পরিপ্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০২১-২০৪১ জন অবহিতকরণ সভায় বক্তারা

মধ্য আয়ের ফাঁদ নিয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ

বাংলাদেশকে মিডেল ইনকাম ট্র্যাপ (এমআইটি) বা মধ্য আয়ের ফাঁদ নিয়ে সজাগ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন সরকারের নীতিনির্ধারকরা। তারা বলেছেন, বাংলাদেশের আগামী ২০৪১ সালের মধ্যে উচ্চ আয়ের দেশে যাওয়ার পথে মধ্য আয়ের ফাঁদে যাতে আটকে না পড়ে, সেদিকে সজাগ থাকতে হবে। থাইল্যান্ডের উদাহরণ টেনে তারা বলেছেন, দেশটির অর্থনীতি রপ্তানিপ্রবণতায় মন্দাগতির কারণে ঔজ্জ্বল্য হারিয়ে ফেলেছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার ভারে এর অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালন দক্ষতা দুর্বল হয়ে পড়েছে। এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশকে মধ্য আয়ের ফাঁদ থেকে রক্ষা করতে চাহিদা ও সরবরাহ নীতিমালার সঠিক মিশ্রণ খুঁজে বের করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০২১-২০৪১ জন অবহিতকরণ সভায় বক্তারা আরও বলেন, সরকার অনেক সুন্দর সুন্দর পরিকল্পনা গ্রহণ করলেও কাগজে তৈরি এসব পরিকল্পনা অনেকে পড়েও দেখে না। যেসব পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে, সেগুলো বাস্তবায়নেরও তাগিদ দেন তারা।

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলমের সঞ্চালনায় সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। বিশেষ অতিথি ছিলেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমেদ কায়কাউস। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন পরিকল্পনা বিভাগের সিনিয়র সচিব আসাদুল ইসলাম, বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সচিব প্রদীপ রঞ্জন চক্রবর্তী, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব ইয়ামিন চৌধুরী, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব ফাতিমা ইয়াসমিন, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সচিব) জাকির হোসেন আকন্দ, আবুল কালম আজাদ, শামীমা নার্গিসসহ অন্যরা বক্তব্য দেন।

প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আহমেদ কায়কাউস বলেন, অনেকে বলেন স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে খরচের জন্য বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর ২৫ থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা বাইরে চলে যায়। আমাদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষাব্যবস্থা যদি ভালো হতো, উন্নত হতো, তাহলে এত টাকা বিদেশে চলে যেত না। তিনি বলেন, আমাদের দেশের গবেষকদের মধ্যে সব সময় সরকারবিরোধী মনোভাব দেখা যায়, এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। সরকার যেসব পরিকল্পনা হাতে নেয়, সেগুলো বাস্তবায়ন করে। বাংলাদেশের অর্জন কম নয়। আমরা পলিথিনমুক্ত হয়েছি, বিশ্বের প্রথম আমরাই জলবায়ু তহবিল গঠন করেছি। এ রকম অনেক অর্জন রয়েছে। সেগুলো মনে রাখতে হবে। করোনার সময়ে ভারতের অর্থনীতি ২৪ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে, বাংলাদেশে তা হয়নি বলেও জানান আহমেদ কায়কাউস। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আরও বলেন, বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হলে সুযোগ-সুবিধা হারাবে বলে অনেকে আশঙ্কা করেন। কিন্তু আমি মনে করি, বাংলাদেশের জন্য অনেক সম্ভাবনা তৈরি হবে। তার মতে, রাজনীতি নেতৃত্বের কারণে বাংলাদেশে সঠিক পরিকল্পনা করা হয়েছে এবং তা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব বলেন, ভারত ও মিয়ানমার থেকে পাওয়া ১ লাখ ১৮ হাজার বর্গকিলোমিটারের বিশাল নীল সমুদ্র অর্থনীতি পেলেও এখান থেকে আমাদের অর্জন শূন্য। নীল সমুদ্র অর্থনীতি থেকে সুফল পেতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে মাত্র ৫০ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেওয়া হচ্ছে। আমরা তাদের বলেছি, এই প্রকল্প ৫০ কোটি টাকা নয়, ৫০০ কোটি টাকার প্রকল্প আনতে হবে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব বলেন, শুধু সমালোচনা নয়, অপেক্ষা করতে হবে। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মাধ্যমে অনেক বিষয় সমাধানের পথে যাবে। আমরা সফলভাবে এমডিজি বাস্তবায়ন করেছি। আমাদের অনেক অভিজ্ঞতা আছে। তবে মনে রাখতে হবে ২০২১-২০৪১ পরিপ্রেক্ষিত পরিকল্পনাটি নির্দেশনামূলক পরিকল্পনা। এটা কোনো বিনিয়োগ পরিকল্পনা নয়। বিনিয়োগ পরিকল্পনা হচ্ছে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) এবং পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা। বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে আমরা ব্যবসা সহজ করতে কাজ করছি। ছোটখাটো কিছু কাজ করলেই এই সূচকে আমরা অনেক এগিয়ে যেতে পারব।

পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য আবুল কালাম আজাদ বলেন, সরকার অনেক পরিকল্পনা গ্রহণ করে। কিন্তু কেউ পরিকল্পনাটি পড়ে দেখে না সেখানে কী লেখা আছে। সরকারের পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন হয় না। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দক্ষতা মন্ত্রণালয়গুলোর আছে কি না, তা-ও দেখার বিষয়। সবাই সঠিকভাবে কাজ করছে কি না, তা মূল্যায়ন করতে হবে।

ইআরডি সচিব ফাতিমা ইয়াসমিন বলেন, থাইল্যান্ডের মতো বাংলাদেশ যাতে মধ্য আয়ের ফাঁদে না পড়ে, সেদিকে বিশেষ নজর রাখতে হবে। একই মত পোষণ করেন পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব ইয়ামিন চৌধুরী।

সভায় পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ বিশে^র মধ্যে অন্যতম একটি পরিকল্পিত দেশ। বাংলাদেশের মতো এত পরিকল্পনা বোধ হয় অন্য কোনো দেশে নেই। আমাদের এখানে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা আছে, দশ বছর মেয়াদি, ২০ বছর মেয়াদি এমনকি শতবর্ষী পরিকল্পনাও রয়েছে। সরকার এসব পরিকল্পনা তৈরি করে থেমে যায়নি। এগুলো বাস্তবায়নও করা হচ্ছে। পরিকল্পনামন্ত্রী আরও বলেন, রূপকল্প ২০৪১ পরিকল্পনাটি হচ্ছে আগামীর জন্য ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। সম্ভাবনা থেকে এটি তৈরি করা হয়েছে। পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে যাওয়ার কারণেই বর্তমানে আমাদের দেশের জন্য সুসময় বয়ে যাচ্ছে। তবে করোনাভাইরাসের যন্ত্রণাও আছে। কিন্তু সেটি আমাদের একার নয়। সবার একই সমস্যা।

পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ড. শামসুল আলম বলেন, আগামী ২০৪১ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার ৩ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে চরম দারিদ্র্য নেমে আসবে ১ শতাংশের নিচে। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে এর বাস্তবায়ন শুরু হচ্ছে শিগগিরই। তিনি বলেন, পরিপ্রেক্ষিত পরিকল্পনাটি হচ্ছে একটি ভিশনারি দলিল। এর মধ্যে বিস্তারিত সব কিছু আশা করা ঠিক নয়। এটি একটি দিকনির্দেশনামূলক দলিল। তিনি বলেন, ২০৪১ সালে মানুষের প্রত্যাশিত গড় আয়ুষ্কাল বেড়ে দাঁড়াবে ৮০ বছরে। ২০৪১ সালে বাংলাদেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধি হবে ৯ দশমিক ৯ শতাংশ।