মাদক জুয়ায় মত্ত ছাত্রলীগ

করোনা পরিস্থিতিতে গত ১৭ মার্চ থেকে সারা দেশের মতো সিলেট এমসি কলেজও বন্ধ হয়। এরপর ২৫ মার্চ থেকে খাতাকলমে ‘বন্ধ’ ছিল কলেজ ছাত্রাবাসও। সাধারণ আবাসিক ছাত্ররা যার যার বাড়ি চলে গেছেন। আর এই ফাঁকা পরিবেশকেই নিজেদের নানা অপকর্মের জন্য মোক্ষম সময় হিসেবে বেছে নিয়েছিল ছাত্রলীগ পরিচয়ধারী কতিপয় শিক্ষার্থী ও তাদের বহিরাগত সঙ্গীরা। তারা প্রভাব খাটিয়ে বন্ধের সময়েও ছাত্রাবাসে বসবাস করছিল। সন্ধ্যার পরে ছাত্রাবাসের এসব কক্ষে বসত মদ-জুয়ার আসর। ছিনতাই-চাঁদাবাজিসহ নানা অপকর্মের পরিকল্পনা, ভাগ-বাটোয়ারাও এখানে বসে হতো। ছিল অস্ত্রের মজুদও। এরই ধারাবাহিকতায় গত শুক্রবার সন্ধ্যায় এমসি কলেজ এলাকায় বেড়াতে যাওয়া এক নবদম্পতিকে ঘিরে ধরে ছাত্রলীগকর্মী পরিচয়ধারী কয়েকজন যুবক। পরে ওই দম্পতিকে ছাত্রাবাসের ৭ নম্বর ব্লকে নিয়ে স্বামীকে একটি কক্ষে আটকে রেখে পাশের কক্ষে স্ত্রীকে পালা করে ধর্ষণ করে। মধ্যরাতে পুলিশ ওই দম্পতিকে উদ্ধার করে।

গতকাল শনিবার সরেজমিন ছাত্রাবাস এলাকায় গিয়ে আশপাশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এসব ব্যক্তি জানান, করোনার কারণে কলেজ ছাত্রাবাস বন্ধ থাকলেও ছাত্রলীগ পরিচয়ধারী বেশ কিছু ছাত্র ও তাদের বহিরাগত বন্ধুরা ছাত্রাবাসেই অবস্থান করছিল। ছাত্রাবাস সংলগ্ন বালচুর বাজারের এক ব্যবসায়ী বলেন, প্রতি রাতে ছাত্রাবাসের ভেতর থেকে হৈ-হুল্লোড়ের আওয়াজ শোনা যেত। সেখানে মদ-জুয়ার আসর বসাত তারা। শুক্রবার রাতেও এরকম হইচই শোনা গেলেও প্রথমে কেউ তেমন পাত্তা দেননি। তারা মনে করেছিলেন, প্রতি রাতের মতো আজও হয়তো মদের আসর বসেছে। পরে নারীকণ্ঠের চিৎকার শুনে তারা এগিয়ে গিয়ে নির্মম ঘটনা দেখতে পান।

ছাত্রাবাস বন্ধ থাকার পরও কীভাবে সেখানে ছাত্ররা বসবাস করল এটা  নিয়েই এখন সিলেটজুড়ে সব মহলে প্রশ্ন উঠেছে। তাহলে কি কলেজ কর্র্তৃপক্ষ এসব অপকর্ম দেখেও না দেখার ভান করে যাচ্ছিল। আর এই প্রশ্রয়ের সুযোগেই শুক্রবার রাতে স্বামীর কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে একজন নববধূকে গণধর্ষণের মতো লোমহর্ষক ঘটনা ঘটানো হয়েছে।

তবে এমসি কলেজের অধ্যক্ষ ও ছাত্রাবাসের তত্ত্বাবধায়ক বলেছেন ভিন্ন কথা। তাদের দাবি, কিছু গরিব ছাত্রকে মানবিক বিবেচনায় থাকার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। এরা টিউশনি কিংবা ছোট চাকরি করে লেখাপড়ার খরচ চালায়। তবে গণধর্ষণ ঘটনার পর গতকাল শনিবার কলেজ কর্র্তৃপক্ষ ‘বন্ধ’ ছাত্রাবাসকে ফের বন্ধ ঘোষণা করেছে। গতকাল দুপুরের মধ্যে সবাইকে ছাত্রাবাস ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছেন তারা।

কলেজ ছাত্রবাসের তত্ত্বাবধায়ক জামাল উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কিছু ছাত্রকে মানবিক কারণে থাকার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। এরইমধ্যে এমন ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটবে তা আমরা কল্পনাও করতে পারিনি।’

রাজনৈতিক প্রভাবে অভিযুক্ত ধর্ষকরা ছাত্রাবাসে ছিল কি-না এমন প্রশ্নের উত্তরে তত্ত্বাবধায়ক বলেন, ‘সে রকম কিছু নয়।’

অন্যদিকে কলেজ অধ্যক্ষ সালেহ আহমদ বলেন, ‘বন্ধের মধ্যে কীভাবে ছাত্রাবাসে থাকার সুযোগ পেয়েছিল তা ছাত্রাবাসের তত্ত্বাবধায়কই ভালো জানেন। তবে ঘটনার পর আজ (শনিবার) আমি জানতে পারি, মানবিক কারণে এদের থাকার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।’

১৮৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় দেশের অন্যতম প্রাচীন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান সিলেট মুরারি চাঁদ (এমসি) কলেজ। সিলেট নগরের টিলাগড় এলাকায় ৬শ শতক জমির ওপর ১৯২০ সালে আসাম স্থাপত্যরীতিতে সেমিপাকা ছাত্রাবাস নির্মিত হয়। ২০১২ সালের ৮ জুলাই ছাত্রলীগ-শিবির সংঘর্ষের জের ধরে আগুন দিয়ে পোড়ানো হয়েছিল ছাত্রাবাসের ৪২টি কক্ষ। ২০১৪ সালের ১৪ অক্টোবর পুনর্নির্মিত ছাত্রাবাস উদ্বোধন করা হয়। এরপর থেকে ছাত্রলীগই এককভাবে ছাত্রাবাসে আবাসিক ছাত্রদের বসবাস নিয়ন্ত্রণ করছে। তাদের পছন্দ-অপছন্দেই সাধারণ ছাত্রদের থাকার সুযোগ পাওয়া নির্ভর করত। বিশেষ করে গত শুক্রবার ছাত্রাবাসের যে ব্লকে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে সেখানে নির্মিত ‘নতুন ভবনটি’ ছাত্রলীগেরই দখলে ছিল। এই ভবনের পাশে তত্ত্বাবধায়কের বসবাসের জন্য নির্ধারিত বাংলোয় প্রভাব খাটিয়ে বসবাস করত ধর্ষণ মামলার অন্যতম আসামি সাইফুর রহমান। গতকাল ভোরে তার কক্ষে পুলিশ অভিযান চালিয়ে আগ্নেয়াস্ত্রসহ দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করেছে।

জানা যায়, ২০১৪ সালের ১৪ অক্টোবর ছাত্রাবাস খোলার পর থেকে বিভিন্ন কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ছাত্রলীগের নিজেদের মধ্যেও বিরোধ ছিল। এজন্য বিভিন্ন গ্রুপ-উপগ্রুপের সৃষ্টি হয়। ২০১৭ সালের ১৩ জুলাই ছাত্রলীগের দুই গ্রপের সংঘর্ষে ছাত্রাবাসে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। তখন কিছুদিন বন্ধ ছিল ছাত্রাবাস। গত বছরের ৬ আগস্ট রাতে ছাত্রাবাসের ৭ নম্বর ব্লকের কক্ষ দখল নিয়ে ফের ছাত্রলীগের নিজেদের মধ্যে মারামারি হয়। ওই সময়ও কিছুদিন ছাত্রাবাস বন্ধ ছিল। এরপর গত ২৫ মার্চ থেকে করোনার কারণে ছাত্রাবাস বন্ধ রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরেই এমসি কলেজ ছাত্রাবাস ছাত্রলীগের দখলে। ছাত্রদের পাশাপাশি অনেক অছাত্রও এখানে আস্তানা গেড়েছে। ছাত্রাবাসের ভেতরে নিজেদের সা¤্রাজ্য গড়ে তুলেছে কিছু ছাত্রলীগ নেতাকর্মী। টিলাগড় এলাকার আওয়ামী লীগ নেতা আজাদুর রহমান আজাদ ও রনজিত সরকারসহ কিছু নেতার প্রশ্রয়ে এরা হয়ে ওঠে বেপরোয়া। বিভিন্ন গ্রুপ-উপগ্রুপে বিভক্ত এসব ছাত্রলীগ পরিচয়ধারীরা নানা অপকর্মে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে প্রাণও গেছে অনেকের। 

আওয়ামী লীগ নেতারা জানান, নানা বিতর্কের কারণে সিলেট জেলা, মহানগর ও এমসি কলেজসহ অনেক ইউনিটেই ছাত্রলীগের কোনো কমিটি নেই। এখন যে যার মতো ‘ছাত্রলীগ নেতা’ পরিচয় দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের অনেকে করছে নানা অপকর্ম।