ফেনীর জুলহাস আলম। গত ১২ বছর ধরে সৌদি আরবের মক্কায় একটি হোটেলে কাজ করেন। কোম্পানির কাছ থেকে ছুটি নিয়ে ৩ মার্চ তিনি দেশে আসেন। মে মাসে তার ফিরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু করোনার কারণে তিনি আর যেতে পারেননি। আগামীকাল (৩০ সেপ্টেম্বর) তার আকামার মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে। গত রবিবার আকামার মেয়াদ নবায়নে রাজধানীর গুলশানে সৌদি দূতাবাসে যান তিনি। কিন্তু শর্তের বেড়াজালে পড়ে তা করতে পারেননি জুলহাস। তিনি গতকাল সোমবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এজন্য কোম্পানির নিয়োগপত্র (কফিল), আকামার মেয়াদ বৃদ্ধির সৌদি পাসপোর্ট অফিসের ফটোকপি, পাসপোর্ট ও রি-অ্যান্টি ভিসার মূল কপি, সৌদি আরব থেকে বের হওয়ার মূল কপিসহ নানা শর্ত দেওয়া হয়েছে। আজও (গতকাল) গিয়েছিলাম দূতাবাসে। কিন্তু কোনো কিছুই করতে পারছি না। কোম্পানির কফিল সৌদি আরব ছাড়া আনা সম্ভব হবে না। এখন কী করব বুঝতে পারছি না?’
একই কথা বলেছেন বরিশালের আবদুর রহিম। তিনি বলেন, ‘আজ (গতকাল) সকাল থেকেই সৌদি দূতাবাসের ভিসা সেন্টারে বসে আছি। কিন্তু আকামার মেয়াদ এখনো বাড়াতে পারছি না। আমার আকামার মেয়াদ শেষ হবে ২ অক্টোবর। সরকার যেভাবে আকামার মেয়াদ ও ফ্লাইট বাড়ানোর পেছনে কাজ করে সফল হয়েছে আমরা আশা করব একইভাবে আকামার মেয়াদ বাড়ানোর জন্য দেওয়া শর্তগুলো প্রত্যাহার করার উদ্যোগ নিয়ে দ্রুত সমাধান করবে।’ এই দুজনের মতো কয়েকশ সৌদি প্রবাসী আকামার মেয়াদ বাড়াতে দেওয়া শর্তগুলো পূরণ করতে পারছেন না বলে জানা গেছে।
গতকাল দুপুরে গুলশানে সৌদি দূতাবাসের সামনে গিয়ে দেখা যায়, অনেকেই সেখানে ভিড় জমানোর চেষ্টা করছেন। সেখানে কর্তব্যরত পুলিশের সদস্যদের পক্ষ থেকে তাদের বলা হয়, সৌদির অনুমোদিত ৩১টি প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় তারা আকামা নবায়ন করতে পারবেন। এজন্য দূতাবাসে যেতে হবে না। দূতাবাসকে কোনো অর্থ দিতে হবে না। শুধু প্রসেসিং ফি লাগবে। তবে বেশ কজন প্রবাসী অভিযোগ করেন, ভিসা নবায়নের জন্য সৌদিতে কফিলের চিঠির জন্য ফোন করলে তাদের কাছে অতিরিক্ত ২ হাজার রিয়াল দাবি করা হচ্ছে।
এদিকে ফিরতি টিকিটের জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা সৌদি প্রবাসীরা গতকালও বিমানের মতিঝিল ও কারওয়ান বাজারে সৌদি এয়ারলাইনসের সোনারগাঁও অফিসে ভিড় করেন। কর্মব্যস্ত দিনের সকালে অনেকেই রাজপথে অবস্থান নেওয়ায় দেখা দেয় যানজট। টিকিটের নিশ্চয়তা না পেলেও বৃষ্টিতে ভিজে টোকেনের আশায় বসে কিংবা গেটের সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেন অনেকেই। দিনের পর দিন অপেক্ষা করেও অনেকেই টিকিট না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। গত এক সপ্তাহ ধরেই তারা টিকিট নিয়ে সাউদিয়া এয়ারের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও হয়রানির অভিযোগ করে আসছেন। তাদের ভাষ্য, হাতে টোকেন নিয়েও অনেকেই টিকিট পাননি। আবার অতিরিক্ত টাকা দিয়ে কজন সিরিয়াল ভেঙে টিকিট নিয়ে গেছেন। আবার ট্রানজিট হয়ে এয়ার অ্যারাবিয়াসহ বিভিন্ন ফ্লাইটে দেশে ফেরা প্রবাসীদের কোনোভাবেই টিকিটের টোকেন দিচ্ছে না সৌদি এয়ারলাইনস বা বিমান। তাই টিকিটের নিশ্চয়তা চান তারা।
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, সরকারপক্ষ থেকে নানা পদক্ষেপ নেওয়ার পরও দুর্ভোগ কাটছে না আটকেপড়া সৌদি প্রবাসীদের। উপরন্তু আকামা নবায়নে সৌদির দেওয়া শর্তের কারণে বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন অনেকেই। সৌদি সরকার ২৪ দিন আকামার মেয়াদ বাড়ানোর ঘোষণা দিলেও অনলাইনে চেক করে মেয়াদ বাড়ানোর কোনো তথ্য মিলছে না। গত ফেব্রুয়ারি ও মার্চে ফেরার পর করোনার কারণে আটকেপড়ারাই আকামা নবায়ন ও টিকিট নিয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন। বিশেষ করে যাদের আকামার মেয়াদ ৩০ সেপ্টেম্বরে শেষ হবে তাদের ভিসা নবায়নের সুযোগ দিলেও বেশ কিছু কঠিন শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
আকামার মেয়াদ নবায়নে দেওয়া শর্ত পূরণ করা খুবই কঠিন বলে উল্লেখ করেন ঢাকার তরুণ হাসান আলম। তিনি বলেন, ‘আগে ছিল শুধু টিকিটে সমস্যা। এখন যোগ হয়েছে আকামা নবায়নের সমস্যা। ঢাকার রাজকীয় সৌদি আরব দূতাবাস থেকে ভিসা নবায়নে যেসব শর্ত পূরণের কথা বলা হয়েছে, তার মধ্যে নিয়োগকর্তা বা কফিলের আবেদন সংবলিত চিঠির কথা বলা হয়েছে। সেটা আবার সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্র্তৃক সত্যায়িত হতে হবে। আকামার মেয়াদ লেখা থাকতে হবে সৌদি পাসপোর্ট অধিদপ্তরের আবেদনের প্রিন্ট কপিতে। সঙ্গে রাখতে হবে পাসপোর্ট ও রি-অ্যান্ট্রি আকামার মূল কপি। তা ছাড়া থাকতে হবে মেয়াদসহ আকামার মূল কপি। আরও রয়েছে সৌদি থেকে বের হওয়ার মূল কপি থাকার বাধ্যবাধকতা।’
দুপুর ১টার পর সৌদি এয়ারের অফিসের সামনের রাস্তা অবরোধ করেন কয়েকশ প্রবাসী। তারা সমস্বরে সেøাগান দেন, ‘বাঁচলে সবাই বাঁচব, মরলে সবাই মরব। তিন মাস আকামার মেয়াদ অটো বাড়ানো হোক।’ রাস্তা অবরোধের ফলে ব্যস্ততম এ সড়কে যানজট সৃষ্টি হয়। তবে অবরোধ তুলে নিতে সেখানে থাকা পুলিশ সদস্যদের কোনো অ্যাকশনে যেতে দেখা যায়নি।
কারওয়ান বাজারের মোড়ে দাঁড়িয়ে চা খেতে খেতে এক তরুণ বলেন, ‘বাঁচলে সবাই একসঙ্গে বাঁচব, মরলেও একসঙ্গে। ৩০ সেপ্টেম্বর আকামার মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে। প্রতিদিন ধরনা দিয়েও বিমানের টিকিট পাচ্ছি না। সৌদি দূতাবাসের নির্ধারিত এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা সৌদি কফিলের (মালিক) কাছ থেকে ছুটি ও আকামা বাড়ানোর অনুমতিসহ নানা ডকুমেন্ট নিয়ে আসার কথা বলে। আমরা শ্রমিক, ওই দেশ থেকে কোম্পানির মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করে কাগজপত্র আনা আমাদের পক্ষে কি সম্ভব? আমাদের দাবি একটাই, আগের মতো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সবার আকামার মেয়াদ তিন মাস বাড়ানো হোক। সরকারের কাছে বার্তা পৌঁছানোর জন্যই নিরুপায় হয়ে রাস্তা অবরোধ করতে বাধ্য হয়েছি আমরা। যতদিন সমস্যার সমাধান না হবে ততদিনই এভাবে প্রতিবাদ করা হবে।’
লক্ষ্মীপুর সদরের বাসিন্দা প্রবাসী শাহজাহান মিয়া বলেন, ‘১১ মাস বেকার বসে আছি। কয়েক দিন ধরে সৌদি এয়ারলাইনসের টিকিট কনফার্ম করার জন্য ছুটে আসছি। কিন্তু টিকিট পাচ্ছি না। ৩০ সেপ্টেম্বর আমার আকামার মেয়াদ শেষ হচ্ছে। সরকার ২৪ দিন ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর ঘোষণা দিলেও অনলাইনে গিয়ে চেক করে ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর কোনো আলামত পাইনি।’
নাজির মামুদ জানান, আগে যাদেরকে টোকেন দেওয়া হয়েছিল তাদের ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে এবং টিকিট ইস্যু করা হচ্ছে। কিন্তু যাদের আকামার মেয়াদ দুদিন পর শেষ হচ্ছে তাদের ব্যাপারে কোনো তথ্যই দিচ্ছে না। এখানে উচিত ছিল আকামা-সংক্রান্ত মেয়াদভিত্তিক অগ্রাধিকার প্রদান।
কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট এলাকার বাসিন্দা মোশাররফ হোসেন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘দেশে ফিরে গত ৯ মাস বেকার বসে বসে খাচ্ছি। আয়-রোজগার নেই। ৩০ সেপ্টেম্বর আকামার মেয়াদও শেষ। মেয়াদ বৃদ্ধি ও টিকিটের ব্যবস্থা করতে এক সপ্তাহ ধরে এয়ারলাইনস কার্যালয়ে ধরনা দিচ্ছি। কিন্তু কোনো ব্যবস্থাই করতে পারছি না। এখন আমার কী হবে?’
করোনায় বড় প্রভাব বৈদেশিক কর্মসংস্থানে : করোনাভাইরাসের কারণে চলতি বছর বৈদেশিক কর্মসংস্থানে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। চলতি বছরের আগস্ট মাস পর্যন্ত ১ লাখ ৮১ হাজার ২৭৩ জনের বিদেশে কর্মসংস্থান হয়েছে। অথচ গত বছর একই সময়ে বৈদেশিক কর্মসংস্থান হয়েছিল ৪ লাখ ৬ হাজার ৯৬২ জনের। আর এ বছর লক্ষ্যমাত্রা ছিল সাড়ে ৭ লাখ মানুষের বৈদেশিক কর্মসংস্থান। কিন্তু সেই লক্ষ্যমাত্রা এখনো অনেক দূরে। গতকাল মন্ত্রিসভার বৈঠকে কভিড-১৯ মহামারীকালে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের গৃহীত পদক্ষেপ ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে মন্ত্রিসভাকে জানানো হয়। সেখানেই বৈদেশিক কর্মসংস্থানের এ চিত্র তুলে ধরা হয়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে এ বৈঠক হয়। প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এ বৈঠকে যোগ দেন। বৈঠক শেষে সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বৈঠকের সিদ্ধান্ত জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘গত ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ লাখ ৪১ হাজার ৩৬ জন মানুষ দেশে ফিরেছেন। তার মধ্যে ২৮ হাজার ৫৮৬ জন ট্রাভেল পাস নিয়ে এসেছেন। তাদের পুনরায় বিদেশে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। করোনার এই সংকটের মধ্যেও ২০১৯-২০ অর্থবছরে রেকর্ড ১৮ দশমিক ২১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রবাসী আয় এসেছে, যা আগের বছরের চেয়ে ৯ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি।’
মন্ত্রিসভার বৈঠকে সৌদি প্রবাসীদের যাওয়া নিয়ে সৃষ্ট সমস্যার বিষয়ে ব্যাখ্যা দেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানিয়েছেন, সৌদি আরবের সঙ্গে আলোচনা করে সময় বাড়ানোর চেষ্টা করছেন তিনি। অনির্ধারিত আলোচনায় বৈদেশিক কর্মসংস্থানে নতুন জায়গা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এ বিষয়ে আগামী বৈঠকে বিস্তারিত প্রতিবেদন দিতে সংশ্লিষ্টদের বলা হয়েছে।