসায় থেকে চিকিৎসা নেওয়ার পুরনো শর্তে তার সাজা ছয় মাসের জন্য স্থগিত করার পক্ষে এই মত তারা দিয়েছেন। আইনগত দিক থেকে সাজা ছয় মাস স্থগিত করে এ সময় পর্যন্ত তার মুক্ত থাকার মেয়াদ বাড়ানোর মতামত দেওয়া হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়ের এই মতামত তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছেন। এখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে বিষয়টি পাঠানো হবে।

এদিকে মহিলা দলের ৪২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সকালে শেরেবাংলা নগরে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের সমাধিতে পুষ্পমাল্য অর্পণ শেষে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, সরকারি আদেশে চিকিৎসার জন্য দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বাইরে যাওয়ার নিষেধাজ্ঞাটা অমানবিক। সুচিকিৎসার জন্য প্রয়োজনে তিনি যাতে বিদেশে যেতে পারেন, সে ব্যাপারে যে বিধিনিষেধ সেটা প্রত্যাহার করাটা মানবিক একটা কর্ম বলে আমরা মনে করি। এটা আমাদের দাবি।

গত ২৭ আগস্ট পরিবারের পক্ষ থেকে খালেদা জিয়ার ছোট ভাই শামীম ইস্কান্দার সাজা স্থগিতের মেয়াদ বাড়াতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন। সেই আবেদন আইন মন্ত্রণালয়ে যায় পরীক্ষার জন্য। এ বিষয়ে ৩ সেপ্টেম্বর আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সাংবাদিকদের জানান, খালেদা জিয়ার দ-ের কার্যকারিতা আরও ৬ মাসের জন্য স্থগিত রাখার বিষয়ে সম্মতিসূচক মতামত দিয়েছে আইন মন্ত্রণালয়।

খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা তুলে ধরে নজরুল ইসলাম খান বলেন, আলহামদুলিল্লাহ, তিনি এখন ঘরে থাকতে পারছেন, যদিও নানা বিধিনিষেধের মধ্যে। একজন মানুষ তার বয়স প্রায় ৭৬ বছর। তিনি দারুণভাবে অসুস্থ আমরা সবাই জানি। তাকে বিদেশে চিকিৎসা নিতে হয়েছে এবং তার উন্নত চিকিৎসা নেওয়া দরকার। দীর্ঘদিন তিনি হাসপাতালে ছিলেন কিন্তু সুস্থ হতে পারেননি।

দুর্নীতির দুই মামলায় দন্ডিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে গত ২৫ মার্চ নির্বাহী আদেশে সাময়িক মুক্তি দেয় সরকার। সরকারের নির্বাহী আদেশে সাজা স্থগিতের পর খালেদা জিয়া মুক্তিলাভ করে গুলশানে নিজের ভাড়া বাসা ‘ফিরোজা’য় ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তিনি আর্থ্রাইটিসের ব্যথা, ডায়াবেটিস, চোখের সমস্যাসহ বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যায় ভুগছেন।

২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় পাঁচ বছরের সাজায় কারাজীবন শুরু করেন খালেদা জিয়া। পরে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায়ও তার সাজার রায় হয়। তার বিরুদ্ধে আরও ৩৪টি মামলা রয়েছে।