দেশে ক্রমবর্ধমান হারে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা বাড়তে থাকার পরিপ্রেক্ষিতে মামলাজট নিয়ন্ত্রণে আনতে ২০১৫ সালের আগস্টে আইন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাছে একটি প্রতিবেদন দাখিল করেছিল আইন কমিশন। প্রতিবেদনটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছিল দেশে প্রতি ৪০ হাজার নাগরিকের জন্য একজন করে বিচারক প্রয়োজন। সে হিসেবে বিদ্যমান অবকাঠামোতে আরও চার হাজার বিচারক নিয়োগের প্রয়োজন থাকলেও আইন কমিশন সে সময় ২ হাজার ৪০০ বিচারক নিয়োগের সুপারিশ করে। অবশ্য তখন দেশে জনসংখ্যা ছিল ১৬ কোটির মতো এবং বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিল প্রায় ৩০ লাখ। কিন্তু বিগত পাঁচ বছরেও বিচারক নিয়োগে আইন কমিশনের সেই সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি। এদিকে, উচ্চ ও অধস্তন আদালতে দেওয়ানি, ফৌজদারি ও অন্যান্য বিচারাধীন মামলার সংখ্যা বাড়তে বাড়তে এখন প্রায় ৩৭ লাখে পৌঁছে গেছে। এর মধ্যে অধস্তন আদালতে বিচারাধীন এবং নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকা মামলার সংখ্যা প্রায় ৩২ লাখ। এত বিপুলসংখ্যক মামলা নিষ্পত্তির জন্য বিভিন্ন পদমর্যাদার যতসংখ্যক বিচারক ও যে রকম অবকাঠামো প্রয়োজন সেটা না থাকাই মামলাজট নিরসনের প্রধান অন্তরায় বলে মনে করছেন বিচারাঙ্গন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে করোনা পরিস্থিতিতে দীর্ঘ সময় উচ্চ ও অধস্তন আদালতের নিয়মিত কার্যক্রম বন্ধ থাকায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিচারক নিয়োগ ও অবকাঠামো উন্নয়নের তাগিদ আরও বেড়েছে।
শনিবার দেশ রূপান্তরে ‘বিচারক-অবকাঠামো সংকটে অধস্তন আদালত : ১৮০০ বিচারকের কাঁধে ৩২ লাখ মামলার বোঝা’ শিরোনামের প্রতিবেদনে করোনাকালে এসে মামলাজটের হালনাগাদ চিত্র তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন ও আইন মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সারা দেশের অধস্তন আদালতে ১ হাজার ৮২০ জন বিচারক কর্মরত রয়েছেন। জেলা ও দায়রা জজ আদালত, মহানগর দায়রা জজ আদালত, চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ও চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতসহ বিভিন্ন আদালতে বিচারকাজ পরিচালনা করছেন তারা। তবে স্বল্প লোকবল ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো না থাকায় মামলা পরিচালনা ও জট নিরসনে কার্যকর সমাধান আসছে না। সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের তথ্যানুযায়ী উচ্চ ও অধস্তন আদালতে দেওয়ানি, ফৌজদারিসহ অন্যান্য বিচারাধীন মামলা ৩৬ লাখ ৮৪ হাজার ৭২৮টি। এর মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগে বিচারাধীন মামলা রয়েছে ৫ লাখ ১২ হাজার। আর গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত অধস্তন আদালতে ৩১ লাখ ৭২ হাজার ৪৩টি মামলা বিচারাধীন ছিল। এর মধ্যে ১৩ লাখ ৬৫ হাজার ৬৭৮টি দেওয়ানি এবং ১৮ লাখ ৬ হাজার ৩৬৫টি ফৌজদারি মামলা। বর্তমানে অনিষ্পন্ন মামলা বাড়ার যে গতি তাতে অধস্তন আদালতে একেকজন বিচারকের হাতে গড়ে মামলা রয়েছে ১ হাজার ৭৫৮টি করে। অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে দেওয়ানি, ফৌজদারি ও অন্যান্য ২৩ হাজার ৬১৭টি মামলা বিচারাধীন। এছাড়া হাইকোর্ট বিভাগে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৪ লাখ ৮৯ হাজার ৬৮টি। সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে ৯৭ এবং আপিল বিভাগে ৭ জন বিচারপতি বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন।
মামলাজট নিরসনের উপায় সম্পর্কে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও বিচারাঙ্গন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু বিচারক নিয়োগ করলেই এই সংকটের সমাধান হবে না। একজন বিচারকের জন্য অন্যান্য আনুষঙ্গিক যে সুযোগ-সুবিধা ও লোকবল দরকার সেটিও প্রয়োজন। তারা বলছেন, এখন যে অবস্থা তাতে অনেক সময় বিচারকদের শিফটিং পদ্ধতিতেও বিচারকাজ করতে হয়। একই এজলাসে সকালে একজন বিচারক বিচারকাজ পরিচালনা করেন, আবার দুপুরে আরেকজন। কিন্তু এতেও মামলাজট নিরসনে খুব একটা সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। এজন্য বিচারক নিয়োগ ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো বাড়াতে হবে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ মনে করেন, মামলাজটের বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে শুধু জুডিশিয়াল ক্যাডারের ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। সরকার চাইলে এই সংকট মোকাবিলায় বিশেষ ব্যবস্থায় অবসরপ্রাপ্ত বিচারক এবং অভিজ্ঞ আইনজীবীদের মধ্য থেকেও বিচারক নিয়োগ করতে পারে।
তবে, এটা ঠিক যে একসঙ্গে বিপুল সংখ্যক বিচারক নিয়োগ দেওয়া অবশ্যই কঠিন। এছাড়া তড়িঘড়ি বিচারক নিয়োগ করতে গিয়ে বিচারকের মান ও দক্ষতার প্রশ্নে যাতে কোনো আপস করা না হয় সে বিষয়ে সতর্ক থাকার তাগিদ দিয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিরা। পাশাপাশি বিদ্যমান বিচারিক কাঠামোয় কোন কোন স্তরে বিচারাধীন মামলাগুলো দীর্ঘসূত্রতায় পর্যবসিত হচ্ছে এবং সেসব ক্ষেত্রে বিচারক, আদালতের কর্মকর্তা-কর্মচারী কিংবা তদন্তকাজে পুলিশ প্রশাসনের কোনো দুর্বলতা রয়েছে কি না এবং সেসব কীভাবে নিরসন করা যায় সেটাও বিবেচনা করা জরুরি। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে বর্তমান মামলাজট নিরসনে আইন অঙ্গনের অভিজ্ঞ লোকদের নিয়ে একটি জুডিশিয়াল কমিটি গঠন করে তাদের সুচিন্তিত মতামত নেওয়া যেতে পারে।