ব্যাংকগুলো যে জনগণের আমানত নিয়েই ব্যবসা করে থাকে, এই বাস্তবতার স্বীকৃতি বাংলাদেশে ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। ব্যাংকে গচ্ছিত জনগণের অর্থ কিছু মানুষের ব্যক্তিগত সম্পদে পরিণত হচ্ছে। জনগণের আমানত তদারকি এবং সুরক্ষা নিশ্চিত করা বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্ব হলেও নেতৃত্বের অদক্ষতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং ঋণখেলাপিদের চাপের কাছে নতি স্বীকার করে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে একটি অকার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। গতকাল এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে এ মন্তব্য করেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
‘ব্যাংকিং খাত তদারকি ও খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ : বাংলাদেশ ব্যাংকের সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি। গবেষণা প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হাসান। গবেষণা দলের অপর সদস্যরা হলেন এই বিভাগের ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার মো. জুলকারনাইন ও অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রোগ্রাম ম্যানেজার অমিত সরকার।
ব্যাংকিং খাত খাদের কিনারায় উল্লেখ করে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ব্যাংক মালিক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সরকার এই তিন পক্ষও ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থ যে জনগণের সম্পদ সেটি ভুলে গিয়ে লুটপাটকারী তথা ঋণখেলাপিদেরকেই ক্রমাগতভাবে সুযোগ করে দিচ্ছে। অনেক সময় তারা ঋণখেলাপি, জালিয়াতিকারী, অর্থ আত্মসাৎকারী ও অর্থ পাচারকারীদের সহায়ক শক্তি হিসেবেও ভূমিকা পালন করছে। এমনকি সরকারকেও তাদের কাছে জিম্মি মনে হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০০৯ সালের শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা, যা ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ১৬ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ এই সময়কালে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পরিমাণ প্রায় ৪১৭ শতাংশ। যদিও একই সময়ে মোট ঋণ বৃদ্ধির হার ৩১২ শতাংশ। টিআইবির গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দেশে ২০০৯ সালের শুরু থেকে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়কালে বছরে গড়ে ৯ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা ঋণ খেলাপি হয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বরাতে টিআইবি বলছে, ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত খেলাপি ঋণের প্রকৃত পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৪০ হাজার ১৬৭ কোটি টাকা। এর সঙ্গে অবলোপনকৃত খেলাপি ঋণ (৫৪,৪৬৩ কোটি টাকা) যোগ করলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা।
সংস্থাটির মতে, ঋণখেলাপিদের অনুকূলে বারবার আইন সংশোধন ও নীতি প্রণয়ন ব্যাংকিং খাতকে ঋণখেলাপিবান্ধব করেছে এবং খেলাপি ঋণকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করেছে, যা নিয়মিত ঋণ গ্রহীতাকেও খেলাপি হতে উৎসাহিত করছে। সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণ আদায়ে যথাযথ ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় বিপুল পরিমাণের খেলাপি ঋণ ব্যাংকিং খাতে বিশেষত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে চরম মূলধন সংকট তৈরি করেছে। আর এই সংকট কাটাতে প্রতি বছর রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে জনগণের করের টাকা থেকে ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ কিছু মানুষের অনিয়ম-দুর্নীতির বোঝা ক্রমাগতভাবে জনগণের ওপর চাপানো হচ্ছে।
টিআইবির গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন সময়ে খেলাপি ঋণ হ্রাস এবং ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হলেও তা কার্যকর করা হয় না। বরং সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক বারবার ঋণ পুনঃতফসিলিকরণ ও পুনর্গঠনের সুযোগ প্রদান করা হয়। সর্বশেষ ২০১৯ সালের মে মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি নির্দেশনায় খেলাপি ঋণের মাত্র ২ শতাংশ ফেরত দিয়ে পুনঃতফসিলিকরণের মাধ্যমে ১০ বছরের মধ্যে ঋণ পরিশোধের সুযোগ প্রদান করা হয়। ইচ্ছেকৃত খেলাপিদের জন্য সহজ শর্ত দেওয়ায় নিয়মিত ঋণগ্রহীতাকে খেলাপি হতে উৎসাহী করা হয়েছে।
পুনঃতফসিলের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ আদায় না করেই ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর হতে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ কমিয়ে চলতি বছরের মার্চে তা ৯২ হাজার ৫১০ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়। তারপরও বিভিন্ন ধরনের সুযোগ সুবিধা প্রদান ও খেলাপি কম দেখাতে বিবিধ কৌশল অবলম্বনের পরও জুন মাসে খেলাপি ঋণের পরিমাণ পুনরায় বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৯৬ হাজার ১১৭ কোটি টাকা। ঋণ শ্রেণিকরণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য মানদণ্ড অনুসরণ না করে শ্রেণিকৃত ঋণের প্রতি ধাপে তিন মাস করে সময় বৃদ্ধির কথাও উল্লেখ করা হয় গবেষণায়।
ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের মাধ্যমে কিছু পরিবারের হাতে ব্যাংকিং খাতের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার অভিযোগ করে গবেষণায় বলা হয়, একই পরিবার থেকে দুজনের পরিবর্তে চারজন পর্যন্ত পরিচালক রাখার বিধান, পরিচালকের মেয়াদ পরপর দুইবারে সর্বোচ্চ ছয় বছরের পরিবর্তে পরপর তিনবারে সর্বোচ্চ নয় বছর থাকার বিধান এবং একই পরিবারের চারজন সদস্যের বাইরে অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনকে পরিচালক হিসেবে নিয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছে।
প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র রাজনৈতিক বিবেচনায় ২০০৯ সালের পর থেকে ১৪টি নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দিতে বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রভাবিত বা বাধ্য করা হয়েছে বলে মনে করছে টিআইবি। নতুন ব্যাংকগুলোর উদ্যোক্তার মধ্যে মন্ত্রী, সাংসদ ও তাদের পরিবারের সদস্য, ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী, ছাত্র সংগঠনের নেতা, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী বিভিন্ন পেশাজীবী গ্রুপকে উল্লেখ করেছে টিআইবি।
টিআইবি বলছে, একক বা যৌথভাবে কোনো ব্যাংকের ১০ শতাংশের বেশি শেয়ার ক্রয় না করার বিধান থাকলেও এর ব্যত্যয় ঘটছে। বিভিন্ন ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডারদের কাছ থেকে স্বেচ্ছায় বা রাজনৈতিক প্রভাবে বাধ্য করে নামে-বেনামে কতিপয় ব্যবসায়ী কর্তৃক অধিক শেয়ার ক্রয়ের অভিযোগ রয়েছে। একটি ব্যবসায়ী গ্রুপ কর্তৃক ১৪টি প্রতিষ্ঠানের নামে একটি ব্যাংকের ২৮ শতাংশ এবং সাতটি প্রতিষ্ঠানের নামে অপর একটি ব্যাংকের ১৪ শতাংশ শেয়ার ক্রয়ের অভিযোগ রয়েছে।
একক পরিবারের পরিচালক সীমা লঙ্ঘন করে একাধিক ব্যাংকে একই পরিবারের চারের অধিক পরিচালক নিয়োগ করা হয়েছে উল্লেখ করে গবেষণায় বলা হয় একটি ব্যাংকে স্বামী, স্ত্রী, দুই পুত্র, মেয়ে ও নাতিসহ একই পরিবারের ছয়জন পরিচালক রাখা হয়েছে।
ব্যাংকের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর কতিপয় ব্যবসায়ী-শিল্প গ্রুপ, তাদের নিযুক্ত পরিচালক ও উচ্চপদস্থ ব্যাংকার, রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগকৃত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পরিচালক ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তির পারস্পরিক যোগসাজশের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ গ্রহণ করার কথাও উল্লেখ করেছে টিআইবি। জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রীর দেওয়া ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ পর্যন্ত দেশের ৫৫টি ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলোর পরিচালকরা একে অন্যের ব্যাংক থেকে ১ লাখ ৭১ হাজার ৬১৬ কোটি ১২ লাখ ৪৭ হাজার টাকা ঋণ নেওয়ার কথা তুলে ধরে গবেষণায় বলা হয়, যা ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের ১১ দশমিক ২১ শতাংশ। এসব ঋণের বিপুল পরিমাণ অংশ পরবর্তীতে খেলাপি হয়ে যায় এবং প্রভাবের মাধ্যমে এই খেলাপি ঋণে বারবার সুদ মওকুফ, পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন ও অবলোপন ইত্যাদি বাড়তি সুবিধা নেওয়া হয়ে থাকে বলেও মনে করছে টিআইবি।
এক্ষেত্রে টিআইবি উদাহরণ টেনেছে : একটি বেসরকারি ব্যাংকের চেয়ারম্যান বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে নেওয়া প্রায় ৮০০০ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ৫০০০ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ, যা একাধিকবার পুনর্গঠিত হয় এবং পরবর্তীতে আবার খেলাপি হলেও তিনি কখনো খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হন না।
এসব দিক উল্লেখ করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ব্যাংকিং খাত পরিচালনায় আইনি দুর্বলতা পাওয়ার পাশাপাশি সাম্প্রতিককালে প্রভাবশালী মহলের চাপে সেগুলো আরও দুর্বল করে দেওয়ার প্রবণতা গবেষণায় পাওয়া গেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ও ব্যক্তিমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহের ঋণ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমে বাংলাদেশ ব্যাংকের যে তদারকি সে ভূমিকাটা সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ বললে কোনো অত্যুক্তি হবে না।
ব্যাংকিং খাতের প্রকট সংকটময় এই পরিস্থিতির মূলে বাংলাদেশের দুর্বৃত্তায়িত রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে দায়ী করে ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, ‘এদেশের রাজনীতি ব্যবসার সঙ্গে একাকার হয়েই ক্ষান্ত হয়নি বরং তা ব্যবসায়ীদের হাতেই জিম্মি হয়ে পড়েছে। যার কুপ্রভাব ব্যাংকিং খাতেও পড়েছে। এর ফলে সরকারি ঘোষণায় খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ ও বাণিজ্যিক ব্যাংকিং খাত নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের সুশাসন ইত্যাদি বিষয়ে জোরালো অঙ্গীকার থাকলেও তার কোনো প্রয়োগ বা কার্যকর বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না; যা ব্যাংকিং খাতকে খাদের কিনারায় এনে দাঁড় করিয়েছে। তাই এই সংকট থেকে উত্তরণে অবিলম্বে সম্পূর্ণ স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং সরকার কিংবা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণমুক্ত একটি কমিশন গঠন করে স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনাসহ কৌশল প্রণয়ন ও অবিলম্বে বাস্তবায়ন অপরিহার্য।’