যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নির্বাচনী প্রচারণায় বেশ কিছু প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এসব প্রতিশ্রুতির কয়েকটি নিয়ে নির্বাচনের আগে ও পরে আলোচনা হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমদের প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা, মেক্সিকো সীমান্তে প্রাচীর নির্মাণসহ বেশ কয়েকটি বিষয়। ২০১৬ সালের ওই নির্বাচনের পর হোয়াইট হাউজে ট্রাম্পের চার বছর কেটে গেছে। তো এসব প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে কতটা সফল হয়েছেন তিনি? বিবিসির এক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে সেই চিত্র।
কর হ্রাস : নির্বাচনের আগে তিনি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের করপোরেট কর এবং কর্মজীবী নাগরিকদের বড় ধরনের কর হ্রাসের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে সেটি বাস্তবায়ন হয়। তবে ট্রাম্প করপোরেট কর ৩৫ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করার কথা বলেছিলেন, কিন্তু সেটা হয়েছে ২১ শতাংশ। এ ছাড়া কর্মজীবী নাগরিকদের করও হ্রাস করা হয়েছে।
প্যারিস জলবায়ু চুক্তি : নির্বাচনের আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প জলবায়ুর পরিবর্তনকে ভুয়া বলে প্রচারণা চালিয়েছেন। তিনি বলেছিলেন, প্যারিস চুক্তিতে যেসব শর্তের কথা বলা হয়েছে, সেগুলো আমেরিকার অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে। তাই এই চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র থাকবে না। নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি প্যারিস চুক্তি থেকে বের হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
ইসলামিক স্টেটের ওপর বোমা হামলা : আইওয়া অঙ্গরাজ্যে ২০১৫ সালের নভেম্বর মাসে নির্বাচনী প্রচারণার সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে ইসলামিক স্টেটের ওপর তিনি এমন বোমা হামলা চালাতে চান, যাতে চরমপন্থি এ গ্রুপটি ধ্বংস হয়ে যায়। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি আফগানিস্তানের ইসলামিক স্টেটের একটি ঘাঁটির ওপর অত্যন্ত শক্তিশালী বোমা নিক্ষেপ করেছিলেন। ইরাক ও সিরিয়া থেকে আইএসকে বিতাড়িত করার ব্যাপারেও তিনি কৃতিত্ব দাবি করেন। আইএসের নেতা আবু বকর আল-বাগদাদি ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কমান্ডোদের চালানো এক অভিযানের সময় আত্মহত্যা করেন।
ইসরায়েলে মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তর : নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্প ইসরায়েলে মার্কিন দূতাবাস তেল আবিব থেকে জেরুজালেমে সরিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন। সেই অনুযায়ী ২০১৭ সালে জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন। ২০১৮ সালের মে মাসে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ৭০তম বার্ষিকীতে জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস খোলা হয়।
সৈন্যদের দেশে ফিরিয়ে আনা : মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সৈন্যদের ফিরিয়ে আনা ছিল ডোনাল্ড ট্রাম্পের দীর্ঘ দিনের দাবি। নির্বাচনী প্রচারণার সময় তিনি বলেছিলেন, এই অঞ্চল পুরোপুরি বিশৃঙ্খল হয়ে পড়েছে। তিনি বলেছেন, সেখানে যে হাজার হাজার কোটি ডলার খরচ করা হয়েছে সেটা যুক্তরাষ্ট্রে করা হলে অনেক ভালো হতো। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে সিরিয়া থেকে সব মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের কথা ঘোষণা করেন। তবে এখনো সেখানে ৫০০ সৈন্য মোতায়েন রয়েছে। সম্প্রতি আফগানিস্তান থেকে আরও সৈন্য প্রত্যাহারের কথা বলেছেন তিনি। ইতিমধ্যে এই সংখ্যা ১৩ হাজার থেকে কমিয়ে করা হয়েছে ৮ হাজার ৬০০। ইরাক থেকেও সৈন্য ফেরার ঘোষণা অতিসম্প্রতি দিয়েছেন তিনি।
বাণিজ্য চুক্তি : প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প নাফটা চুক্তিকে বিপর্যয়কর বলে উল্লেখ করেছিলেন। টিপিপি চুক্তির বিরুদ্ধেও অবস্থান নিয়েছিলেন তিনি। প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনার। ক্ষমতা গ্রহণের কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশিপ বা টিপিপি চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মধ্যে আলোচনার পর এ তিনটি দেশের মধ্যে বাণিজ্যসংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। নাফটা চুক্তির পরিবর্তে এই চুক্তিটি কাজ করবে। এরপর অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র চীনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। দুটো দেশই একে অপরের পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করেছে। এই উত্তেজনা সত্ত্বেও দুটো দেশ ফেজ ওয়ান নামে একটি চুক্তি করেছে; যার ফলে বাণিজ্যযুদ্ধ কিছুটা কমে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মুসলিমদের ওপর নিষেধাজ্ঞা : ট্রাম্প শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রে সব মুসলিমের প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন এ বিষয়ে কর্র্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগ পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে। তবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি দুটো ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেন, যা পরে আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। কিন্তু তৃতীয় আরেকটি নিষেধাজ্ঞার তেমন অসুবিধা হয়নি।
কিউবার সঙ্গে সম্পর্ক : নির্বাচিত হওয়ার আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন কিউবার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা ও বাণিজ্যের ব্যাপারে বারাক ওবামার উদ্যোগ তিনি বাতিল করে দেবেন। প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর মায়ামিতে তিনি বলেছিলেন, ওবামা প্রশাসনের একপাক্ষিক সমঝোতা তিনি বাতিল করে দেবেন। কিছু দিন আগে ট্রাম্প প্রশাসন ঘোষণা করেছে যে তারা দুটো দেশের মধ্যে ব্যক্তিগত বিমানের ফ্লাইট অক্টোবর থেকে স্থগিত করবে।
ওবামাকেয়ার : ট্রাম্পের যেসব নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নিয়ে সবচেয়ে বেশি কথাবার্তা হয়েছে তার একটি ওবামাকেয়ার। তার পূর্বসূরি বারাক ওবামা জনগণকে স্বাস্থ্যবীমার আওতায় নিয়ে আসার লক্ষ্যে এই আইন তৈরি করেছিলেন, যা ওবামাকেয়ার নামে পরিচিত। ট্রাম্প বলেছিলেন নির্বাচিত হলে তিনি এটা বাতিল করে দেবেন। তবে রিপাবলিকানরা এই উদ্যোগকে অপছন্দ করেন। কিন্তু এই আইন বাতিল বা সংস্কার করতে তারা ব্যর্থ হয়েছেন। তবে ট্রাম্প প্রশাসন আইনের কিছু কিছু পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছে।
মেক্সিকো সীমান্তে প্রাচীর : ডোনাল্ড ট্রাম্পের যেসব প্রতিশ্রুতি নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক হয়েছে তার একটি ছিল মেক্সিকোর সঙ্গে সীমান্তে দেয়াল তুলে দেওয়া। তিনি এ-ও বলেছিলেন যে এই প্রাচীর নির্মাণে প্রয়োজনীয় খরচ দেবে মেক্সিকো। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই দাবিকে গুরুত্ব দেয়নি মেক্সিকো। পরে ট্রাম্পও এ বিষয়ে খুব বেশি সোচ্চার হননি। একবারে নতুন নির্মিত হয়েছে তিন মাইল।
অবৈধ অভিবাসীদের বহিষ্কার : ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সমর্থকদের বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রে যারা অবৈধভাবে বসবাস করছে, তাদের দেশ ছেড়ে চলে যেতে হবে। দেশটিতে এ রকম অভিবাসীর সংখ্যা ১ কোটি ১৩ লাখ। নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে তার গলার স্বর নরম হতে থাকে। নির্বাচিত হওয়ার পর এই সংখ্যাকে তিনি ২০ থেকে ৩০ লাখে নামিয়ে আনেন।
সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগ : নির্বাচনের আগে ট্রাম্প বলেছিলেন যে তিনি বিচারক খুঁজছেন এবং এ রকম ২০ জনকে তিনি খুঁজে পেয়েছেন যারা দ্বিতীয় সংশোধনীকে সম্মান করবেন। পরে তিনি দুজন বিচারক নিয়োগ দিয়েছেন। এ ছাড়া প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিম্ন আদালতগুলোয় ২০০ রক্ষণশীল বিচারক নিয়োগ দিয়েছেন।
ন্যাটো ত্যাগ : ডোনাল্ড ট্রাম্প সামরিক জোট ন্যাটোর উদ্দেশ্য নিয়ে বারবার প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলছেন, এই জোট ‘সেকেলে’ হয়ে গেছে। ন্যাটোর সদস্যরা তাদের দায়িত্ব পালন করছে কি না এবং তারা প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান দিচ্ছে কি না, এসব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এবং এ বিষয়ে তিনি বরাবরই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। নির্বাচিত হওয়ার পর ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে ন্যাটোর মহাসচিবকে হোয়াইট হাউজে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। সে সময় তিনি তাকে বলেছিলেন এই জোটের গুরুত্ব কমে গেছে। তবে ওই বছরের জুলাই মাসে ন্যাটোর সম্মেলনের প্রতি পুনরায় তার সমর্থনের কথা জানান।
নির্যাতন : ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন নির্বাচিত হলে পানিতে মুখ ডুবিয়ে স্বীকারোক্তি আদায়ের যে কৌশল তাতে তিনি অনুমোদন দেবেন। এই কৌশল ওয়াটারবোর্ডিং নামে পরিচিত। তবে নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি তার এই পরিকল্পনা স্থগিত করেছেন।
হিলারি ক্লিনটনের বিচার : হিলারি ক্লিনটন যখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন তখন তার ব্যক্তিগত ই-মেইল ব্যবহারের অভিযোগে তার বিচার করার কথা বলেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। বলেছিলেন, নির্বাচিত হলে তিনি তাকে জেলে পাঠাবেন। তবে নির্বাচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এ বিষয়ে তিনি তার সুর পরিবর্তন করে ফেলেন। ট্রাম্পের ভাষ্য, অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য তার কাছে আরও কিছু বিষয় আছে।