১০ কোটি টাকা মূল্যের সরকারি জমি ব্যক্তির নামে হস্তান্তর, ১৪টি প্লট বরাদ্দে অনিয়ম এবং নামমাত্র উচ্ছেদ অভিযানে কোটি টাকা খরচ দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে জাতীয় গৃহায়ন কর্র্তৃপক্ষের (জাগৃক) সাবেক চেয়ারম্যান মো. রাশিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে প্রচলিত নিয়মের বাইরে গিয়ে সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ ফাইল প্রক্রিয়াকরণ ও অনুমোদনের অভিযোগও পাওয়া গেছে। সরকারের অতিরিক্ত সচিব এ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সম্প্রতি জনপ্রশাসন, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিতভাবে এসব অভিযোগ করেছেন মনির হোসেন নামে এক ব্যক্তি। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ওই অভিযোগ পাওয়ার পর রাশিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে। এ কর্মকর্তার দায়িত্বকালীন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু নথিপত্র চেয়ে জাগৃকে চিঠি পাঠিয়েছে তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গৃহায়ন ও গণপূর্ত সচিব শহীদ উল্লা খন্দকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাবেক চেয়ারম্যান রাশিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। মন্ত্রণালয়ের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি কাজ করছে। এই মুহূর্তে আর কোনো মন্তব্য করতে চাই না।’ এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে জাগৃকের সাবেক চেয়ারম্যান মো. রাশিদুল ইসলামকে একাধিকবার ফোন করেও সাড়া মেলেনি।
গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মো. রাশিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. হেমায়েত হোসেনকে আহ্বায়ক ও উপসচিব মো. মাহবুবুর রহমান এবং সিনিয়র সহকারী সচিব জহুরা খাতুনকে কমিটির সদস্য করা হয়েছে। এ কমিটি ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পাওয়া লিখিত অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখছে।
লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বর সেকশনের ‘বি’ ব্লকের ১ নম্বর সড়কের ৯ নম্বর প্লটটি অর্পিত সম্পত্তি ‘ক’ তালিকাভুক্ত। ১৯৬৮ সালে ৫ কাঠার এ প্লটটি পাকিস্তানি নাগরিক নাজির আক্তারের নামে বরাদ্দ হয়। তার মৃত্যুর পর বৈধ ওয়ারিশ না পেয়ে সরকার ১৯৮৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর এসআরও ৩৬৪-এল/৮৬-এর মাধ্যমে পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে গেজেটভুক্ত করে। কিন্তু মিজানুর রহমান নামে এক ব্যক্তি সাবেক চেয়ারম্যান রাশিদুল ইসলামকে ম্যানেজ করে নামজারি ও হস্তান্তরের অনুমতি বাগিয়ে নেন। তাকে মিরপুর-১১ নম্বর সেকশনের ‘বি’ ব্লকের ৯ নম্বর রোডের ৫০ নম্বর প্লটের বিকল্প হিসেবে ২৯ নম্বর রোডের ৪ নম্বর প্লটটি বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু এতে নিয়ম অনুযায়ী বর্তমান বাজার মূল্য না নিয়ে আগের মূল্যে অর্থ আদায়ের সিদ্ধান্তে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। একইভাবে ১১ নম্বর সেকশনের ‘বি’ ব্লকের ৫০ নম্বর প্লট এবং ৮ নম্বর সেকশনের ‘খ’ ব্লকের ৪ নম্বর রোডের ৮ নম্বর প্লটটি বিকল্প বরাদ্দ দিলে সরকারের কমপক্ষে ৩ কোটি টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাগৃকের একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ভূমি শাখার যেকোনো নথি চেয়ারম্যানের কাছে যেতে হলে ডিলিং অ্যাসিস্ট্যান্ট, সহকারী পরিচালক, উপপরিচালক, পরিচালক ও সর্বশেষ ভূমি ও সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা বিভাগের সদস্যের মাধ্যমে যায়। কিন্তু এসব নিয়মকানুনের কোনো তোয়াক্কা করেননি সাবেক চেয়ারম্যান রাশিদুল। তিনি তার আস্থাভাজন কর্মকর্তা সংস্থাটির সচিব (উপসচিব) ও এক অফিস সহকারীর মাধ্যমে নথি উত্থাপন করে নিজেই সব কাজ করতেন।
৮ প্লটের নথি তলব : গত ১৩ আগস্ট পূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে জাগৃক চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো চিঠিতে আট প্লটের নথি তলব করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের উপসচিব লুৎফুন নাহার স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘সাবেক চেয়ারম্যান রাশিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও দুদকে জমা পড়া অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে মোহাম্মদপুর ‘এফ’ ব্লকের ৪১/১২ ও ৪১/১৩ পুনর্বাসন প্লট, মিরপুর-১ নম্বর সেকশনের ‘এইচ’ ব্লকের (কাজীফুরী) ১১ নম্বর রোডের ৮ ও ১৩ নম্বর রোডের ৫ নম্বর প্লট, মিরপুর-১১ নম্বর সেকশনের ‘ই’ ব্লকের ১২ নম্বর রোডের ২১৭ নম্বর প্লট, ৬ নম্বর সেকশনের ‘এ’ ব্লকের ২২/এ প্লট, মিরপুরের ১০ নম্বর সেকশনের ‘বি’ ব্লকের ১ নম্বর রোডের ৮ নম্বর প্লট ও ১১ নম্বর সেকশনের ‘বি’ ব্লকের ৯ নম্বর রোডের ৫০ নম্বর প্লটের মূল নথি পর্যালোচনা প্রয়োজন।’ এ বিষয়ে জানতে জাগৃকের চেয়ারম্যান মো. দেলওয়ার হায়দারের ব্যক্তিগত ফোনে কল দিয়েও সাড়া পাওয়া যায়নি।
উচ্ছেদের নামে কোটি টাকা লোপাট : সরকারি একটি প্লট প্রকল্পে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের জন্য ৬ হাজার ২৫০ জন শ্রমিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একবেলা খাবার বাবদ লেগেছে ১০ লাখ ৯৩ হাজার ৭৫০ টাকা। বুলডোজার ভাড়া ৫৪ লাখ ৫ হাজার ৪০০ টাকা, মাইক ও রিকশা ভাড়া ৪০ হাজার ৫০০ টাকা, উচ্ছেদ অভিযানে শ্রমিকদের মাথায় বাঁধার লাল ফিতা কিনতে ২০ হাজার টাকা, পুলিশ আনা-নেওয়ার কাজে ১২৫টি বাসের ভাড়া ১৪ লাখ ৮৫ হাজার টাকা, শ্রমিক আনা-নেওয়ার জন্য ট্রাক ভাড়া ৯ লাখ ৫০ হাজার ৪০০ টাকা ও ১৫টি অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া বাবদ খরচ হয়েছে ১ লাখ ২৪ হাজার ৭৪০ টাকা। দাপ্তরিক নথিপত্রে ৫ দিনের উচ্ছেদ অভিযানে এভাবে প্রায় কোটি টাকা খরচের ফিরিস্তি দিয়ে বেশিরভাগ অর্থ সংশ্লিষ্টরা নিজেদের পকেটে পুরেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। জানা গেছে, মিরপুর ৮ নম্বর সেকশনের দুয়ারীপাড়া এলাকায় গত বছর ২২ ডিসেম্বর উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এ অর্থ ব্যয় হয়েছে। ২৩ একর জমির বেশিরভাগ অংশে থাকা বস্তি উচ্ছেদের জন্য কাগজপত্রে পাঁচ দিনের বিল-ভাউচার দেখানো হলেও মূলত দুই দিনেই তা শেষ হয়। স্থানীয় বাসিন্দা ও উচ্ছেদ-সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, উচ্ছেদের আগে বস্তি খালি করে দিতে মাইকিং করার পরই বেশিরভাগ লোকজন নিজেদের আসবাবপত্র নিয়ে সরে যায়। এরপর দুই দিনে কয়েকটি বুলডোজার দিয়ে টিনের বেড়া ও কিছু কিছু দেয়াল গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এরপর তিন-চারটি ট্রাকের মাধ্যমে তা সরিয়ে নেওয়া হয়। এ উচ্ছেদের জন্য নিয়ম অনুযায়ী প্রায় ৩৫ লাখ টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব মাঠ থেকে পাঠানোর পর তা সংস্থাটির শীর্ষ পর্যায়ে এসে বদলে প্রায় কোটি টাকা হয়ে যায়। আর এর হিসাব মিলাতে নানা অসত্য তথ্য যুক্ত করে বাড়তি অংশের অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়।
৬ প্লট বরাদ্দে অনিয়ম : রাজশাহীর তেরখাদিয়া প্রকল্পের প্লট বরাদ্দের লটারিতে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। পূর্ত মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া অভিযোগে বলা হয়, গণপূর্ত অধিদপ্তরের কনফারেন্স রুমে তেরখাদিয়া প্রকল্পের লটারি হয়। সেখানে বিভিন্ন পেশাজীবীদের ৪৪টি প্লট বরাদ্দ হয়। লটারির পুরো সময়ের ভিডিও রেকর্ডিং পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ৪৪টি প্লট বরাদ্দ হলেও পরে মল্লিকা সুলতানা, শ্যামল কুমার রায়, বশির আহমেদ খান, মিলন কুমার রায়, আনিছুর রহমান ও শাকিলা পারভিন নামে ছয়জনকে লটারিবহির্ভূত প্লট দিয়ে তা জাগৃকের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। এর সঙ্গে জাগৃকের তৎকালীন চেয়ারম্যান রাশিদুল ইসলাম, পূর্ত মন্ত্রণালয়ের এক যুগ্ম সচিব, রাজশাহীর অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, জাগৃকের নির্বাহী প্রকৌশলী পরিমল কুমার কুরী ও তৎকালীন উপপরিচালক (বর্তমানে পূর্ত মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব) তাজিমুল ইসলাম জড়িত রয়েছেন।