চলতি বছরের শুরুতে দেশের পুঁজিবাজারে অব্যাহত দরপতনের প্রেক্ষিতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানোর অংশ হিসেবে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে বিশেষ তহবিল গঠনের নির্দেশনা দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। গত ফেব্রুয়ারিতে নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে পুঁজিবাজার চাঙ্গা করতে প্রতিটি বাণিজ্যিক ব্যাংককে ২০০ কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠনে সহায়তার ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। কিছু ব্যাংক তহবিল গঠন করলেও পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তেমন উদ্যোগ নেয়নি। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেওয়া ওই তহবিলের সুদহার কমানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। গতকাল এ সংক্রান্ত একটি আদেশ জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে তফসিলি ব্যাংকগুলো নিজস্ব উৎস অথবা ধারণকৃত ট্রেজারি বিল অথবা বন্ড রেপোর মাধ্যমে বিশেষ তহবিল গঠন করতে পারবে। এ ক্ষেত্রে রেপোর সুদহার ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন এক সার্কুলার জারি করে বিশেষ তহবিলে রেপোর সুদহার শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশীয় পয়েন্ট কমিয়ে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। বর্তমানে মুদ্রা বাজারের পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান করার জন্য সুদহার কমানোর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গতকাল জারি করা সার্কুলারে বলা হয়, গত ১০ ফেব্রুয়ারি জারি করা সার্কুলারের ২ (ঙ) (৩) নং অনুচ্ছেদে তালিকাভুক্ত করপোরেট বন্ড বা ডিবেঞ্চারের ক্ষেত্রে ফিক্সড রেট ন্যূনতম ১০ শতাংশ কুপন বা সুদবাহী হতে হবে বিষয়টি প্রতিস্থাপিত হবে। ভেরিয়েবল রেট হবে ন্যূনতম সুদের হার কুপন প্রদানের মাসের অব্যবহিত পূর্বে সমাপ্ত মাসে বিদ্যমান সর্বশেষ ইস্যুকৃত (১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদহার + ১ শতাংশ) এর কম হতে পারবে না। এ ছাড়া যেকোনো মেয়াদের সরকারি বন্ড বা বিল, সম্পদভিত্তিক বন্ড/সুকুকের ক্ষেত্রে ফিক্সড রেট ন্যূনতম ৮ শতাংশ কুপন বা মুনাফাবাহী হতে হবে। ভেরিয়েবল রেট হবে ন্যূনতম মুনাফা বা সুদের হার কুপন প্রদানের মাসের অব্যবহিত পূর্বে সমাপ্ত মাসে বিদ্যমান সর্বশেষ ইস্যুকৃত (১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদহার + ০.৫০ শতাংশ) এর কম নয়।
প্রসঙ্গত, টানা দরপতনে ক্রেতা সংকট পরিস্থিতি তৈরি হলে সরকারের উদ্যোগে গত ১০ ফেব্রুয়ারি পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য ব্যাংক ও মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষ তহবিল গঠন করে। তফসিলি ব্যাংকগুলো ট্রেজারি বিল ও বন্ড রেপোর মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য বিশেষ তহবিল গঠনের সুযোগ তৈরি হয়। ব্যাংকগুলো চাইলে নিজস্ব উৎস থেকেও এমন তহবিল গঠন করতে পারে। এর ফলে পুঁজিবাজারে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়। এ তহবিল থেকে বিনিয়োগ পুঁজিবাজারে ব্যাংক কোম্পানি আইনের বর্ণিত বিনিয়োগ গণনার বাইরে থাকবে। এ সুবিধা ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বহাল থাকবে।
কিন্তু তহবিল গঠনে সার্কুলার জারির পর দীর্ঘ সময় পার হলেও পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে ব্যাংকগুলোর তেমন তৎপরতা দেখা যায়নি। এরই মধ্যে কিছু ব্যাংক বিশেষ তহবিল গঠন করলেও পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ ব্যাংক তহবিল গঠনের পরবর্তী ছয় মাসে মোট ১৫টি ব্যাংক ১ হাজার ৮৫০ কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠন করেছে। ওই তহবিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত সময়ে মাত্র ১৯০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। তহবিল গঠনের পরও পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না করায় পরবর্তীতে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা ব্যাংকগুলোর কাছে তাদের বিনিয়োগ পরিস্থিতি জানতে চিঠি পাঠায়।
অবশ্য গত ১০ ফেব্রুয়ারি সার্কুলারে বলা হয়েছে, ব্যাংকগুলো নিজস্ব বিবেচনা ও সুবিধা অনুসারে তহবিল ব্যবহার করতে পারবে। তবে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও পুঁজিবাজারের সার্বিক স্বার্থে ওই তহবিলের ন্যূনতম ১০ শতাংশ মিউচুয়াল ফান্ডে ও ১০ শতাংশ স্পেশাল পারপাস ফান্ডের মাধ্যমে স্বীকৃত কোনো সম্পদের বিপরীতে ইস্যুকৃত সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করতে হবে।
কোনো তফসিলি ব্যাংক কর্তৃক গঠন করা তহবিলের সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ ব্যাংকের নিজস্ব পোর্টফোলিওতে ব্যবহার করতে পারবে। ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি কোম্পানির নিজস্ব নতুন পোর্টফোলিও গঠনের জন্য ঋণ হিসেবে তহবিলের ২০ শতাংশ দেওয়া যাবে। অন্য ব্যাংকের বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাবসিডিয়ারি মার্চেন্ট ব্যাংক বা ব্রোকারেজ হাউজের নিজস্ব নতুন পোর্টফোলিওর জন্য ৩০ শতাংশ ও অন্যান্য মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউজের নিজস্ব নতুন পোর্টফোলিও গঠনের জন্য তহবিলের ১০ শতাংশ ঋণ হিসেবে দেওয়া যাবে। এই তহবিলের অর্থ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাংক, তার সাবসিডিয়ারি ও অন্যান্য মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউজের নিজস্ব পোর্টফোলিও গঠনের জন্য পৃথক বিও (বেনিফিসিয়ারি ওনার্স) হিসাব খুলতে হবে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ওই পোর্টফোলিওর বাজারভিত্তিক পুনঃমূল্যায়ন বন্ধ থাকবে। তবে ক্রয়মূল্যের ভিত্তিতে আর্থিক বিবরণী প্রকাশ করতে হবে।