শিথিলতার সুযোগে মাদক কারবারিদের বাড়বাড়ন্ত

দেশে ফের বেড়ে গেছে মাদক কারবারি ও সিন্ডিকেট সদস্যদের তৎপরতা। কক্সবাজারে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান নিহতের পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশব্যাপী পুলিশের মাদকবিরোধী অভিযানে দৃশ্যত ভাটা পড়েছে। আর এ সুযোগে এলাকায় ফিরতে শুরু করেছে পালিয়ে থাকা অনেক তালিকাভুক্ত মাদক কারবারি। যারা সীমান্তবর্তী দেশ ভারত ও মিয়ানমার থেকে নিয়ে আসছে মাদকের চালান। কারবারিদের বাড়বাড়ন্ত আর তাদের হাত ধরে চলছে এসব মাদকের কেনাবেচা। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ে আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে দেশে ফের মাদকের বিস্তার বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। এ পরিস্থিতিতে মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর হতে মন্ত্রণালয় থেকে বিশেষ বার্তা পাঠানো হয়েছে পুলিশ সদর দপ্তরে। আর ওই নির্দেশনা পেয়ে নড়েচড়ে বসেছে পুলিশ।

জানা গেছে, মাদকের বিস্তার রোধ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেশের মাদকপ্রবণ ৩২ জেলার সাধারণ মানুষের আয় বাড়ানোর পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি প্রতিটি জেলায় অন্তত একটি করে উন্নতমানের মাদক নিরাময় কেন্দ্র স্থাপন করতে বলা হয়েছে। মাসে প্রতিটি থানায় অন্তত ১০ জন মাদকসেবীকে চিহ্নিত করে পুনর্বাসন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি)। এছাড়া দেশের সবকটি সীমান্ত এলাকা ও টেকনাফের মিয়ানমার সীমান্তে আরও কড়াকড়ি আরোপ করা হচ্ছে। নতুন করে মাদক কারবারিদের আরেকটি তালিকা করারও উদ্যোগ নিয়েছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশ থেকে মাদক নির্মূল করতে জিরো টলারেন্স নীতি নেওয়া হয়েছে। পুলিশ-র‌্যাবসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো একযোগে কাজ করছে। মাদক কারবারিদের ধরতে দেশব্যাপী আরও জোরালো অভিযান চালাতে বলা হয়েছে। সীমান্ত এলাকায় কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। কারবারিদের যারা আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয় তাদেরও আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। কাউকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না।’

এদিকে গতকাল সোমবার ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ক্রাইম কনফারেন্সেও মাদক কারবারিদের দমনের কর্মপরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেছেন পুলিশ কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মাদক নির্মূল করতে হলে মাদকসেবীদের তালিকা করতে হবে। মাদকসেবীদের চিহ্নিত করে তাদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে হবে। তারা যেন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারে সেজন্য তাদের সবরকম সহযোগিতা করতে হবে। প্রয়োজনে তাদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে তাদের সংশোধনাগারে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। এরপরও মাদকসেবীরা সংশোধন না হলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

রাজধানীর পুলিশপ্রধান আরও বলেন, ‘মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশ কঠোর। কাউকে ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। আরও জোরালো অভিযান চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ওসিদের। পুলিশের কোনো সদস্য মাদক কারবারিদের সহায়তা করলে তাদের বিরুদ্ধেও নেওয়া হবে কঠোর ব্যবস্থা।’

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, মাদকের পৃষ্ঠপোষক ও অন্য কারবারিদের পাশাপাশি নতুন নতুন কারবারি গজিয়ে উঠছে। প্রতিদিনই সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদকের চালান আসছে। মাদক বেচাকেনা বেড়ে যাওয়ায় তারা কিছুটা বিচলিত। বিশেষ করে টেকনাফে অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা নিহতের পর পুলিশের অভিযানে ভাটা পড়ে।

সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে মাদক কারবারিদের তৎপরতা নিয়ে আলোচনা হয়। ওই বৈঠকে উপস্থিত থাকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সিনহা হত্যাকাণ্ডের পর মাদকবিরোধী অভিযান শিথিল হয়েছে। সিন্ডিকেটের তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগও জানানো হয়েছে। কারবারিদের ধরতে অভিযান আরও জোরদার করতে বলা হয়েছে। তবে পুলিশ ও র‌্যাবসহ প্রতিটি সংস্থার মধ্যে সমন্বয় করে অভিযান চালাতে বলা হয়েছে। বিশেষ করে মাদকপ্রবণ ৩২টি জেলায় সাধারণ মানুষের আয় বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সমাজসেবা অধিদপ্তরও কাজ করবে। প্রতিটি জেলায় একটি করে উন্নতমানের মাদক নিরাময় কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। সীমান্ত এলাকাগুলোতে কড়াকড়ি আরোপ করতে বলা হয়েছে।’

জানা গেছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই নির্দেশনা পেয়ে সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তরে আইজিপির নেতৃত্বে একটি বৈঠক হয়েছে। সেখানে মাদক কারবারিদের ধরার পাশাপাশি আরেকটি নতুন তালিকা করার নির্দেশনা দেওয়া হয় প্রতিটি জেলার এসপিদের। নির্দেশনা পেয়ে কক্সবাজারসহ বিভিন্ন জেলাকে মাদকমুক্ত করতে বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছে জেলা পুলিশ। পুলিশ অনুসন্ধান করে নিশ্চিত হয়েছে, নতুন মাদক কারবারিদের মধ্যে অনেকেই ইতিমধ্যে কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন। মাদক কারবারে জড়িত হওয়ার আগে তাদের কেউ কেউ পকেটমার, ছিঁচকে চোর বা রিকশাচালক ছিল।

পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সিনহার ঘটনার পর অভিযান শিথিল হয়েছে তা সত্য। তবে কমবেশি অভিযান চলছে। নতুন করে মাদক কারবারিদের তালিকা হচ্ছে। তালিকার মধ্যে এমন ব্যক্তির নাম আসছে যে তা চমকে ওঠার মতো। এদের মধ্যে জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কতিপয় সদস্য রয়েছে। বেশকিছু জেলায় কিছু গণমাধ্যমকর্মীর নামও আসছে। পাশাপাশি নব্য গডফাদারদের চিহ্নিত করা হয়েছে। তারা একসময় এলাকায় কুলি, পকেটমার, রিকশাচালক, দিনমজুর ও পোনা শ্রমিক হিসেবে কাজ করত বলে তথ্য আছে আমাদের কাছে।’

র‌্যাব-পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক বছরে ঢাকাসহ দেশে র‌্যাব-পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছে ৫০ হাজারের বেশি মাদক কারবারি। আর এ সময়ে মামলা হয়েছে লাখেরও বেশি। মাদকবিরোধী অভিযানে এ সময়কালে পুলিশ ও র‌্যাবের ক্রসফায়ারে দেশে ৫১২ কারবারি নিহত হয়েছে। তার মধ্যে কক্সবাজার ও টেকনাফে ক্রসফায়ারের ঘটনা বেশি ঘটেছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগের চেয়ে মাদকবিরোধী অভিযানে কিছুটা শিথিলতা চলছে। আর এ সুযোগে মাদক কারবারিরা এলাকায় আসছে বলে আমাদের কাছে তথ্য এসেছে। এতে আমরা কিছুটা হলেও উদ্বিগ্ন। তবে অভিযান কিন্তু থেমে নেই। আগের চেয়ে আরও জোরালো অভিযান চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দেশে মাদকের বিস্তার হতে দেওয়া হবে না। প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইজিপির নির্দেশে মাদক নির্মূল করা হবেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘বৈঠকে বেশকিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে মাদকের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান, মাদকের আস্তানাগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া, পুরনোদের পাশাপাশি নতুন কারবারিদের তালিকা তৈরি, অভিযান কেন আগের মতো হচ্ছে না তা অনুসন্ধান করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং অভিযানগুলোর ফলোআপ পুলিশ ও র‌্যাব সদর দপ্তর মনিটরিং করবে। পাশাপাশি মামলাগুলো দ্রত নিষ্পত্তির জন্য মনিটরিংও করতে হবে। মামলার চার্জশিট এমনভাবে দিতে হবে যাতে প্রকৃত মাদক কারবারিরা পার পেয়ে যেতে না পারে।’