অবৈধ বিদেশিদের ফেরত পাঠাতে তহবিল হচ্ছে

নাইজেরিয়ান নাগরিক জেকভ। ১০ বছর ধরে বাংলাদেশে অবস্থান করলেও বছর পাঁচেক আগেই শেষ হয়েছে তার ভিসার মেয়াদ। বাংলাদেশে থেকে কোনো ধরনের চাকরি না করলেও আর্থিক দিক থেকে ভালো অবস্থানে ছিলেন জেকভ। প্রতারণা করে প্রতি মাসে কামাতেন অন্তত লাখ দশেক টাকা। প্রতারণার টাকা দিয়ে রাজধানীর প্রগতি সরণিতে যমুনা ফিউচার পার্কের সামনে ‘আফ্রো-এশিয়ান’ নামে একটি রেস্তোরাঁ খুলে বসেন। সেখানে বসেই কয়েকজন বাংলাদেশি অপরাধী ও অবৈধভাবে বসবাস করা বিদেশি মিলে প্রতারণার ফাঁদ পাততেন। গত ৬ আগস্ট পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) জালে ধরা পড়েন জেকভ। পরে সিআইডির কাছে নিজের অপরাধের ফিরিস্তি দেন। তার মতোই গত ২১ জুলাই রাজধানীর পল্লবী এলাকা থেকে প্রতারণার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয় বিভিন্ন দেশের ১২ জন নাগরিককে। দীর্ঘদিন ধরেই তাদের ভিসার মেয়াদ ছিল না। এমনকি পাসপোর্টও নেই তাদের কাছে। এদের মতোই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভিসা ছাড়াই অবৈধভাবে অবস্থান করা অন্তত ৭০০ বিদেশিকে খুঁজছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। এছাড়া ইতিমধ্যে বিভিন্ন সময়ে ৪৩৩ জন বিদেশি প্রতারণাসহ নানা মামলায় গ্রেপ্তারের পর কারাগারে রয়েছেন। তার মধ্যে ৭০ বিদেশির সাজার মেয়াদ শেষ হলেও তারা কারাগারে আটক আছেন। কবে তারা বের হয়ে নিজ দেশে চলে যাবেন তা নির্দিষ্ট করে কেউ বলতে পারছে না।

ভিসার মেয়াদ না থাকা এমন অন্তত ৭০০ বিদেশিকে নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে একটি ‘প্রত্যাবাসন তহবিল’ গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে অবৈধ বিদেশিদের নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ওই বৈঠকেই বিদেশিদের জন্য একটি ‘প্রত্যাবাসন তহবিল’ তৈরি ও সেফ হোম তৈরি করতে নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত হয়েছে। তাছাড়া তহবিল গঠনে অর্থ জোগান দিতে অর্থ মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, গত তিন মাসে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ও র‌্যাব বিভিন্ন অপরাধে যুক্ত থাকার অভিযোগে ৬০ বিদেশিকে গ্রেপ্তার করেছে। আর গত তিন বছরে এমন গ্রেপ্তারের সংখ্যা তিনশোর বেশি। বাংলাদেশে উপহার পাঠানোর নামে প্রতারণা, হেরোইন-কোকেনসহ মাদকের কারবার, এটিএম বুথে জালিয়াতি, বিভিন্ন দেশের জাল মুদ্রার কারবার, অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা, সোনা চোরাচালান, অনলাইনে ক্যাসিনো কারবার এবং মানব পাচারে এসব বিদেশিরা জড়িত। তারা নানা গ্রুপে ভাগ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। আবার তাদের নিয়ন্ত্রণেই আছে বেশকিছু নারী। এসব নারীকে দিয়ে তারা ব্ল্যাকমেইল করে থাকে।

জানা গেছে, ভিসার মেয়াদ নেই এমন বিদেশিদের একটি তালিকা করার কাজ প্রায় গুছিয়ে এনেছে সরকারের দুটি গোয়েন্দা সংস্থা। ওই তালিকাটি কয়েক দিনের মধ্যেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর কথা রয়েছে। তাছাড়া এ তালিকার আগে আরেকটি প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছিল মন্ত্রণালয়ে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ৭০০ বিদেশির ওয়ার্ক পারমিট নেই। তাদের দ্রুত নিজ দেশে ফেরত না পাঠালে বাংলাদেশ ক্ষতির সম্মুখীন হবে। তারা নানা অপকর্মে জড়িত। ওই প্রতিবেদন পাওয়ার পর আইনপ্রয়োগকারী কয়েকটি সংস্থা আলাদাভাবে নজরদারি করছে। তাদের নজরদারির বিষয়টি আঁচ করতে পেরে অবৈধভাবে অবস্থান করা বিদেশিরা নিজেদের অবস্থান গোপন করছে। অনেকে নিজ নিজ পাসপোর্ট ছিঁড়ে ফেলে পরিচয় আড়াল করছে। ফলে চাইলেও তারা কোন দেশের নাগরিক তা শনাক্ত করা যাচ্ছে না।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অবৈধ বিদেশিদের নিজ দেশে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাদের কীভাবে পাঠানো যায় তা নিয়ে আলোচনা চলছে। অনেক বিদেশি আছে, তাদের ভিসার মেয়াদ নেই। তাদের খুঁজে বের করতে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো কাজ করছে।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘গোয়েন্দাদের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে অবস্থানরত ৭০০ বিদেশি নাগরিকের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়েছে। তারপরও তারা বাংলাদেশে অবস্থান করছে। তাদের ফিরিয়ে নিতে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে যোগাযোগ করছি। এমবাসিগুলো যদি কোনো উৎসাহ না দেখায়, তাহলে আমাদের দেশে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের জন্য বিদেশি অপরাধীদের বিরুদ্ধে পরবর্তী সময়ে ব্যবস্থা নেব।’

পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, অবৈধ বিদেশিরা প্রতারণা, মাদক ও জাল টাকার কারবারসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকা- চালিয়ে আসছে। তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রতিটি জেলার পুলিশ সুপারদের দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে আফ্রিকার নাগরিকরা বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তারা বেশি প্রতারণা করছে। ওইসব অবৈধ বিদেশিকে নিজ দেশে পাঠাতে প্রত্যাবাসন ফান্ড গঠন করার চেষ্টা চলছে। ওই ফান্ডের বেশিরভাগ অংশের জোগান দেওয়ার কথা রয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের। এজন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অর্থ মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করেছে।

এ পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার হয়ে সাজা খেটেছে অন্তত ৭০ বিদেশি। কিন্তু তাদের এখনো নিজ দেশে ফেরত পাঠানো যায়নি। তবে দ্রুত সময়ের মধ্যে তাদের কারাগার থেকে বের করে নিজ দেশে পাঠানো হবে। অবৈধ বিদেশিদের চিহ্নিত করে একটি নির্দিষ্ট এলাকায় সেফ হোমে রাখা হবে। পরে তাদের বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে নিজ টাকায় নিজ নিজ দেশে পাঠিয়ে দেওয়ার কথা রয়েছে।

সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি শেখ রেজাউল হায়দার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত কয়েক বছর ধরে অবৈধ বিদেশিরা কিছু বাংলাদেশি নাগরিকের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছে। তারা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে অবস্থান করছে বলে আমরা তথ্য পেয়েছি। তাদের কারোরই ভিসার মেয়াদ নেই। তারা নিরীহ লোকদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। অবৈধ বিদেশিদের ধরে নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে হবে।’

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আফ্রিকানসহ অন্য বিদেশিরা ভিসার মেয়াদ শেষ হলে পাসপোর্ট ছিঁড়ে ফেলে। তখন বের করাই যায় না তারা কোন দেশের নাগরিক। ইমিগ্রেশন থেকে অবৈধ বিদেশিদের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। ওই তথ্যগুলো আমরা পুলিশ সদর দপ্তরের মাধ্যমে ইন্টারপোলকেও অবহিত করে রাখব। বাংলাদেশে ফুটবল খেলতে আসা খেলোয়াড়রাও অপরাধের সঙ্গে যুক্ত আছে।’

এ পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘আন্তর্জাতিক কনভেনশন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে আলোচনা করে অবৈধ বিদেশিদের ফেরত পাঠাতে হয়। দাগি অপরাধীদের ক্ষেত্রে পুশব্যাক করার রীতিও চালু আছে। তবে করোনার কারণে তা বন্ধ আছে। বাংলাদেশে ফরেনার্স অ্যাক্ট ১৯৪৬ অনুযায়ী অবৈধভাবে বসবাসের জন্য গ্রেপ্তারের পর পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের বিধানও আছে।’

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সপ্তাহখানেক আগে আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে অবৈধ বিদেশিদের ব্যাপারে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা হয়েছে। যেভাবেই হোক অবৈধদের বাংলাদেশ থেকে তাড়িয়ে দিতে হবে। এজন্য আমরা প্রত্যাবাসন ফান্ড গঠনের উদ্যোগ নিয়েছি। আশা করছি আগামী ছয় মাসের মধ্যে এ ফান্ড গঠন হয়ে যাবে। আর বিদেশিরা যাতে এলোমেলোভাবে বসবাস করতে না পারে, সেদিকে খেয়াল রাখতে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’