পদ্মা সেতুর ওপর বিদ্যুৎ লাইন হচ্ছে না

পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) যমুনা নদীর ওপর নির্মিত বঙ্গবন্ধু সেতুর মতো পদ্মা সেতুর ওপর দিয়েও বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করার প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু পদ্মা সেতুর অবকাঠামো নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে সেটি না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিকল্প হিসেবে পদ্মা সেতুর দেড় কিলোমিটার দক্ষিণে নদীতে সাতটি আলাদা টাওয়ার নির্মাণ করবে সেতু কর্র্তৃপক্ষ। সেই টাওয়ারের ওপর দিয়ে ৪০০ কেভি বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন বসাবে পিজিসিবি। এ উদ্দেশ্যে ‘আমিনবাজার-মাওয়া-মোংলা ৪০০ কেভি সঞ্চালন লাইন’ শীর্ষক প্রকল্পে আবারও সময়-ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে প্রকল্পের ব্যয় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা ও মেয়াদ বাড়বে আরও ১ বছর। পরিকল্পনা কমিশনে এ সংক্রান্ত পাঠানো সংশোধনী প্রস্তাব থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

এ প্রসঙ্গে পিজিসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম কিবরিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করা হলে লোড (চাপ) বেশি পড়ে যাবে বলে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা অভিমত দিয়েছেন। কারণ পদ্মা সেতুতে গাড়ির সঙ্গে ট্রেনও চলবে। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সেতুটিকে টেকসই করার জন্য এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, সেতু কর্র্তৃপক্ষ পদ্মা সেতুর দেড় কিলোমিটার দক্ষিণে নদীতে সাতটি টাওয়ার নির্মাণ করে দেবে। সেখান দিয়েই পিজিসিবি লাইন বসাবে। এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, টাওয়ার নির্মাণকাজের ওপর নির্ভর করবে প্রকল্পের কাজ যথাসময়ে শেষ হবে কি না।  

তবে পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পে আবারও সময়-ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পটি ২০১৬ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের জুন নাগাদ বাস্তবায়নের লক্ষ্য ছিল। এতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৩৫৬ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। বর্তমানে প্রকল্পটির ১ হাজার ১৪৯ কোটি টাকা ব্যয় বাড়িয়ে আরও ১ বছর সময় চায় পিজিসিবি। এতে প্রথম সংশোধনীর প্রস্তাব অনুমোদন পেলে প্রকল্পটির মোট ব্যয় ২ হাজার ৫০৫ কোটি টাকায় ঠেকবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন যাতে করে পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে টানা না হয় সে জন্য পিজিসিবির সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক হয়েছে। তাতেও সেতু কর্র্তৃপক্ষ রাজি হয়নি। ফলে বাধ্য হয়ে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সেতুর ওপর দিয়ে লাইন নিয়ে যেতে পারলে আলাদা করে টাওয়ার নির্মাণের প্রয়োজন হতো না। সরকারের ব্যয়ও বাড়ত না। তবে সেতু কর্র্তৃপক্ষের দাবি, সেতুর ওপর দিয়ে যদি সঞ্চালন লাইন হয়, তবে ট্রেন ও পরিবহনে নানা ধরনের সমস্যা হতে পারে।

প্রস্তাবনায় প্রকল্প সংশোধনের কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, প্রকল্পের মাধ্যমে আমিনবাজার-মাওয়া-মোংলা পর্যন্ত মোট ১৭৮ দশমিক ৫ কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করা হবে। এর মধ্যে আমিনবাজার-গোপালগঞ্জে ৭৫ কিলোমিটার ৪০০ কেভি ডাবল সার্কিট সঞ্চালন লাইন, গোপালগঞ্জ-মোংলায় ৯৭ কিলোমিটার ডাবল সার্কিট সঞ্চালন লাইন ও আমিনবাজারে উপকেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পে বিভিন্ন অঙ্গের ব্যয় হ্রাস-বৃদ্ধি, কার্যপরিধি ও যানবাহন ক্রয়ের সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। এ কারণে প্রকল্পটি আবারও সংশোধন করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে মোংলা ও পায়রা বন্দরে কয়লাভিত্তিক পাওয়ার প্ল্যান্টসহ দক্ষিণাঞ্চলে অনেকগুলো পাওয়ার প্ল্যান্ট নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলে পায়রা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ ঢাকাসহ আশপাশে সরবরাহের জন্য নতুন সঞ্চালন লাইনটি নির্মাণ করা হবে।

এ বিষয়ে পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) শফিকুল ইসলামকে ফোন দেওয়া হলে তিনি এসএমএস করে কথা বলতে পারবেন না বলে জানান। সেতু কর্র্তৃপক্ষের একাধিক কর্তকর্তা এ প্রসঙ্গে বলেন, পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে কয়লাভিত্তিক সঞ্চালন লাইন নির্মাণ হচ্ছে না। তবে সেতু থেকে দেড় কিলোমিটার দক্ষিণে আমাদের নিজেদের খরচে অতিরিক্ত সাতটি টাওয়ারের ফাউন্ডেশন নির্মাণ করব। যাতে করে সেতুর ওপর দিয়ে কোনো বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন নির্মাণ না করা হয়। আর সেভাবেই আমরা টেন্ডার করেছি। আমরা নকশা অনুযায়ীই এ কাজ করতে যাচ্ছি।

জানা গেছে, মোংলায় ১২৩০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুৎ ইভাকুয়েট করা হবে। ভবিষ্যতে মাওয়ায় স্থাপিতব্য বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুৎও ইভাকুয়েট করার ব্যবস্থা করা হবে। এরপর ঢাকা ও মোংলার মধ্যে ৪০০ কেভি বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনকাঠামো নির্মাণ করা হবে। মোংলায় উৎপাদিত কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ আমিনবাজার হয়ে নগরীতে প্রবেশ করবে। সে লক্ষ্যে মোংলা থেকে আমিনবাজার পর্যন্ত প্রায় ১৬৪ দশমিক ৬ কিলোমিটার ৪০০ কেভি সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করা হবে। অপরদিকে সেতুর পাশেই ৯ দশমিক ৪ কিলোমিটার রিভার ক্রসিং লাইন নির্মাণ করা হবে।

আমিনবাজারে ৪০০ কেভি উপকেন্দ্র নির্মাণ প্রসঙ্গে পিজিসিবির এক কর্মকর্তা বলেন, প্রকল্পের ডিপিপিতে ৩১ কোটি ১৯ লাখ টাকা আন্তর্জাতিক পরামর্শকের বেতন বাবদ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অপরদিকে নগরীর আমিনবাজার এলাকায় ডিপিপিতে ২০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হবে। এতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। প্রকল্পের আওতায় প্রয়োজনীয় গাড়ি ও মোটরবাইক কেনা হবে। ঢাকা শহরের বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যে মোংলা থেকে পদ্মা সেতুর পাশ দিয়ে সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ আনা হবে।