এক মসজিদের জন্য এক আইন আর নয়

চট্টগ্রামের শাহি মসজিদের জন্য একটি আইন করার প্রস্তাব নিয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে গিয়েছিল ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়। কিন্তু তাদের প্রস্তাবনায় সাড়া দেয়নি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। তাদের কথা, প্রতিটি মসজিদের জন্য আলাদা আইন করতে হলে কয়েক লাখ আইন করতে হবে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রস্তাবিত আইনটি ফেরত দিয়ে সব মসজিদের জন্য একটি সমন্বিত আইন করার সুপারিশ করেছে।

ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. আলতাফ হোসেন চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী মসজিদগুলোর জন্য সমন্বিত আইন করব। একটি মসজিদের জন্য একটি আইন আর করা হবে না।’

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তারা জানান, দেশে প্রায় চার লাখ মসজিদ রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র চারটি মসজিদের জন্য আলাদা আইন রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লা শাহি মসজিদ ও জামিয়াতুল ফালাহ মসজিদ, রাজধানীর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ। এ ছাড়া রাজশাহীর একটি মসজিদের জন্যও আলাদা আইন রয়েছে। আর কোনো মসজিদের জন্য আলাদা আইন নেই। দেশের মসজিদগুলো ইসলামিক ফাউন্ডেশনের তদারকিতে চলে। মসজিদের উন্নয়ন ও মসজিদকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্ট এলাকার শিক্ষা প্রসারে নানা ধরনের কার্মসূচি পালন করে ইসলামিক ফাউন্ডেশন। সরকার মসজিদগুলোকে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা, কোরআন শিক্ষা, বয়স্ক শিক্ষা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চাচ্ছে। আর প্রতিটি মডেল মসজিদকে একটি রিসোর্স সেন্টার হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। মসজিদগুলোতে পাঠাগার স্থাপন এবং মুসল্লিদের সেই পাঠাগারের পুস্তক পড়ার সুয়োগ দেওয়া হচ্ছে। ইসলামের প্রচার-প্রসারের জন্য ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ইসলামিক ফাউন্ডেশন অধ্যাদেশ জারি করেন। ইসলামি আদর্শ ও মূল্যবোধের চর্চা করার জন্য এ ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করা হয়।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, আমরা খসড়া আইনটি ফেরত দিয়ে আইনটিকে নতুন আঙ্গিকে করার সুপারিশ করেছি। আমাদের সুপারিশের সঙ্গে ধর্ম মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয় এমনকি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তারাও একমত পোষণ করেছেন। প্রতিটি মসজিদের জন্য একটি আইন করতে হলে দেশে প্রায় চার লাখ আইন করতে হবে। একটা আইন প্রণয়ন করার জন্য বছরের পর বছর কাজ করতে হয়। সংসদের মূল্যবান সময় ব্যয় করতে হয়। কাজেই প্রতিটি আইন হওয়া উচিত সমন্বিত ও কার্যকর। দেশের সব মসজিদ একটি আইনের আওতায় এলে তা তদারকি করাও সহজ হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট মসজিদের নাম ও ইতিহাস আইনের তফসিলে থাকবে। আর আইনটি করার আগে ইসলামি চিন্তাবিদসহ আইন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ধর্ম মন্ত্রণালয়ে কাজ করে গেছেন এমন ব্যক্তিদেরও এখানে সংযুক্ত করে তাদের পরামর্শ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, চট্টগ্রামের শাহি মসজিদ একটি ঐতিহাসিক মসজিদ। ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দের ২৭ জানুয়ারি চট্টগ্রাম অঞ্চল মোগল সাম্রাজ্যভুক্ত হওয়ার পর মোগল বাহিনী আন্দরকিল্লায় সেনা ছাউনি নির্মাণ করে। মোগল সৈন্যদের নামাজ পড়ার জন্য পরের বছর সেখানে মসজিদ নির্মাণ করা হয়। তৎকালীন বাংলার সুবেদার নবাব শায়েস্তা খাঁর পুত্র উমেদ খাঁ মসজিদটি নির্মাণ করেন। মোগল স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত মসজিদটি পরিচালনার জন্য ১৯৮৬ সালে ‘চট্টগ্রাম শাহি জামে মসজিদ অধ্যাদেশ’ জারি করে সরকার। মূলত মসজিদের সম্পদ বেহাত হয়ে যাওয়ায় সরকার ওই সময় অধ্যাদেশ জারি করেছিল। একই সঙ্গে মসজিদের আয়-ব্যয়ের ওপর স্থানীয় প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য এটি অধ্যাদেশের আওতায় আনা হয়েছিল। সমন্বিত আইন করা হলে আলাদাভাবে আইন করার আর প্রয়োজন থাকবে না।

দুই বছর ধরে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা আইনটি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। স্টেকহোল্ডারদের লিখিত মতামত ছাড়াও আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায়ও আইনটি সংশোধনের সিদ্ধান্ত হয়। তাদের মতামতের ভিত্তিতেই খসড়া আইন প্রণয়ন করা হয়। আইনটি করা হলে মসজিদের সব সম্পদ, ব্যবস্থাপনা, দান, অনুদান, নগদ অর্থ, ব্যাংকের স্থিতি, বিনিয়োগসহ সব কাজ ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নিয়ন্ত্রণে আসবে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন শাহি মসজিদের উদ্দেশ্যে দেওয়া সব দান গ্রহণ ও মসজিদের প্রয়োজনে ব্যয় করবে।

চট্টগ্রাম শাহি মসজিদ আইনের খসড়া গত ১২ আগস্ট মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের খসড়া আইন পরীক্ষা-নিরীক্ষাসংক্রান্ত কমিটিতে পাঠায় ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়। এ কমিটি অনুমোদনের পর আইনটি মন্ত্রিসভায় তোলার কথা ছিল। প্রতিটি আইন এ কমিটির অনুমোদনের পরই মন্ত্রিসভায় তোলা হয়। অর্থাৎ এই কমিটিই হচ্ছে মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের আগে শেষ ধাপ।

ধর্ম মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, চট্টগ্রামের শাহি মসজিদ মোগল স্থাপত্যের একটি অনন্য কীর্তি। যেভাবেই হোক মসজিদের এ নির্মাণশৈলী ধরে রাখা হবে।