বরিশালে শিক্ষকের গালমন্দ এবং পিটুনি খাওয়ায় নুসরাত জাহান নোহা নামে তৃতীয় শ্রেণির স্কুল শিক্ষার্থী গালায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে মেয়ের মা দাবি করেছে এটা আত্মহত্যা নয়, হত্যা।
এঘটনায় স্কুল শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন নিহত শিশুর বাবা সুমন মিয়া। পুলিশ বলেছে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করা হবে।
গত বুধবার দুপুরে বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার বাগধা ইউনিয়নের খাজুরিয়া গ্রামের নিজ বসত ঘরের আড়ার সঙ্গে ওড়না ও গামছা পেঁচিয়ে গলায় ফাঁস দেওয়া অবস্থায় নুসরাত জাহান নোহার লাশ উদ্ধার করা হয়।
ঘটনার পর বুধবার রাতে দারুল ফালাহ্ প্রি ক্যাডেট একাডেমির সহকারী শিক্ষক শফিকুল ইসলাম সুমন পাইককে আসামি করে মামলা দায়ের করেছেন শিশুর বাবা সুমন মিয়া।
নিহত শিশু নুসরাত জাহান নোহা উপজেলার বাগধা ইউনিয়নের খাজুরিয়া গ্রামের বাসিন্দা সুমন মিয়ার সন্তান এবং স্থানীয় দারুল ফালাহ্ প্রি ক্যাডেট একাডেমির তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, নুসরাতের বাবা সুমন মিয়া চারটি বিয়ে করেছেন। তানিয়া-সুমনের কন্যা শিশু নুসরাত জাহান নোহা। নুসরাতের বয়স যখন ৫ বছর তখন সুমন আরেকটি বিয়ে করেন। এক পর্যায়ে নুসরাতের মা তানিয়ার সঙ্গে সুমনের ছাড়াছাড়ি হয়। সেই থেকে নুসরাত সৎ মা ঝুমুর বেগম ও বাবা সুমনের কাছে থাকত।
নুসরাতের বাবা সুমনের অভিযোগ, গত ৫ সেপ্টেম্বর ক্যাডেট একাডেমিতে মাসিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। ৯ সেপ্টেম্বর দুপুরে ওই পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। প্রকাশিত ফলাফলে নুসরাত অকৃতকার্য হওয়ায় ওই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক শফিকুল ইসলাম সুমন পাইক তাকে ক্লাস রুমে নিয়ে অন্য শিক্ষার্থীদের সামনে হাতে লাঠি দিয়ে পেটায় এবং গালমন্দ করে। এতে স্কুল ছাত্রী কষ্ট পায় এবং বাড়িতে ফিরে গিয়ে কান্নাকাটি করে। পরে দুপুরে সবার অজান্তে বসত ঘরের দোতলার আড়ার সঙ্গে ওড়না ও গামছা দিয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে।
এদিকে নুসরাত জাহান নোহার মা তানিয়া বেগম অভিযোগ করেন, নুসরাত সৎ মায়ের সঙ্গে থাকতো। নুসরাতকে তিনি তার কাছে নিতে চাইলেও দেওয়া হয়নি। এমনকি তার সঙ্গে মোবাইলে কথা বলতেও দেওয়া হতো না। বলা হচ্ছে তার মেয়ে ঘরের আড়ার সঙ্গে ওড়না-গামছা পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেছে। কিন্তু এই ছোট্ট মেয়ের পক্ষে সেখানে ওড়না বা গামছা বাধা সম্ভব নয়। এতটুকু বাচ্চা ওপরে উঠে গলায় ফাঁস দিতে পারে না। বাবা ও সৎ মা মিলে নুসরাতকে হত্যা করেছে। তানিয়া বেগম তদন্ত করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন।
নুসরাতের নানি তাসলিমা বেগম বলেন, গত রবিবার নুসরাতের দাদা আবদুর রহিম তার বাড়িতে এসে বলেছেন, তিনি তার সব সম্পত্তি খুব শিগগিরই নুসরাতের নামে দলিল করে দেবেন। এ কথা তিনি ছেলে সুমন ও নুসরাতের সৎ মা ঝুমুর বেগমকে জানিয়ে দিয়েছেন বলেও তাকে জানিয়েছেন। তার অভিযোগ, নুসরাত আত্মহত্যা করেনি। সম্পত্তির লোভে তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে লাশ ঝুলিয়ে রেখে আত্মহত্যা বলে চালানো হয়েছে।
নুসরাতের দাদা আবদুর রহিম মিয়া বলেন, তিনি নুসরাতের নামে সম্পত্তি লিখে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। গত রবিবার সকালে নুসরাতের নানির বাড়ি গিয়ে এ কথা বলেও এসেছেন। তিনি বলেন, আমি এ বিষয় কোনো কথা বলব না, আল্লাহ সব দেখেন, তিনিই বিচার করবেন।
আগৈলঝাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আফজাল হোসেন বলেন, শিক্ষকের বকাঝকা এবং মারের কারণে আত্মহত্যা করেছে শিশু নুসরাত এমন অভিযোগে একটি মামলা হয়েছে। মামলায় মৃত্যুর জন্য শিক্ষক শফিকুল ইসলাম পাইককে দায়ী করা হয়েছে। ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত ওই শিক্ষক পলাতক রয়েছে। তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
বরিশালের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. নাইমুল হক বলেন, আগৈলঝারা থানা এলাকায় নুসরাত জাহান নোহা নামে এক শিশু স্কুল পরীক্ষায় কম নম্বর পাওয়া এবং শিক্ষক কর্তৃক বেত্রাঘাতের ঘটনায় আত্মহত্যা করেছে বলে তার বাবা বাদী হয়ে মামলা করেছে। মামলাটির তদন্ত চলছে। খুব শিঘ্রই প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন হবে।