ভাঙ্গা, সদরপুর ও চরভদ্রাসন উপজেলা নিয়ে গঠিত ফরিদপুর-৪ সংসদীয় আসনে দীর্ঘদিন ধরেই কাজী জাফরউল্যা আওয়ামী লীগের আনুষ্ঠানিক অংশটির নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। আর বর্তমান সংসদ সদস্য মুজিবর রহমান ওরফে নিক্সন চৌধুরীর দল থেকে সমর্থন না পেলেও স্বতন্ত্র হিসেবেই পরপর দুবার সাংসদ নির্বাচিত হয়েছেন। গত কয়েক বছর ধরে সংসদ নির্বাচন ছাড়াও স্থানীয় সব নির্বাচনেই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়ে আসছে তাদের প্রার্থীদের মধ্যে। চরভদ্রাসন উপজেলার এবারের উপনির্বাচনেও মনোনয়ন ঘোষণার পর থেকেই উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. কাউসার দলীয় প্রতীক নৌকা নিয়ে এবং নিক্সন সমর্থিত আনোয়ার আলী মোল্লা আনারস প্রতীক নিয়ে প্রচারণা শুরু করেন। আগামী ১০ অক্টোবর সেখানে হবে ভোট। কিন্তু ভোটের আগে গতকাল ওই আসনের আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে নিয়েছে নাটকীয় মোড়। আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী কাউসার সোনার নৌকা নিয়ে যোগ দিয়েছেন নিক্সন শিবিরে।
গতকাল নিক্সন চৌধুরীর বাড়ি ভাঙ্গার আজিমনগর ইউনিয়নের ব্রাহ্মণপাড়া গ্রামে এ যোগদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানের ব্যানারে লেখা ছিল, ‘জনাব মুজিবর রহমান নিক্সন চৌধুরী এমপির প্রতি আস্থা জ্ঞাপন করে চরভদ্রাসন উপজেলা আওয়ামী লীগের সংগ্রামী সাধারণ সম্পাদক ও চরভদ্রাসন উপজেলা পরিষদের উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত (নৌকা) প্রার্থী জনাব মো. কাউসারের যোগদান অনুষ্ঠান। প্রচারে চরভদ্রাসনের সর্বস্তরের জনগণ।’
ওই অনুষ্ঠানের শুরুতে বিকেল ৫টার দিকে দুই ভরি ওজনের একটি সোনার নৌকা তুলে দিয়ে নিক্সনের সঙ্গে যোগ দেন মো. কাউসার। এ সময় ফুলের তোড়া দিয়ে নিক্সনের সঙ্গে যোগ দেন চরভদ্রাসন সদর ইউনিয়নের সভাপতি মো. রুবেল মোল্লা, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বাবুল মোল্লা ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম মৃধা।
গত বছর ২৩ অক্টেবর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন মুসার মৃত্যুতে উপজেলার চেয়ারম্যান পদটি শূন্য হয়ে যায়। গত ২৯ মার্চ সেখানে উপনির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। তবে মহামারী করোনার কারণে গত ২৬ মার্চ ওই নির্বাচন স্থগিত ঘোষণা করা হয়। গত ১৩ সেপ্টেম্বর এক প্রজ্ঞাপনে আগামী ১০ অক্টোবর এ নির্বাচনে ভোটগ্রহণের দিন ধার্য করে নির্বাচন কমিশন।
এ নির্বাচনকে ঘিরে গত বৃহস্পতিবার দুপুর থেকেই ঘটতে শুরু করে নাটকীয় সব ঘটনা। স্বতন্ত্র সাংসদ সমর্থিত প্রার্থী আনোয়ার আলী মোল্লা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন।
এরপর গতকাল দুপুরে কাউসার নিক্সনের ব্রাহ্মণপাড়ার বাসভবনে আসেন। তিনি তার সমর্থকদের নিয়ে সেখানে দুপুরের খাবার খান। পরে বিকেলে এ যোগদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ভাঙ্গা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সাহাদাত হোসেন।
ওই যোগদান অনুষ্ঠানে নিজের অবস্থানের ব্যাখ্যা দিয়ে কাউসার হোসেন বলেন, আমি ইতিপূর্বে আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য কাজী জাফরউল্যাহর বিশ্বস্ত হিসেবে কাজ করেছি। কিন্তু তিনি (কাজী জাফরউল্যাহ) মানুষের প্রতি সম্মান দেখাতে পারেন না। আমি ২০০৯, ২০১৪ ও ২০১৯ সালে এ উপজেলার চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করেছি। কিন্তু জিততে পারিনি। এবার নির্বাচনের আগে আমার উপলব্ধি হয়েছে স্বতন্ত্র সাংসদের সমর্থন ছাড়া এ নির্বাচনে জেতা সম্ভব নয়। তাই অনেক ভেবেচিন্তে পরামর্শ করে আমি সাংসদের সঙ্গে দেখা করেছি এবং যোগদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
তিনি বলেন, নৌকা হারলে প্রধানমন্ত্রীর মুখ কালো হয়ে যায়। প্রধানমন্ত্রীর মুখে হাসি ফোটাতে আমি স্বতন্ত্র সাংসদের সঙ্গে যোগ দিয়েছি।
তিনি বলেন, এ যোগদান অনুষ্ঠান চরভদ্রাসনে করার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু সেখানে করা হলে তা নির্বাচনী আচরণবিধি লংঘিত হতো। এ কারণে আমি সাংসদের বাড়িতে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছি।
‘যদি থাকে নসিবে আপনা আপনি আসিবে’ এ গানে কলি আউড়িয়ে কাউসারকে স্বাগত জানিয়ে স্বতন্ত্র সাংসদ মুজিবর রহমান নিক্সন বলেন, আমার ডান পাশে দেখেন, বাম পাশে দেখেন সবাই এখন আমার লোক। আমি দুইবার এ এলাকার সাংসদ হয়েছি, এলাকার উন্নয়নে যে পরিমাণ কাজ করেছি তা অতীতে হয়নি। তাই আমার প্রতি কৃতজ্ঞ হয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা যোগ দিচ্ছেন।
নিক্সন বলেন, আমার শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে আওয়ামী লীগের রক্ত। আজকে অনেক বিএনপি নেতাও আমার সঙ্গে জয় বাংলা স্লোগান দেয়। এটি আমার প্রাপ্তি বলে মনে করি।
তিনি বলেন, কাজী জাফরউল্যাহ গত ৬ মাসেও এলাকায় আসেননি। আমি তার মতো নৌকা বাই না। আমি বঙ্গবন্ধুর নৌকা বাই। বিভিন্ন প্রতিকূলতা অতিক্রম করেই আমি এলাকাবাসীর জন্য কাজ করছি।
নিক্সন চৌধুরী বলেন, আমি প্রধানমন্ত্রীকে বলেছি যে আমি নৌকার বিপক্ষে রাজনীতি করি না। আমি তিন থানার জনগণকে মুক্ত করার জন্য একজনের বিপক্ষে রাজনীতি করি। বিএনপির প্রার্থী ও সমর্থকদের বলে দিয়েছি, এবার আমি নিক্সন চৌধুরী নৌকার প্রার্থীকে নিয়ে নামছি। নৌকা প্রার্থীকে বিজয়ী করে শেখ হাসিনাকে উপহার দেব ইনশা আল্লাহ।
এদিকে নৌকার প্রার্থী হয়েও বিদ্রোহীদের (নিক্সন) সঙ্গে যোগ দিয়ে কাউসার সংগঠনের নীতিবিরুদ্ধ কাজ করেছেন বলে দাবি করেছেন ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মাসুদ হোসেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, কাউসারের বিরুদ্ধে শিগগিরই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।