বেড়ানোর নামে ২২ বছরের এক তরুণীকে ধর্ষণ ও হত্যার ৭ মাস পর ধরা পড়ল স্বামী-স্ত্রী। স্ত্রীর শর্ত পূরণ করতেই স্বামী হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে পুলিশের তদন্তে বের হয়ে এসেছে। পুলিশের জেরার মুখে অবশেষে এ হত্যার দায় স্বীকার করে তারা।
হবিগঞ্জ পুলিশ সুপার মোহাম্মদ উল্ল্যা এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের জানান, ৭ ফেব্রুয়ারি বেলা সোয়া ১২টায় চুনারুঘাট উপজেলার রানীগাঁও ও চাটপাড়া গ্রামের মাঝামাঝি যোগীর আসন টিলায় এক অজ্ঞাতনামা তরুণীর রক্তাক্ত মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এরপর চুনারুঘাট থানায় পুলিশ একটি মামলা করে।
পুলিশের জেরার মুখে আসামিরা জানিয়েছে, নিহত তরুণীর নাম রোকসানা আক্তার মিষ্টি (২২)। তিনি নোয়াখালীর চাটখিলের কামালপুর গ্রামের মৃত খোরশেদ আলী মজুমদার ও সেলিনা আক্তার দম্পতির কন্যা। বর্তমানে তারা মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার রূপশপুরে বসবাস করছেন। মিষ্টি মৌলভীবাজার শহরে একটি বেসরকারি কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করত।
পুলিশ জানায়, ২৫ আগস্ট চুনারুঘাটের করাঙ্গী নদীর কাছে ফারুক নামের এক লোককে ঢাকা থেকে এনে হত্যার উদ্দেশ্যে ছুরিকাঘাত করা হয়। উক্ত ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ জানতে পারে উপজেলার পাচারগাঁও গ্রামের আফসার এ ঘটনায় জড়িত। তিনি পরিচয় গোপন করে কাওছার নামে হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। পুলিশ তাকে পর্যবেক্ষণে রাখে। বুধবার তাকে শায়েস্তাগঞ্জ থেকে আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদে তার মুখ দিয়ে বের হয়ে আসে মিষ্টি হত্যার কাহিনি।
পুলিশ সূত্রে প্রকাশ, মিষ্টি তার মায়ের সঙ্গে রাগ করে বাড়ি থেকে বের হয়ে মৌলভীবাজার শহরে বাসাভাড়া করে থাকতেন। হত্যার প্রায় এক মাস আগে একদিন ঘটনাচক্রে আফসারের স্ত্রী রিপার সঙ্গে মিষ্টিসহ আরেক তরুণীর পরিচয় হয়। তারা থাকার জন্য মৌলভীবাজার শহরে ভাড়া বাসা খুঁজছিলেন। রিপা শহরের দরগামহল্লা এলাকায় একটি বাসায় থাকেন। তিনি মিষ্টি ও ওই তরুণীকে তাদের বাসায় উপ-ভাড়াটে (সাবলেট) হিসেবে থাকার প্রস্তাব দেন। প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান তারা। কিছুদিন পর অন্য তরুণী সেখান থেকে চলে যান। পরবর্তীতে মিষ্টির সঙ্গে রিপার স্বামী মো. আফসার মিয়ার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একপর্যায়ে তা দৈহিক সম্পর্কে গড়ায়। বিষয়টি নিয়ে স্বামী আফসার মিয়ার সঙ্গে রিপার সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে।
পুলিশ জানায়, ৫ ফেব্রুয়ারি রিপা হবিগঞ্জ সদর থানাধীন ধুলিয়াখালের সৎ বাবার বাড়িতে চলে আসেন। পরদিন সন্ধ্যায় আফসার মিয়া তার স্ত্রী রিপাকে ফোন করে দুঃখ প্রকাশ ও অভিমান ভাঙানোর চেষ্টা করে। রিপা শর্ত দেন যে, মিষ্টিকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিলে সে সংসার করবে। স্ত্রীর শর্তে রাজি হয়ে যায় আফসার। মোবাইলে আলাপ করার সময়ে তারা পরিকল্পনাও করে ফেলেন।
ওই দিন রাতেই মিষ্টিকে সঙ্গে নিয়ে মৌলভীবাজার থেকে আফসার শায়েস্তাগঞ্জ নতুন ব্রিজে আসেন। এরপর মিষ্টি ও আফসার রিপাকে শায়েস্তাগঞ্জ নতুন ব্রিজ এলাকায় আসার জন্য অনুরোধ করলে রিপা রাত অনুমান সাড়ে ৮টায় সেখানে আসেন। রিপা সেখানে পৌঁছে আফসারকে শর্তের কথা মনে করিয়ে দেন। এ অবস্থায় রিপার ক্রমাগত চাপে রিপার স্বামী আফসার নতুন ব্রিজের ফুটপাত সংলগ্ন একজন পান বিক্রেতার কাছে থেকে কৌশলে একটি ধারালো কাঁচি সংগ্রহ করে প্যান্টের পকেটে লুকিয়ে রাখে।
এরপর রাত ১০টায় তারা চুনারুঘাটের পাচারগাঁওয়ে আফসারের বাড়িতে পৌঁছায়। খাওয়া-দাওয়া শেষে মৌলভীবাজারে ফিরে যাওয়ার কথা বলে রিপা ও আফসার মিষ্টিকে নিয়ে রওনা হয়। যোগীর আসন টিলায় নিয়ে আসার পর স্ত্রী রিপার সহায়তায় আফসার মিষ্টিকে ধর্ষণ করে। এরপর স্বামী-স্ত্রী মিলে মিষ্টির ওড়না নিয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে তাকে হত্যা করে। মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য আফসার তার সঙ্গে আনা ধারালো কাঁচি দিয়ে মিষ্টির থুতনির নিচে গলায় সজোরে ঘাঁই মারে। এরপর আফসার নিহত মিষ্টির পরিচয় গোপন রাখার জন্য তার পড়নের জিনস প্যান্ট খুলে নেয়।
এ ছাড়া মোবাইল ফোন ও ভ্যানিটি ব্যাগ নিয়ে যায়। মিষ্টির জুতাসহ অন্যান্য পরিধেয় বস্ত্র এ ছাড়া হত্যায় ব্যবহৃত রক্তমাখা কাঁচি (সিজার) ঘটনাস্থলে ফেলে যায়। এরপর তারা দুজনে ওই রাতেই মৌলভীবাজার শহরে ফিরে যায়। ভিকটিমের মোবাইল ফোনটি আসামি আফসার মৌলভীবাজার শহরে এক অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে দেয়।
মামলাটি তদন্তকারী কর্মকর্তা ওসি চম্পক ধাম জানান, বৃহস্পতিবার আদালতে দোষ স্বীকার করে আসামিরা জবানবন্দি দেন।