ব্রিটিশ শাসনামলে কলকাতায় জন্মগ্রহণকারী মার্ক টালি দীর্ঘদিন ধরে ভারতে থাকেন। ছিলেন ব্রিটিশ ব্যবসায়ীর সন্তান। যুক্তরাজ্যের সঙ্গেও এ খ্যাতিমান সাংবাদিক- লেখকের সম্পর্ক অক্ষুণœ। ভারত ও যুক্তরাজ্যে শিক্ষাগ্রহণ করেছেন মার্ক টালি। দীর্ঘদিন বিবিসির দিল্লি ব্যুরোর প্রধান ছিলেন। ভারতকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন। সম্প্রতি ভারতের একটি বিশেষ সম্মাননা পাওয়া ব্রিটিশ প্রকৃতিবিদ ডেভিড অ্যাটেনবরোর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে মার্ক টালি ভারত তথা বিশ্ববাসীর জন্য পরিবেশ ও প্রকৃতির বিষয়ে করণীয় তুলে ধরেছেন। পরিবেশ একটি বৈশ্বিক বিষয় বলে এ ক্ষেত্রে ভারতের কার্যক্রম প্রতিবেশী দেশগুলো তো বটেই, গোটা বিশ্বের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। সেই বিবেচনায় হিন্দুস্তান টাইমস অনলাইন থেকে মার্ক টালির লেখাটির ভাষান্তর দেশ রূপন্তরের পাঠকদের জন্য ছাপা হলো
বিশ্বপ্রকৃতির কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত ব্রিটিশ প্রকৃতিবিদ ডেভিড অ্যাটেনবরো সম্প্রতি একটি বার্তা দিয়েছেন যা ভারতের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক। তার কথায় গুরুত্ব দেওয়া আমাদের উচিত বলেই মনে করি আমি। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং গত সপ্তাহে প্রখ্যাত
প্রকৃতিবিদ ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব স্যার ডেভিড অ্যাটেনবরোকে ইন্দিরা গান্ধী অ্যাওয়ার্ড ফর পিস, ডিজআর্মামেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পুরস্কার তুলে দেন। এ সময় তিনি অ্যাটেনবরোকে আখ্যায়িত করেন ‘প্রকৃতির কণ্ঠস্বর’ হিসেবে। ডেভিড অ্যাটেনবরোর প্রকৃতি বিষয়ক টিভি সিরিজ, প্রামাণ্য চলচ্চিত্র ও বইয়ের জনপ্রিয়তা ও প্রভাবের মাত্রাটা এমনই যে, আমার মতে তাকে ‘প্রকৃতির বিশ^গুরু’ শিরোপা দেওয়া যেতে পারে। কীটপতঙ্গ থেকে শুরু করে বড় স্তন্যপায়ী প্রাণী, পাখি থেকে শুরু করে সমুদ্রতলের জীবন নিয়ে এসব কাজ করেছেন তিনি। খুবই দুঃখের বিষয়, অ্যাটেনবরোকে এই পুরস্কারটা দিতে হয়েছে ভার্চুয়ালি। তবে হলভর্তি দর্শকের বদলে সম্মাননা গ্রহণকারীর ভাষণটি ক্যামেরার সামনে দিতে হলেও এ বিষয়ে তার আবেগ ও অঙ্গীকারের মাত্রায় কমতি ছিল না। সম্প্রচার বিষয়ে তার দক্ষতা সেটি নিশ্চিত করেছে। সম্মাননা গ্রহণকারীর ভাষণে ভারত তথা সারা বিশ্বের প্রতি ডেভিড অ্যাটেনবরোর সতর্কবার্তাটা ছিল খুব স্পষ্ট : ‘মানুষ এই গ্রহকে পুরোপুরি অধিৃকত করে ফেলেছে।’ খ্যাতিমান এ প্রকৃতিবিদ মনে করিয়ে দেন, ৯৩ বছর আগে তার জন্মের সময়ের চেয়ে এ গ্রহের জনসংখ্যা এখন তিনগুণ বেশি। তিনি বলেন,
প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর এর প্রভাব হয়েছে ধ্বংসাত্মক। জনসংখ্যা বৃদ্ধির এই নেতিবাচক প্রভাবগুলোর কয়েকটি উল্লেখও করেন অ্যাটেনবরো। বিশ্বের ক্রান্তীয় বনের অর্ধেক কেটে সাবাড় করে ফেলা হয়েছে। মরে গেছে অর্ধেক প্রবাল রিফ যা কিনা সাগরের সবচেয়ে সমৃদ্ধ প্রতিবেশগুলোর একটি আর সামুদ্রিক মাছের গুরুত্বপূর্ণ প্রজনন ক্ষেত্র। আমরা মৎস্যসম্পদ আহরণের জন্য এমনই উচ্চমানের কারিগরি দক্ষতা আর নৈপুণ্য দিয়ে সাগর-মহাসাগর ছেঁকে বেড়িয়েছি যে, জায়গায় জায়গায় অনেক প্রজাতি ঝাড়েবংশে বিলীন হয়েছে। স্থলের অবস্থাও তথৈবচ। স্থলভাগের কথা উল্লেখ করে ব্রিটেনের এই খ্যাতনামা ও জনপ্রিয় প্রকৃতিবিদ জানিয়েছেন, মানুষ ছাড়া অন্য স্তন্যপায়ী প্রাণীদের জন্য আমরা আর জায়গা বিশেষ কিছু রাখিনি। বিশ্বের স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে দৃশ্যত ৯৬ শতাংশই এখন মানুষ আর আমরা নিজেরা খাওয়ার জন্য যেসব প্রাণী পুষি তাদের নিয়ে। বাকি সব প্রজাতির জন্য রয়েছে অবশিষ্ট মাত্র ৪ শতাংশ।
ডেভিড অ্যাটেনবরোর অভিমত, এসবের মারাত্মক প্রতিক্রিয়া হচ্ছে এই যে, আমরা খোদ নিজেদের জীবনধারণের জন্যই অতি প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াকে ঝুঁকির মুখে ফেলছি। তো, এই ঝুঁকি এড়ানোর জন্য কী করা উচিত? অ্যাটেনবরোর সোজা জবাব : আমাদের অবশ্যই আচরণ বদলাতে হবে। আর তা করতে হবে দ্রুতই। তবে সাবধানতাবাণী উচ্চারণ করে তিনি এ-ও বললেন, ‘বিশ্বের দেশগুলো একজোট হয়ে কাজ করতে রাজি হয়ে একে অন্যকে সহায়তা করলেই কেবল সাফল্য আসবে। এটা সহজ কাজ হবে না। আমাদের নিজেদের বদলে ফেলে আন্তর্জাতিকতাবাদী হতে হবে। যার মধ্যে থাকবে দেওয়া-নেওয়ার বিষয়টি।’ কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ও শক্তিশালী দেশের নেতা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ বিষয়ে প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করে নিচ্ছেন। কারণ তার মতে, এ চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির ক্ষতি করবে এবং দেশটিকে স্থায়ীভাবে অসুবিধাজনক অবস্থায় ফেলবে। অ্যাটেনবরো বলেছেন, আমাদের ভোটারদের দায়িত্ব রাজনীতিকদের কাছে এটা স্পষ্ট করে দেওয়া যে আমরা চাই তারা যেন পৃথিবী যেসব বড় ধরনের সংকটের পথে এগিয়ে চলেছে সেগুলো এড়ানোর জন্য উদ্যোগী হন। বিশ্বখ্যাত এ প্রকৃতিবিদ বলেন, এ সংকট জাতীয় বা আন্তর্জাতিক নয়, বরং বৈশ্বিক যেগুলোকে কিনা বিশ্বের সব দেশের একজোট হয়ে মোকাবিলা করতে হবে। অ্যাটেনবরো বলছেন, ব্যাপারটা আমাদের ওপরই নির্ভর করে কারণ রাজনীতিকরা কেবল তখনই নেওয়ার পাশাপাশি দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা মেনে নেবেন যখন নেতাদের ক্ষমতায় বসানো নির্বাচকমন্ডলীর সমর্থন তাদের প্রতি বজায় থাকবে।
‘বিশ্বপ্রকৃতির কণ্ঠস্বর’ ডেভিড অ্যাটেনবরো যে বার্তাটি দিয়েছেন তার সঙ্গে ভারতের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সম্পর্ক রয়েছে। তার এ কথায় গুরুত্ব দেওয়া আমাদের উচিত বলে মনে করি। অতীতে ভারত তার পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির ব্যর্থতার জন্য অন্যায্যভাবে বেশি আদমসন্তানের জন্ম দিয়ে পৃথিবীকে ভারাক্রান্ত করায় ভূমিকা রেখেছে। বর্তমানে বিশে^র সবচেয়ে দূষিত ২০টি নগরের মধ্যে ১৫টি ভারতে। যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ^বিদ্যালয়ের প্রকাশিত সাম্প্রতিকতম দ্বিবার্ষিক পরিবেশ দক্ষতা সূচক এ দক্ষিণ এশিয়ায় দেশটির স্থান কেবল আফগানিস্তানের ওপরে। ভবিষ্যতে ভারতের ওপর নানা ধরনের পরিবেশগত বিপর্যয় ঘনিয়ে আসতে পারে। এসবের মধ্যে রয়েছে মরু এলাকার সম্প্রসারণ, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাবৃদ্ধি ও বনধ্বংসজনিত বন্যা আর হিমালয়ের হিমবাহের গলন। ভারত এসব সমস্যা নিজে নিজে মোকাবিলা করতে পারবে না। দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তা স্বীকারও করেছেন। গত বছরের ক্লাইমেট অ্যাকশন সামিটে তিনি বলেন, ‘বিশ্বকে এ নিয়ে সক্রিয় হতে হবে এখনই’। ‘বিশ^প্রকৃতির কণ্ঠস্বর’ ডেভিড অ্যাটেনবরো মনে করেন, পৃথিবী গ্রহটিকে রক্ষা করার বিষয়ে ভারতের বর্তমান ও আগামী সরকারগুলো যেন আন্তর্জাতিকতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী হয় তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব দেশটির ভোটারদেরই।
ভাষান্তর : আবু ইউসূফ