সাভারের গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের (গবি) রেজিস্ট্রার মো. দেলোয়ার হোসেনের (৫৯) বিরুদ্ধে ছাত্রীদের যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীরা বলছেন, কাউকে আর্থিক সুবিধা দিয়ে আবার কাউকে বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে সখ্য গড়ে ফাঁদে ফেলেন দেলোয়ার হোসেন। নিজ অফিসের একটি অংশ বিশ্রামাগার বানিয়ে সেখানেই দীর্ঘদিন ধরে এসব অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। ওই কক্ষটির বাইরে লাগিয়েছেন সিসিটিভি ক্যামেরা, আর ক্যামেরার মনিটর স্থাপন করেছেন কক্ষের মধ্যে। যাতে কেউ কক্ষের দিকে এলে তিনি দূর থেকেই বুঝতে পারেন। সখ্য গড়ে তোলার পর কোনো কোনো ছাত্রীকে আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের নির্দিষ্ট কোনো স্থানে গিয়ে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের প্রস্তাবও দেন দেলোয়ার হোসেন। এভাবে অসংখ্য ছাত্রী তার শিকারে পরিণত হয়েছেন বলে অভিযোগ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের।
সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রীর সঙ্গে দেলোয়ারের ফোনালাপ ফাঁস হওয়ার পর তার এসব অপকর্মের প্রমাণও মিলেছে। ২৬ মিনিট ৩২ সেকেন্ড ও ৪ মিনিট ৪১ সেকেন্ডের ওই দুটি ফোনালাপের অডিও রেকর্ড দেশ রূপান্তরের কাছেও এসেছে। দুই ছাত্রীর সঙ্গে দেলোয়ারের ফোনালাপ ফাঁস হওয়ার পর তা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের মধ্যে ছড়িয়ে রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ পড়েছে। এরপর ভুক্তভোগী অনেক ছাত্রী ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে তাদের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মকর্তারা বলছেন, দেলোয়ারের বিরুদ্ধে নারীঘটিত কেলেঙ্কারির অভিযোগ নতুন না। তার শিকার শুধু ছাত্রীরাই নন, অনেক নারী শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও পদোন্নতির লোভ দেখিয়ে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা চালিয়েছেন। কিন্তু সামাজিক মর্যাদাহানির ভয়ে তাদের বেশিরভাগই কোনো অভিযোগ করেননি। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এর আগে দেলোয়ারের বিরুদ্ধে নারী কেলেঙ্কারির একটি অভিযোগ তদন্তে এলেও তার প্রতিবেদন আজও প্রকাশ পায়নি। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের কাছেও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা রয়েছে। কিন্তু সেই অভিযোগেরও কোনো সুরাহা হয়নি। অতীতের অপকর্মের কোনো শাস্তি না পাওয়ায় আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন দোলোয়ার। ফলে গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী এবং নারী শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কাছে দেলোয়ার এখন এক আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছেন। এমন একজন বিতর্কিত কর্মকর্তার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হচ্ছে বলে মনে করছেন তারা।
দেশ রূপান্তরের হাতে আসা ফোনকলের রেকর্ডটি যে দেলোয়ার হোসেনের তা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক ও কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন। ফোনকলের রেকর্ড ঘেঁটে দেখা গেছে, ২৬ মিনিট ৩২ সেকেন্ডের ফোনালাপে দেলোয়ার এক ছাত্রীকে বলছেন, ‘আমি গেলাম আদর করতে, তুমি বিরক্ত হয়ে গেলে।’ ওই ছাত্রী তখন বলেন, ‘আপনার ওখানে (অফিসে) কে কখন হুট হাট করে আসবে এই ভয় লাগে।’ তখন দেলোয়ার বলেন, ‘কেউ আসলে ঢোকার আগে আমার ক্যামেরায় দেখা যায়। আমিৃ. সময় ক্যামেরার দিকে তাকায় থাকি। আর কাউকেৃ করা, ৃ নেওয়া এটাতো তেমন কিছু না......।’ এরপর দেলোয়ার ওই ছাত্রীকে বলেন, ‘তুমি তো শুধু টাকার জন্য (বেতন ও জরিমানা মওকুফ) আসো নাই।’ তখন ওই ছাত্রী বারবার বলতে থাকেন, ‘আমি ভয় পাচ্ছিলাম।’ এরপর দেলোয়ার তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে কোথাও গিয়ে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য বারবার অনুরোধ করতে থাকেন। ওই ফোনালাপের কথোপকথনের বেশিরভাগই প্রকাশযোগ্য না।
এছাড়া ৪ মিনিট ৪১ সেকেন্ডের রেকর্ডে দেলোয়ার সম্প্রতি মাস্টার্স পাস করা এক ছাত্রীকে ফোন করে বলছেন, ‘পথেঘাটে চলতে ফিরতে দেখে তোমাকে অনেক আগে থেকে পছন্দ করেছি, একটা ব্যবস্থা করব ভেবেছি (চাকরি)।’ ওই ছাত্রী দেলোয়ারকে স্যার সম্বোধন করলে তিনি তখন বন্ধুত্ব গড়ার প্রস্তাব দিয়ে বলেন, ‘বন্ধু মনে করে ফোন দিয়ো।’ এরপর ওই ছাত্রীকে বলতে শোনা যায়, ‘কোন পজিশনে জব স্যার।’ তখন দেলোয়ার বলেন, ‘সেটা পরে, আগে দেখা করো।’
দেলোয়ারের ওই দুটি ফোনালাপ রেকর্ড বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়লে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করতে থাকেন। গত সোমবার এক ছাত্রী তার ফেইসবুকে স্ট্যাটাসে লেখেন, ‘গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা মেয়েরা ও আমাদের বোনেরা কতটুকু নিরাপদ? অনিরাপত্তার দায় কার?’। আরেক ছাত্রী স্ট্যাটাসে লেখেন, ‘মুখোশধারীদের হাত থেকে কবে যে পরিত্রাণ পাব।’
রিফাত মেহেদী হৃদয় নামের এক ছাত্র গত মঙ্গলবার তার ফেইসবুক স্ট্যাটাসে লেখেন, ‘গবির এক প্রশাসনিক কর্মকর্তা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীকে মোবাইলে শেখাচ্ছে কীভাবে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করতে হয়। কল রেকর্ডিং শুনে একদল ছাত্রও শুনলাম সেই কর্মকর্তাকে মারধর করেছে।’
দেলোয়ারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে গবির দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তা নাম প্রকাশ করে বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে ট্রাস্টি বোর্ডের এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেলোয়ারের বিরুদ্ধে এর আগেও নারী কেলেঙ্কারির অভিযোগ এসেছে। ট্রাস্টি বোর্ডের সভায় গত ফেব্রুয়ারিতেই সিদ্ধান্ত হয় তাকে সরিয়ে দেওয়ার। তবে করোনার কারণে সব থেমে আছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ফোনালাপের বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ট্রাস্টিবোর্ডে উত্থাপন করলে আমরা ব্যবস্থা নিতে পারব।’
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের বেতন ও জরিমানা মওকুফের জন্য করা আবেদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে রেজিস্ট্রার দেলোয়ারের হাতে। আর এই সুযোগই নিয়ে আসছেন তিনি। তার বিরুদ্ধে এর আগেও বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশিনের (ইউজিসি) কাছে অভিযোগ করেন। সেই অভিযোগ তদন্তে গঠিত কমিটি করোনার কারণে কাজ শুরু করতে পারেনি বলে জানা গেছে।
কমিটির প্রধান ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. দিল আফরোজা বেগম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের কাছে গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে এক ছাত্রীর করা একটি অভিযোগ এসেছে। আমরা এখনো তদন্ত শুরু করিনি। করোনার কারণে সব থেমে আছে। তদন্ত শেষে প্রতিবেদন দেওয়া হবে।’
নাম প্রকাশ না করে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরেই দেলোয়ারের বিরুদ্ধে নারী কেলেঙ্কারির অভিযোগ শুনছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের তৃতীয় তলায় তার রুমের পেছনে একটি বিশ্রামাগার আছে। সেখানেই সে অনৈতিক কাজ করে এমন অভিযোগ অনেক আগে থেকে শুনে আসছি। তার এই নারী কেলেঙ্কারির বিষয়ে বছর দুই আগে ইউজিসি তদন্ত কমিটি করেছিল। তদন্ত কমিটির এক সদস্য বিশ্ববিদ্যালয়েও এসেছিলেন। তবে যে কোনো কারণে সেটি বন্ধ হয়ে যায়। শুনেছি অভিযোগকারীর সঙ্গে স্থানীয়ভাবে মীমাংসা করা হয়েছে। দেলোয়ারের বিরুদ্ধে সাত থেকে আট মাস আগে আর্থিক ও নারী কেলেঙ্কারির অভিযোগ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টিবোর্ডের কাছে করা আছে। তবে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।’
দেলোয়ারের সঙ্গে ছাত্রীদের ফোনালাপের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমিও ফোনের রেকর্ডটি শুনেছি। এটি ওনার (দেলোয়ার) কণ্ঠ এটা নিশ্চিত। অস্বীকার করার উপায় নেই।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেলোয়ার মূলত দরিদ্র ও মাস্টার্স শেষ করে চাকরি খুঁজছে এমন ছাত্রীদের টার্গেট করে। যেসব দরিদ্র শিক্ষার্থী বেতন ও জরিমানা মওকুফের জন্য দেলোয়ারের কাছে আবেদন করে তাদের দেখা করতে বলে। টাকা মওকুফের আশ্বাস দিয়ে ওই সব ছাত্রীকে সে খারাপ প্রস্তাব দিয়ে থাকে। অনেককে ফোন করে বিভিন্ন লোভ দেখায়। তার সঙ্গে সময় কাটানোর প্রস্তাব দেয়। এছাড়া অনেক শিক্ষিকাকেও সে পদোন্নতির লোভ দেখিয়ে অনৈতিক কাজ করার প্রস্তাব দিয়েছে বলে অভিযোগ আছে। লজ্জায় অনেকে চাকরি ছেড়ে চলে গেছেন।’
এসব অভিযোগের বিষয়ে রেজিস্ট্রার দেলোয়ার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ ভিত্তিহীন। ওই ফোনালাপের কণ্ঠ আমার না। আমার বিরুদ্ধে অতীতে যেসব অভিযোগ উঠেছে তাও সঠিক না। আমি বিশ্ববিদ্যালয়কে এইখানে টেনে এনেছি। আমার বিরুদ্ধে একটি শ্রেণি ষড়যন্ত্র করছে।’
রেজিস্ট্রার দেলোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার কাছে এখনো এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আসেনি। যদি অভিযোগ আসে তাহলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডা. অধ্যাপক লাইলা পারভীন বানু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আগামী শনিবার ১১টায় ট্রাস্টিবোর্ডের জরুরি মিটিং ডেকেছি। ওই দিন আমাদের ট্রাস্টি বোর্ডের সবাই থাকবেন। মিটিংয়ের রেজুলেশন পরে সাংবাদিকদের জানানো হবে।’