শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বিনিয়োগ বৃদ্ধির বার্তা

বিশ্বব্যাংকের মানবপুঁজি সূচকে বাংলাদেশের অবনতি হয়েছে। এই অবনতি যেমন অবস্থানের দিক থেকে তেমনি স্কোরের দিক থেকেও। ২০১৮ সালে বাংলাদেশের স্কোর ছিল শূন্য দশমিক ৪৮, এবার শূন্য দশমিক ৪৬। সেবার বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১০৬, এবার ১২৩। তবে ২০১৮ সালের প্রতিবেদন করা হয়েছিল ১৫৭টি দেশকে নিয়ে, এবার তা করা হয়েছে ১৭৪টি দেশকে নিয়ে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ প্রতিবেশী ভারতের চেয়ে এগিয়ে থাকলেও এবার পিছিয়েছে। এবার ভারতের স্কোর শূন্য দশমিক ৪৯ এবং অবস্থান ১১৬। বিশ্বব্যাংকের মানবপুঁজি সূচকে এই স্কোর নির্দেশ করে বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা লাভ করে একজন শিশু প্রাপ্তবয়স্ক হলে কতটা উৎপাদনশীলতা দেখাতে পারবে। উদাহরণ দিয়ে বলা যায় এবারের সূচক অনুসারে বাংলাদেশের একজন শিশু প্রাপ্তবয়স্ক হলে গড়ে ৪৬ শতাংশ উৎপাদনশীলতা দেখাতে পারবে। আর ভারতের একজন শিশু ৪৯ শতাংশ উৎপাদনশীলতা দেখাতে পারবে।

মানবপুঁজি সূচকের ধারণাটা হচ্ছে, আদর্শ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য-সুবিধা পেলে একটি শিশু প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে শতভাগ উৎপাদনশীলতা দেখাতে পারে। কিন্তু বিভিন্ন দেশে শিশুরা ভিন্ন ভিন্ন মানের সুযোগ-সুবিধা অনুযায়ী বেড়ে ওঠায় সবাই সমান উৎপাদনশীলতা দেখাতে পারে না। পাঁচ বছরের কম বয়সে শিশুমৃত্যুর হার, শিশুদের স্কুলে পাঠগ্রহণের সময়, শিক্ষার মান, প্রাপ্তবয়স্কদের অন্তত ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকা, শিশুদের সঠিক আকারে বেড়ে ওঠাসহ বেশ কয়েকটি সূচক দিয়ে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, বিশ্বব্যাংকের এই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস মহামারীর মারাত্মক বিস্তার শুরুর আগেই। প্রতিবেদনটিতে চলতি বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত তথ্য ব্যবহার করায় কভিড-১৯ মহামারীর প্রভাব এতে প্রতিফলিত হয়নি। তথাপি এই প্রতিবেদনে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের আশঙ্কাজনক চিত্র উঠে এসেছে। অবশ্য এই অবস্থা শুধু বাংলাদেশের নয়, সারা পৃথিবীর। পরিস্থিতি এমন জায়গায় গেছে যে দারিদ্র্য বিমোচনসহ স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে দুনিয়ার বিভিন্ন দেশ গত এক দশকে যে সফলতা অর্জন করেছে, কভিড-১৯ মহামারীর ধাক্কায় তা হুমকির মুখে। বিশেষ করে দরিদ্র দেশগুলোতে এর অভিঘাত মারাত্মক হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে বিশ্বব্যাংকের মানবপুঁজি সূচক-২০২০ শীর্ষক প্রতিবেদনে।

এক্ষেত্রে লক্ষণীয় বিষয় হলো প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে মানবপুঁজি সূচকের সব বিবেচনাতেই ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা এগিয়ে। সূচকে মেয়েদের গড় স্কোর শূন্য দশমিক ৪৮ এবং ছেলেদের শূন্য দশমিক ৪৫। বিদ্যালয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও মেয়েরা এগিয়ে। এ সূচকে ছেলেদের পয়েন্ট ৯ দশমিক ৮ এবং মেয়েদের ১০ দশমিক ৫। গড় আয়ুসহ অন্যান্য সূচকেও মেয়েদের অবস্থান ছেলেদের তুলনায় বেশ ভালো। সন্দেহ নেই যে, বিগত বছরগুলোতে দেশে নারীর শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় সরকারের গৃহীত বিভিন্ন কর্মসূচির সাফল্যের প্রতিফলন এই সূচকে মেয়েদের এগিয়ে থাকা। সূচকে মেয়েদের এই অগ্রগতি একই সঙ্গে এটা মনে করিয়ে দেয় যে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ কতটা কার্যকর।

এই বিবেচনা সামনে আসা জরুরি যে, পৃথিবীর কোনো দেশই প্রকৃত উন্নয়ন বোঝাতে মাথাপিছু আয়কে একমাত্র সূচক হিসেবে ধরা হয় না। শুধু মাথাপিছু আয় দিয়ে সাধারণ মানুষের সত্যিকার উন্নয়ন এবং তাদের জীবন ধারণের প্রকৃত অবস্থা জানা যায় না। এক্ষেত্রে বিশ^ব্যাংকের মানবপুঁজি সূচক একটা সাম্প্রতিক মানদ- বটে। কিন্তু খেয়াল করা জরুরি যে, মানবপুঁজির দুটি দিক রয়েছে এক. শিক্ষাপুঁজি এবং দুই. স্বাস্থ্যপুঁজি। মানুষের স্বাস্থ্য ও শিক্ষা দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তি ও সমাজের জীবনমানের প্রকৃত উন্নয়নের প্রশ্নে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য দুটিই সমানভাবে ভূমিকা রাখে। পৃথিবীর যেসব দেশে উন্নয়ন হয়েছে এবং উন্নয়নশীল দেশ, বিশেষ করে এশিয়ার চীন, কোরিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন এসব দেশে দেখা গেছে তারা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য দুটি খাতেই অনেক দূর এগিয়ে গেছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের তুলনা করলে দেখা যাচ্ছে জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাত যেখানে মোটামুটি ১২-১৩ শতাংশ বরাদ্দ পায়, সেখানে স্বাস্থ্য খাত পায় মাত্র ৫ শতাংশ বরাদ্দ। অর্থাৎ স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ জিডিপির ১ শতাংশেরও নিচে। অথচ উন্নয়নশীল বহু দেশেও স্বাস্থ্য খাত জিডিপির ৩-৪ শতাংশ পায়। করোনা মহামারীর বাস্তবতায় দেশের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য দুই খাতই ব্যাপক সংকটে পড়েছে। এই অভিজ্ঞতা আমলে নিয়ে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বিনিয়োগ বাড়ানোর বার্তা দিচ্ছে আলোচ্য এই মানবপুঁজি সূচক।