মূল্যবান সম্পদ কখনো কখনো বড় বিপদ ডেকে আনে। যেমনটি উত্তর-পূর্ব থাইল্যান্ডের না নং বং গ্রামবাসী হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। গ্রামের খনি থেকে সোনা আহরণে রাসায়নিক ব্যবহার করে খননকারী প্রতিষ্ঠান। আর এ রাসায়নিক নদীতে মিশে পানির পাশাপাশি ফসলি জমি দূষিত করে। এরই প্রভাবে বাসিন্দাদের শরীরও বিষাক্ত হয়ে ওঠে। নানা রোগব্যাধি বাড়তে থাকে।
সবাই যখন মুখ বুঝে সব সহ্য করেছেন তখন এগিয়ে এসেছেন গ্রামের ‘দাদি’ রেনং কংসায়েন (৫৯)। তার মতোই সুঁই-সুতোর কাজে পারদর্শী কতিপয় নারীকে নিয়ে গড়ে তোলেন খনি দূষণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ। মূলত প্রকৃতিপ্রেমী এ নারী তার আন্দোলনের মাধ্যমে দেশটির ‘রেডিক্যাল গ্র্যান্ডমাদার’ পরিচিতি পেয়েছেন।
দ্য ডিপলোমেট বলছে, না নং বং গ্রামের নারীরা রেনং কংসায়েনের নেতৃত্বে হাতের কাজের স্কার্ফসহ বিভিন্ন পোশাক তৈরি করেন। আর এসব বিক্রির অর্থ থেকে তহবিল গঠন করে খনি দূষণের বিরুদ্ধে লড়াই করেন।
২০০৬ সালে লয়ি রাজ্যের গ্রামটি থেকে প্রথম সোনা আহরণ শুরু করে তাংকুম লিমিটেড। শিলা বিস্ফোরণ ঘটলে শুরুতে গ্রামবাসী তাদের বিরুদ্ধে ধুলাবালি ও শব্দদূষণের অভিযোগ আনে। পরে তারা শরীরে বিষের প্রভাব পান। এনজিও ফরটিফাই রাইটসের তথ্যে, ২০০৭ সালে খোদ সরকারি পরীক্ষায় স্থানীয় নদীর পানিতে আর্সেনিক, সায়ানাইড ও ম্যাঙ্গানিজের অনিরাপদ মাত্রার উপস্থিতি পাওয়া যায়। গ্রামবাসীর সব ধরনের প্রয়োজন মেটানোর একমাত্র উৎস এই নদীর পানি। এরপর ২০০৭ সালে স্থানীয়রা খনি ঘেরাও করে পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে এটি বন্ধের দাবি জানান। এ আন্দোলনে অংশ নেন রেনং কংসায়েন। তখনই তিনি স্বপ্ন দেখেন, গ্রামবাসীর লড়াইয়ে অর্থের জোগান দেবেন তিনি নারীদের সেলাই করা পোশাক বিক্রি করে।
এরপর এক দশকের বেশি ন্যায়বিচারের জন্য লড়াই চলছে। খননকারী প্রতিষ্ঠান ছাড়াও স্থানীয় প্রভাবশালীদের হুমকিধমকি, হয়রানি এমনকি ফৌজদারি মামলার মুখে পড়েছেন কংসায়েন ও তার সঙ্গীরা। ২০১৪ সালের ১৫ মে ট্রাকভর্তি করে দেড় শতাধিক মুখোশধারী গ্রামে এসে সশস্ত্র হামলা চালায়। পুলিশ ডেকেও সাড়া পায়নি গ্রামবাসী। ২০১৬ সালে আদালত একজন লে. জেনারেল ও অবসরপ্রাপ্ত আরেকজন লে জেনারেলকে হামলায় দোষীসাব্যস্ত করে।
এখন অবশ্য খনির কোনো কার্যক্রম নেই। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে লয়ির রাজ্য আদালত তাংকুম কোম্পানিকে ক্ষতিগ্রস্ত ১৪৯ পরিবারকে এককালীন ১ লাখ ৪ হাজার বাথ (৩১৫০ ডলার) দিতে রায় দেয়। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটিকে পরিবেশের আগের অবস্থা ফেরাতে যাবতীয় পদক্ষেপ নিতে বলে। কিন্তু এখন পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ কিংবা পরিবেশ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
রেনং কংসায়েন বলেন, ‘এখানে যা ঘটেছে, তার কিছুরই দায় নিতে রাজি নয় তাংকুম। এমনকি আদালতের নির্দেশনাও মানবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি আগামী প্রজন্মের জন্য লড়াই করেছি। তারা যাতে আমাদের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলতে না পারে। আমি এখন মরেও স্বস্তি পাব যে, আমি অন্তত অবিচারের বিরুদ্ধে লড়েছি।’ ২০১৬ সালের ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে কংসায়েন ও তার সঙ্গীদের প্রতিষ্ঠান দেশটির মানবাধিকার কমিশন থেকে অধিকারের স্বীকৃতির পুরস্কার পেয়েছে।