এমসি কলেজে ধর্ষণ

৩ ‘ছাত্রলীগকর্মী’ ৫ দিনের রিমান্ডে গ্রেপ্তার আরও ৩

সিলেট এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে স্বামীকে আটকে রেখে স্ত্রীকে দলবেঁধে ধর্ষণের মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন ‘ছাত্রলীগকর্মীর’ পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। তারা হলো প্রধান আসামি সাইফুর রহমান, ৪ নম্বর আসামি অর্জুন লস্কর ও ৫ নম্বর আসামি রবিউল ইসলাম। গতকাল সোমবার সিলেট মহানগর হাকিম দ্বিতীয় আদালতে আসামিদের হাজির করে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জিজ্ঞাসাবাদের জন্য প্রত্যেকের ৭ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন। শুনানি শেষে বিচারক সাইফুর রহমানসহ প্রত্যেকের ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা শাহপরান থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্য্য দেশ রূপান্তরকে এসব তথ্য জানিয়েছেন।

এদিকে এ মামলার আরেক আসামি মাহফুজুর রহমান মাসুমসহ আলোচিত এ ধর্ষণকা-ে জড়িত অভিযোগে আরও দুজন গ্রেপ্তার হয়েছে। এ নিয়ে এ ঘটনায় প্রধান আসামিসহ সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হলো।

নতুন গ্রেপ্তার হওয়া তিনজনের মধ্যে মাসুমকে গতকাল রাত সাড়ে ১১টার দিকে জৈন্তাপুরের হরিপুর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানিয়েছেন কানাইঘাট থানার এসআই স্বপন চন্দ্র সরকার। মাসুম কানাইঘাটের দক্ষিণ বাণীগ্রাম ইউপির লামা দলইকান্দি গ্রামের বাসিন্দা সালিক আহমদ ছেলে। অন্যদিকে মামলার ৩ নম্বর আসামি শাহ মাহবুবুর রহমান রনির দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ধর্ষণের ঘটনায় জড়িত অভিযোগে দুজনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব।

র‌্যাব-৯-এর অধিনায়ক আবু মুসা মো. শরীফুল ইসলাম জানান, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে গত রবিবার রাত ১০টার দিকে র‌্যাব-৯-এর শ্রীমঙ্গল ক্যাম্পের একটি দল হবিগঞ্জ সদর থেকে রনিকে গ্রেপ্তার করে। পরে রনির দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ থেকে রাত সাড়ে ১২টার দিকে গ্রেপ্তার করা হয় রাজন মিয়া ও আইনুদ্দিনকে। র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে রাজন ও আইনুদ্দিন ঘটনার ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে।

র‌্যাব-৯-এর মিডিয়া কর্মকর্তা এএসপি ওবাইন গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রনি ও তার তথ্যের ভিত্তিতে আটক রাজন ও আইনুদ্দিনকে শাহপরান থানায় হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে।’

৩ ‘ছাত্রলীগকর্মী’ ৫ দিনের রিমান্ডে : চাঞ্চল্যকর এই মামলার প্রধান আসামি সাইফুর ও অর্জুন লস্করকে গতকাল দুপুরে পুলিশি পাহারায় আদালতে হাজির করা হয়। এ সময় সেখানে শত শত উৎসুক মানুষ ভিড় করে। সাইফুর ও অর্জুনকে আদালতে হাজির করার পর পুলিশি নিরাপত্তার মধ্যেই বিক্ষোভ করেন উপস্থিত লোকজন। এ সময় আসামিদের উদ্দেশ্য করে ‘জানোয়ার, জানোয়ার’, ‘মেরে ফেল, মেরে ফেল’, ‘ফাঁসি চাই, ফাঁসি চাই’ ইত্যাদি স্লোগান দেয় লোকজন।

মহানগর হাকিম আদালতের এপিপি খোকন কুমার দত্ত জানান, সাইফুর ও অর্জুনকে আদালতে হাজির করে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রত্যেকের ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন জানান। আদালত ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে।

তিনি আরও জানান, মামলায় আসামিপক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন না। আদালত তখন আসামিদের কোনো বক্তব্য থাকলে শুনতে চান। তখন সাইফুর ও অর্জুন দুজনই আদালতে নিজেদের নির্দোষ দাবি করে ধর্ষণে অন্য তিনজন জড়িত বলে জানায়। তারা আদালতকে বলে, তারেক, রাজন ও আইনুদ্দিন ধর্ষণের ঘটনায় জড়িত।

গতকাল বিকেলে মামলার ৫ নম্বর আসামি রবিউলকে একই আদালতে হাজির করা হয়। ৭ দিনের রিমান্ডের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত রবিউলেরও ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে।

গতকাল এই তিন আসামিকে আদালতে হাজির করা হলেও কারও পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন না। জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ টি এম ফয়েজ বলেন, ‘আইনজীবীদের এটি ব্যক্তিগত ও নীতিগত সিদ্ধান্ত। নৈতিক অবস্থান থেকেই কোনো আইনজীবী এই জঘন্য ধর্ষণকাণ্ডে জড়িত আসামিদের পক্ষে দাঁড়াননি।’

এর আগে গত রবিবার ভোরে সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার সুরমা নদীর খেয়াঘাট এলাকা থেকে আসামি সাইফুর রহমান, হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার মনতলা গ্রাম থেকে অর্জুন লস্কর, হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ থেকে রবিউলকে গ্রেপ্তার করা হয়।

১২৮ বছর আগে স্থাপিত সিলেটের ঐতিহ্যবাহী এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে গত শুক্রবার রাতে দল বেঁধে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। দক্ষিণ সুরমা এলাকার এক নবদম্পতিকে এমসি কলেজের প্রধান ফটকের সামনে থেকে জোরপূর্বক ধরে নিয়ে যায় ‘ছাত্রলীগের’ কয়েকজন কর্মী। তাদের ধরে ছাত্রাবাসের একেবারে শেষ প্রান্তে ৭ নম্বর ব্লকে নিয়ে যায়। সেখানে স্বামীকে আটকে রেখে স্ত্রীকে ধর্ষণ করা হয়। মধ্যরাতে পুলিশ স্বামী-স্ত্রীকে উদ্ধার করে। পরে ধর্ষিতাকে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে ভর্তি করা হয়। এ ঘটনায় গত শনিবার ধর্ষিতার স্বামী বাদী হয়ে শাহপরান থানায় ছয়জন আসামির নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত আরও দুই-তিনজনকে আসামি করে মামলা করেন। মামলার আসামিরা ছাত্রলীগের ‘সক্রিয় কর্মী’ বলে পুলিশ ও দলীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে। করোনার কারণে কলেজ ছাত্রাবাস বন্ধ থাকলেও এরা প্রভাব খাটিয়ে ছাত্রাবাসের বেশ কয়েকটি কক্ষ দখল করে সেখানে বসবাস করছিল এবং নানা অপকর্ম করছিল। সন্ধ্যার পরে তারা মদ-জুয়ার আসর বসাত বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন। এরই ধারাবাহিকতায় শুক্রবার রাতে তারা স্বামীর কাছ থেকে স্ত্রীকে তুলে নিয়ে ধর্ষণ করে। এ ঘটনায় জড়িতরা সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক রণজিত সরকারের অনুসারী। রণজিত অনুসারী জাহাঙ্গীর ও নাজমুল এই গ্রুপের নেতৃত্ব দেন।