লক্ষাধিক পোশাককর্মী এখনো চাকরিহারা

নেত্রকোনার সামিনা বেগম (৩৫) দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে থাকেন সাভারের বিশমাইল এলাকায়। প্রতিদিন ভোরে না খেয়ে বের হন চাকরির খোঁজে। সাভারের বিভিন্ন পোশাক কারখানার সামনে চাকরিপ্রত্যাশীর সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকেন লাইনে। দুপুর পর্যন্ত এ-কারখানা ও-কারখানা ঘোরাঘুরি করে হতাশ হয়ে ফেরেন ঘরে। করোনাকালে চাকরিহারা পোশাককর্মী সামিনার এ লড়াই চলছে তিন মাস ধরে। সামিনার মতো লাখো শ্রমিক বেকার হয়ে চাকরির জন্য ঘুরছেন দ্বারে দ্বারে। অন্যদিকে মালিকপক্ষ বলছে, দক্ষ শ্রমিকের অভাবে তারাও পড়েছেন বিপাকে। দীর্ঘদিন ধরে তাদের প্রতিষ্ঠানে খালি রয়েছে অসংখ্য পদ। 

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের (বিলস) সাম্প্রতিক এক হিসাব বলছে, করোনাকালে ১ হাজার ৯১৫টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে চাকরি হারিয়েছেন ৩ লাখ ২৪ হাজারের বেশি শ্রমিক। এছাড়া গত কয়েক মাসে ৮৭টি কারখানায় ২৬ হাজার শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর দেওয়া এক হিসাবে দেখা যায়, সংগঠনটির আওতাভুক্ত ৯৪টি কারখানা করোনাকালে বন্ধ হয়েছে। সব মিলিয়ে বিজিএমইএর অন্তর্ভুক্ত ১০৫টি কারখানায় চাকরি হারানো শ্রমিকের সংখ্যা ৪৮ হাজার ৪৮৯ জন।

তবে তৈরি পোশাক রপ্তানিকারদের সমিতি বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ও ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সহসভাপতি সিদ্দিকুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, গার্মেন্টস খাতে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের যে সংখ্যা বলা হয়, বাস্তবে সে হারে হয়নি। সাময়িক একটা সমস্যা হয়েছিল, কিন্তু বেশিরভাগ চাকরিতে ফিরেছে। অন্যদিকে যারা গ্রামে গিয়ে আর ফিরে আসেনি, তারাও বেকার আছে সেটা বলা যাবে না। কারণ গ্রামেও এখন কর্মসংস্থানের সুযোগ আছে। তবে পরিস্থিতি উন্নতি হলে আবার শ্রমিক নিয়োগ দেবে কারখানা মালিকরা।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) প্রথম সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম দেশ রূপান্তরকে বলেন, দুই কারণে গার্মেন্ট সেক্টরে ছাঁটাই হয়েছিল। প্রথমত অর্ডার বাতিল হয়ে যাওয়ায় মালিকরা বসিয়ে বসিয়ে বেতন দিতে নারাজ । দ্বিতীয়ত অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, ফলে শ্রমিকদের চাকরি হারানোর ঘটনা স্বাভাবিক। কিন্তু অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। নিজের কারখানার অবস্থা তুলে ধরে তিনি বলেন, আমার কারখানায় ১ হাজার ১০০ শ্রমিকের মধ্যে ২৭৫ জনকে খুঁজেই পাওয়া যায়নি। দুই মাসের বেতন তারা নিয়েছে, কিন্তু গ্রাম থেকে আসেনি। এখন আমার কারখানায় শ্রমিক সংকট রয়েছে, ইতিমধ্যে প্রায় ৩০০ শ্রমিক নতুন নিয়োগ দিয়েছি।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শ্রমিকরা বেকার হয়ে দুর্দশায় আছে এটা মোটেও ঠিক নয়। কারণ নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, আশুলিয়ার কারখানাগুলোতে প্রচুর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ঝুলছে। প্রতিদিনই নতুন লোক নিয়োগ হচ্ছে, সামনে আরও হবে। এর মধ্যে কেউ যদি গ্রাম থেকে আর না আসে এর দায় মালিকরা নেবে কেন?

কিন্তু সরেজমিন মালিকপক্ষের এ বক্তব্যের মিল পাওয়া যায়নি। সাম্প্রতিককালে সাভার এলাকায় পোশাক কারখানাগুলোর সামনে কাজপ্রত্যাশীদের দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। সারা দিন দাঁড়িয়ে থেকেও বেশিরভাগকেই ফিরতে হচ্ছে নিরাশ হয়ে। কারণ চাকরিপ্রত্যাশীর সংখ্যা হাজারের ওপর হলেও নেওয়া হয় সর্বোচ্চ দুই-তিনজন। চাকরিপ্রত্যাশীরা জানান, করোনাভাইরাস আসার পর প্রতিটি কারখানায় কমপক্ষে ৩০ থেকে ৫০ ভাগ শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছে। এসব শ্রমিক এখন প্রতিদিন কারখানার সামনে কাজের আশায় লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকছেন। তবে চাকরি পাওয়া তো দূরের কথা, উল্টো এখনো কর্মী ছাঁটাই করছে পোশাক কারখানাগুলো।

শ্রমিকদের অভিযোগ ঘুষ দিয়েও মিলছে না চাকরি। স্বাভাবিক সময়ে পদভেদে ৫-১০ হাজার টাকার বিনিময়ে চাকরি পাওয়া যেত বলে জানিয়েছেন তারা। তবে করোনা সংকটে এটি কঠিন হয়েছে। জয়পুরহাটের রওশন আলী এ রকম একজন ব্যক্তি। তিনি বলেন, ‘একটা চাকরির জন্য কতজনের কাছে গেইছি তার হিসাব নাই। ৬-৭ হাজার ট্যাকা ঘুষ দিবার চাওছি তাও কাম হয় না। বাড়িতে বউ-বাচ্চা পথে চায়া রইছে। এক সপ্তাহ যাবত আসিচ্ছি কাম হওছে না।’

তার মতো খাদ্য সংকট ও পারিবারিক অশান্তি বৃদ্ধি পেয়েছে ঢাকায় পরিবার নিয়ে থাকা শ্রমিকদেরও। বাসাভাড়া পরিশোধ ও ভয়াবহ খাদ্য সংকটে পড়েছেন তারা। সম্প্রতি বিলসও এক প্রতিবেদনে জানায়, করোনার কারণে চাকরি হারিয়ে ২৭ শতাংশ পোশাকশ্রমিক দৈনন্দিন খাবারের চাহিদা কমিয়েছেন।

চাকরি না থাকায় দোকানে বাকিতে কেনাকাটাও বন্ধ হয়ে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পারিবারিক অশান্তি। চাকরি না থাকলে স্ত্রীকে ফেলে অন্য মেয়েকে বিয়ের ঘটনাও বাড়ছে।

গত ১৬ সেপ্টেম্বর সাভারের উলাইল বাজারে কথা হয় সামিনা বেগমের সঙ্গে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘তিনটা মাস ধইর‌্যা যে কষ্ট করতাছি সেটা আল্লাহ জানে আর আমি জানি। বাসাভাড়া বাকি, দোকানে বাকি কইর‌্যা সংসার চালাইতাম, হ্যারা শুনছে চাকরি চইল্যা গেছে আর সওদা দেয় না।’

বগুড়া থেকে আসা আরেক যুবক আবু জাহিদ হাসান কাজ করতেন সাভারের পাকিজা পোশাক কারখানায়। হাতে এসএসসি ও এইচএসসি পাসের সার্টিফিকেট হাতে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনো দাম নেই। এ সার্টিফিকেটে সেলাই অপারেটরের চাকরিও হয় না। গ্রামে আমার মা অসুস্থ, করোনায় চাকরি চইল্যা গেছে। এরপর থেকে কত কারখানার দ্বারে দ্বারে ঘুরছি তার ঠিক নাই। না খাইয়া দিন কাটছে।’

করোনার মধ্যে কারখানায় শ্রমিক ছাঁটাইয়ের বিষয়টি স্বীকার করেছেন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক শিবনাথ রায়। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মানতে গিয়ে প্রথমে অল্প শ্রমিক নেওয়া হয়। এতে অনেক শ্রমিক বাদ পড়ে যান। তারা এখন চাকরির জন্য কারখানার দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন।

ইন্ডাস্ট্রি অল বাংলাদেশ কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক চায়না রহমান বলেন, ‘সত্যি বলতে পোশাকশ্রমিকদের অবস্থা এ মুহূর্তে করুণ। মালিকরা বর্বরোচিত আচরণ করছে। মানবিক বিবেচনা একদম কাজ করছে না।’

এ প্রসঙ্গে এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) সভাপতি ও সংসদ সদস্য আবদুস সালাম মুর্শেদী দেশ রূপান্তরকে বলেন, সবকিছু নির্ভর করে ‘ডিমান্ড অ্যান্ড সাপ্লাইয়ের’ ওপর। এখন ছোট ছোট কারখানাগুলো কাজ করতে পারছে না। অনেকে বন্ধ করে দিয়েছে। এ অবস্থায় বড় বড় কারখানা ছোট অর্ডারগুলো নিলে রপ্তানি আগের অবস্থায় ফিরতে সহজ হবে। নিজের কারখানার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, আমার কারখানায় গত ছয় মাসে একটিও নিয়োগ হয়নি। করোনার সময় কিছু শ্রমিক মাইগ্রেট করেছে, কিছু অসুস্থ হয়ে চাকরি ছেড়েছে। কারখানার উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে লোক নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। না হলে বিভিন্ন কারণে লস হচ্ছে।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর প্রণোদনার কারণে তৈরি পোশাকে চাকা বন্ধ হয়নি। ফলে আস্থা ফিরেছে বহির্বিশে^র বায়ারদের। অর্ডার ফিরে আসছে। এটা একটি ভালো সংবাদ শ্রমিকদের জন্য। কারণ বিভিন্ন কারখানা আবারও তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করেছে, আমরাও নিয়োগ দেব। কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, আগামী শীতে করোনার দ্বিতীয় ওয়েভ না এলে ও পোশাকের ন্যায্য দাম পেলে অবস্থা বদলে যাবে। আমরা ‘সেভিংস ইউর প্রফিট’ থিউরিতে চলে গেছি। ওভারটাইম কমিয়ে অন্যান্য ব্যয়েও কাটছাঁট করতে হচ্ছে। তবে কারখানা চালাতে হলে লোক লাগবেই, খালি পদ পূরণ করতেই হবে।

এদিকে বিলসের প্রতিবেদনের বিষয়ে বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক বলেন, বিলস বেকার শ্রমিকের যে সংখ্যার কথা বলেছে তা ঠিক নয়। আমাদের প্রতিবাদের পরিপ্রেক্ষিতে তারা রিপোর্ট সংশোধনীও দিয়েছে।

তিনি বলেন, সর্বদা দক্ষ কর্মী বাহিনীর চাহিদা রয়েছে। এমন অনেক কারখানা রয়েছে যেগুলো এখনো কর্মী নিয়োগ করছে। দক্ষ শ্রমিকের সংকট রয়েছে এবং এ খাতে যেকোনো দক্ষ শ্রমিক সহজেই কোনো অসুবিধা ছাড়াই কর্মসংস্থান খুঁজে পেতে পারে। নিয়োগ চলমান রয়েছে।