বাংলাদেশে নানা ক্ষেত্রে অগ্রগতি ঘটছে। তথ্য-উপাত্ত ছাড়াও যাপিত জীবনে আমরা অভিজ্ঞতা দিয়েই তা বুঝতে পারছি। এই অগ্রগতি অবধারিত ছিল। সভ্যতার আবর্তনরীতি অনুযায়ী এই উন্নয়নধারা অনুভব আর ফলভোগ করার কথা ছিল আরও অনেক আগেই। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক দর্শনের দুর্বলতা, স্বার্থপরতা এবং দুর্নীতিগ্রস্ত শাসনব্যবস্থা ও পরিবেশ আমাদের অগ্রগতি শ্লথ করে দিয়েছিল। বর্তমান সরকার এই ঘেরাটোপ থেকে বেরুনোর কিছুটা চেষ্টা করেছে বলে মনে হয়। দুর্নীতি মুক্তির তেমন পদক্ষেপ না নিলেও অর্থনৈতিক উন্নয়নের কিছু সাহসী পদক্ষেপ নেওয়ায় একটি পরিবর্তনের ছোঁয়া আমরা অনুভব করছি। আমরা অনেক সময় অনেক কেতাবি কথা বলি। কিন্তু এর প্রায়োগিক দিকটির প্রতি তেমন লক্ষ রাখি না। আর রাজনীতিকরা তো মঞ্চে বলার জন্য কিছু কথা রেখে দেন। মঞ্চের বাইরে বা ক্যামেরার পরে ওসবের বাস্তবায়ন নিয়ে তেমন ভাবনা থাকে না। আমাদের দেশের বাস্তবতায় গণমানুষের চোখে অঞ্জলি পরানোর দক্ষতা তো এ অঞ্চলের মানুষদের থাকেই। অথচ শুদ্ধ রাজনীতি প্রত্যাশিত। রাজনীতির রথে চড়েই তো রাষ্ট্রকে এগিয়ে যেতে হয়।
এই যে শুনি সরকার শিক্ষা বিস্তারে নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে, প্রাথমিক শিক্ষার কাঠামো-অবকাঠামো ছড়িয়ে দিচ্ছে দেশজুড়ে, বিনামূল্যে কোটি কোটি বই বিতরণ করছে, জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় গড়তে চাইছে। এগুলো কি মেধাবী পরিকল্পনা থেকে হচ্ছে না রাজনৈতিক সুবিধা লাভের জন্য ছক কাটার মতো হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। প্রকৃত শিক্ষার উন্নয়নে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে সেটিই হচ্ছে বড় কথা।
৫ম শতকের মাঝপর্বে মধ্যযুগের সভ্যতার যাত্রা শুরু হয়েছিল ইউরোপে। গ্রামকেন্দ্রিক একটি সামন্ত সভ্যতা। এ সময়ের ইউরোপে প্রাথমিক শিক্ষার ধারাও তৈরি হয়নি। ৯ম শতকে তৎকালীন গল আধুনিক ফ্রান্সের রাজা শার্লামেন ভাবতে পারলেন শিক্ষার আলো থাকা চাই। চারদিকে খ্রিস্টধর্মের বিস্তার ঘটছে। গির্জা তৈরি হচ্ছে। রাজা শার্লামেন কোনো রাজনৈতিক কুশলী বুদ্ধিতে নয় নিজ বিবেচনা ও দায় বোধ থেকেই অনুভব করলেন অন্তত বাইবেল পড়ার জন্য হলেও গির্জার পাদ্রি ও সাধারণ খ্রিস্টানের প্রাথমিক শিক্ষার জ্ঞান থাকা চাই। এই বাস্তব প্রয়োজনে তিনি প্রথম গির্জাকেন্দ্রিক প্রাথমিক শিক্ষার যাত্রা শুরু করেছিলেন।
আমরা কেন যে বর্তমান সময়ের চাহিদা অনুযায়ী প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নের কথা না ভেবে শিক্ষার বিস্তার নিয়ে কথা বলছি তা বোধগম্য নয়। পশ্চিম ইউরোপের এবং যুক্তরাজ্যের নানা দেশে কাছে থেকে দেখেছি শিক্ষার সব স্তরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় প্রাথমিক শিক্ষাকে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো হয় সুদৃঢ় ও দৃষ্টিনন্দন অবকাঠামোর ওপর। প্রয়োজনীয় শিক্ষা সরঞ্জামে সুসজ্জিত থাকে। শিশু-মনস্তত্ত্ব জানা সুশিক্ষিত মেধাবীরা শিক্ষক হন। শিক্ষার্থী স্কুলকে আনন্দময় স্থান মনে করে। শিক্ষক সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানে থাকেন। শিশুর সৃজনশীল মেধা বিকাশের জন্য আমাদের মতো অদ্ভুত সৃজনশীল প্রশ্নে আটকে রাখেন না। শিক্ষক সপ্তাহ অন্তর শিক্ষার্থীদের নিয়ে যান কাছের জাদুঘর বা কোনো দর্শনীয় জায়গায়। ফিরে এসে এর ওপর গল্প হয়। সুশিক্ষিত মেধাবীরা প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকতায় আসেন। তাদের প্রণোদনাও আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের সমান বেতন পান তারা। বছরজুড়ে নানা নামের পরীক্ষায় বন্দি করা হয় না শিক্ষার্থীদের।
আমরা পরিবর্তন আনব কেমন করে? আমাদের শিক্ষা পরিকল্পনায় কখনো ভাবা হলো না প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর ভিত্তি শক্ত না হলে নড়বড়ে হয়ে যায় পরবর্তী শিক্ষাক্রমগুলো। আমার সঙ্গে বেলফাস্টের কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের এক আমেরিকান প্রফেসর মিস ক্যারোলাইনের কথা হয়েছিল। তিনি প্রাইমারি স্কুলের কারিকুলামের ওপর অনেক বই লিখে যথেষ্ট খ্যাতিমান। অনেক অ্যাওয়ার্ডও পেয়েছেন। আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক স্কুল পর্যায়ের বই লিখলে অনেক সহকর্মীও নাক সিটকান। আর উন্নত দেশে প্রজ্ঞাবান অধ্যাপকরা স্কুলের বই লিখেন। এজন্য তাদের সম্মানিত করা হয়। কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশের এক মেধাবী মেয়ে স্কুলশিক্ষা ও কারিকুলাম নিয়ে গবেষণা করছিলেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রী ছিলেন। জানালেন বাংলাদেশের কতগুলো অদ্ভুত নীতি সেখানে সমালোচিত হয়। শিক্ষা কারিকুলাম নিয়ে নানা প্রজেক্টে ট্রেনিং প্রোগ্রামে মাঝে মাঝে বাংলাদেশ থেকে যারা আসেন তাদের মধ্যে সরাসরি পাঠদানে জড়িত এমন কাউকে সাধারণত দেখা যায় না। অথবা শিক্ষা কারিকুলাম নিয়ে যারা কাজ করেন বা গ্রন্থ প্রণয়ন করেন তাদের ট্রেনিংয়ে আসারও যৌক্তিকতা থাকে। কিন্তু প্রধানত যারা আসেন তাদের বেশিরভাগ সরকারি আমলা, শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা। শর্ত অনুয়ায়ী স্কুল কারিকুলামের ওপর তাদের গ্রন্থ প্রণয়ন করতে হয়। ইউরোপ ও বাংলাদেশের কারিকুলাম অভিন্ন নয়। দেশে শিক্ষকতায় যুক্ত না থাকায় এবং বাংলাদেশের শিক্ষার চলমান ধারার সঙ্গে যুক্ত না করে ইউরোপীয় মানের প্রভাবিত রূপ এসব গ্রন্থে থাকায় শেষ পর্যন্ত এসব গ্রন্থের ব্যবহার আর হয় না। অর্থাৎ ট্রেনিং প্রোগ্রামে বড় রকমের অর্থরই অপচয় হয়ে থাকে। প্রসঙ্গক্রমে আরেকটি অভিজ্ঞতার কথা বলতে হয়। ইংল্যান্ডের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক দুঃখ করছিলেন। তিনি এক সময় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সহকর্মী ছিলেন। বললেন, এমনিতে এখন যুক্তরাজ্যে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার ব্যয় বেড়ে গেছে। স্কলারশিপের সুবিধা প্রায় নেই বললেই চলে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন মেধাবী শিক্ষকের যুক্তরাজ্যে পড়তে বা গবেষণার জন্য আসাটা কঠিন হয়ে পড়েছে। এই বাস্তবতায় মাঝে মাঝে দেখা যায় সরকারি আমলারা আসছেন এমফিল বা পিএইডি করার জন্য। ‘বঙ্গবন্ধু বৃত্তি’ নামে একটি বৃত্তি নাকি আছে দেশে। ২৭ লাখ টাকা পর্যন্ত দেওয়া হয়। কিন্তু এই বৃত্তি প্রায়শ শিক্ষকদের কপালে জোটে না যাদের জন্য গবেষণাটা জরুরি। অন্যদিকে শিক্ষার সঙ্গে অনেকদিন যুক্ত না থাকায় এমন বৃত্তিভোগকারী আমলাদের অনেকে সাফল্যও দেখাতে পারেন না। বিষয়টি নিয়ে ওখানকার শিক্ষকরা মাঝে মাঝেই তাদের কাছে এসব প্রশ্ন তোলেন।
এসব উদাহরণ থেকে আমাদের মনে হয় শিক্ষার কোনো ক্ষেত্রেই আমাদের রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা নেই। এখন শুনছি জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে। ভুরি ভুরি শিক্ষিত বেকার বানানোর পরিকল্পনা কেন বুঝতে পারি না! এখন বহির্বিশ্বে এবং দেশের কারিগরি বিদ্যায় শিক্ষিতদের প্রয়োজন। জেলায় জেলায় প্রতিষ্ঠা করতে হলে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই জরুরি ছিল। এ নিয়ে আমাদের নীতিনির্ধারকরা ভাবছেন কিনা আমার জানা নেই।
প্রাথমিক শিক্ষা প্রসঙ্গেই ফিরে আসি। উপআনুষ্ঠানিক শিক্ষার কথা বলা হয়। বছরখানেক আগে কাগজে পড়েছিলাম চট্টগ্রাম কক্সবাজারের অধিকাংশ জেলেদের গ্রামে এ ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। এ সংখ্যা হয়তো আরও আছে। আর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা মান্ধাতার আমলের ধারাতেই রয়ে গেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষিত মেধাবীদের প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক হিসেবে আসার সুযোগ নেই। স্বল্প বেতনে সবল শিক্ষককে আকৃষ্ট করার সুযোগ থাকে না। বর্তমানে প্রাইমারি স্কুলের কারিকুলামে এবং পঠন পদ্ধতিতে অনেক পরিবর্তন আনা হয়েছে। কিন্তু তা প্রকৃত অর্থে কার্যকর করার মতো দক্ষ শিক্ষকের অভাব রয়েছে। এই সত্যটি নীতিনির্ধারকদের কাছে গুরুত্ব পাচ্ছে বলে মনে হয় না। অতিসম্প্রতি পত্রিকায় খবর দেখলাম, প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকদের বেতন পুনর্মূল্যায়নের চিন্তা করা হচ্ছে। এটি সুসংবাদ। আমার তো আশা প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকরা যাতে অষ্টম বা নবম গ্রেডের স্কেলের বেতন পান। তবেই মেধাবী গ্রাজুয়েটরা সানন্দে প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক হওয়ার জন্য এগিয়ে আসবে। এই রূপান্তর না হলে প্রাইমারি শিক্ষার যথার্থ উন্নয়ন সম্ভব নয়।
প্রাইমারি শিক্ষার মানোন্নয়নে সবচেয়ে বড় বিষফোঁড়া অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষার কঠিন চাপ। যেখানে পশ্চিমা বিশ্বে শিশুশিক্ষার আদর্শে পরীক্ষা কমিয়ে শূন্যের কোঠায় আনার চেষ্টা সেখানে আমরা পিইসি, জেএসসি নানা নামের পরীক্ষার অক্টোপাশে আরও বেশি করে বেঁধে ফেলতে চাইছি আমাদের শিশুদের। এতে যে শিক্ষার্থীদের স্কুলে যাওয়া প্রীতিকর না হয়ে ভীতিকর হয়ে উঠছে সেদিকে আমরা খেয়াল করছি না। আমরা কোন পরিকল্পনায় শিশুদের শিক্ষার্থী না বানিয়ে পরীক্ষার্থী বানিয়ে ফেলছি তা বুঝে উঠতে পারছি না। ক্লাস ফাইভের ছেলে-মেয়েকে আজ বাল্যের উচ্ছ্বাস ভুলে কোচিং করতে হচ্ছে। পিইসি পরীক্ষার ‘সাফল্যের’ জন্য বাজারে পাওয়া যাচ্ছে গাইড বই। শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়ে গলদঘর্ম হচ্ছে ‘সৃজনশীল’ মেধা বিকাশে। দীর্ঘদিন শিশু শিক্ষার ওপর কাজ করা মিস ক্যারোলাইনকে বোঝানো কষ্ট হয়েছিল আমাদের শিশুদের এতসব পরীক্ষা দিতে হয় সেই সত্যটি মানাতে।
আমি বুঝতে পারি না প্রাইমারি শিক্ষায় এত গোলমেলে অবস্থা কেন আমাদের দেশে। তাহলে কি যথাযোগ্য মানুষরা নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারেন না? দেশে তো অর্থনৈতিক অগ্রগতি হচ্ছে। শিক্ষার প্রথম ধাপটিকে অর্থাৎ ভিত্তিটিকে সুদৃঢ় করার বিবেচনা কেন করতে পারছি না। কেন আকর্ষণীয় বেতন কাঠামোর ভেতর রেখে মেধাবী স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীদের আকৃষ্ট করতে পারছি না প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক হতে। প্রতিবেশী ভারত যা করতে পেরেছে অনেক আগেই।
আমাদের সরকারের তো টাকার সংকট নেই। শিক্ষা উন্নয়নে বিদেশ থেকে তহবিলও পাওয়া যাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের জন্য মিড-ডে মিলের মতো লাগসই পরিকল্পনাও করছে। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে আমাদের দেশে খাজনার চেয়ে বাজনাই বাজে বেশি। এদেশের রাজনৈতিক সরকারগুলো আমলাতন্ত্রের ওপর আস্থাশীল নানা কারণে! তাই যে কোনো বড় প্রকল্প চূড়ান্ত করার আগে কিছু টাকা ধরে রাখা হয় বিদেশ ভ্রমণের জন্য। প্রকল্প বাস্তবায়নে এর প্রয়োজন থাক বা না থাক। প্রস্তুতি নিতে নিতেই বরাদ্দের অপব্যয় এতটা হয় যে মূল লক্ষ্যে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। সরকার অগ্রগতির সোনালি রথে দেশকে যেমন এগিয়ে নিচ্ছে তেমনি আমরা আশা করব প্রাথমিক শিক্ষাঙ্গনে কাক্সিক্ষত উন্নয়ন সাধিত হোক। গৎবাঁধা চিন্তার অবসান ঘটুক এবং প্রকৃত শিক্ষা উন্নয়নে লক্ষ্য অর্জিত হোক।
লেখক অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
shahnawaz7b@gmail.com