করোনার অর্থনৈতিক অভিঘাত

করোনা মহামারীর কারণে বিশ্বের অনেক দেশের মতোই বাংলাদেশের মানুষ শুধু মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্মুখীনই হয়নি, উপরন্তু তাদের জীবন ও জীবিকাও মারাত্মক সংকটে পড়েছে। তাদের অধিকাংশই করোনার চেয়েও জীবিকা নিয়ে বেশি বিচলিত।  তারা বলেছেন, করোনায় বাঁচলেও অভাবে বাঁচা কঠিন। জীবন চালিয়ে নিতে মধ্যবিত্তরা সঞ্চয়ে হাত দিতে বাধ্য হয়েছেন। তারা রোজগার হারালেও সরকারি বা বেসরকারি কোনো সংস্থার কাছ থেকে সহায়তা পাননি। করোনা সংকটে সবচেয়ে বিপদে পড়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষ, বিশেষ করে যারা অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করতেন কিংবা ছোটখাটো ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। এদের অনেকের আবার জীবিকা থাকলেও মাসিক আয় হ্রাস পেয়েছে মারাত্মক আকারে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বা বিবিএসের চালানো জরিপে যে তথ্য উঠে এসেছে, তাতে দেশের মানুষ বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটের কবলে পড়েছে তা সহজেই প্রতীয়মান হয়।

বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, করোনার প্রভাবে দেশে মানুষের মাসিক আয় ২০ দশমিক ২৪ শতাংশ কমেছে। একই সঙ্গে ব্যয় কমেছে ৬ দশমিক ১৪ শতাংশ। করোনার সময় প্রায় ৫২ দশমিক ৫৮ শতাংশ পরিবার বা খানা কোনো না কোনোভাবে খাদ্যদ্রব্য ভোগের পরিমাণ ২০২০ সালের মার্চের তুলনায় কমিয়েছে। তাদের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ পরিবার/খানা মাসিক আয় কমার কারণে খাদ্যদ্রব্য ভোগের পরিমাণ কমিয়েছে। শতকরা প্রায় ৬৮ দশমিক ৩৯ ভাগ পরিবার বা খানা কোনো না কোনোভাবে করোনার অভিঘাতে আর্থিক সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে। বিশেষ করে রিকশা বা ভ্যানচালক ও দিনমজুররা অধিক মাত্রায় আর্থিক সংকটের সম্মুখীন হয়েছেন। করোনাকালীন আর্থিক সংকট মোকাবিলায় প্রায় ২১ দশমিক ৩৩ শতাংশ পরিবার বা খানা সরকারি সহায়তা বা ত্রাণ গ্রহণ করেছে। আর সরকারি সহায়তা বা ত্রাণ গ্রহণকারী এ খানা বা পরিবারগুলোর ৯৮ দশমিক ৪৪ শতাংশের আগস্ট মাসে এবং ৮২ দশমিক ৬৪ শতাংশের মার্চ মাসের গড় আয় ছিল ২০ হাজার টাকা বা তার কম। পাশাপশি, মার্চে বেকার বা কর্মহীনের শতকরা হার ছিল ২ দশমিক ৩ শতাংশ।  এপ্রিল-জুলাইয়ে এ হার বৃদ্ধি পেয়ে ২২ দশমিক ৩৯ শতাংশ হয়েছিল, সেপ্টেম্বরে তা আবার ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হলো ভোগ-ব্যয় বাড়ানো। কিন্তু বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপে যে তথ্য পাওয়া গেছে তার ভয়ংকর দিক হলো- ভোক্তাদের কাছে টাকা নেই।  তারা আগের চেয়ে কম ভোগ করছে। ফলে প্রবৃদ্ধিতে এটা নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করতে পারে।

এদিকে কঠিন বাস্তবতা হলো, করোনার কারণে মানুষের রোজগার কমে যাওয়ায় প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রীও তারা কিনতে পারছেন না। ফলে শিশুদের যে পরিমাণ পুষ্টি প্রয়োজন, তা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ব্যাহত হচ্ছে তাদের স্বাস্থ্যসেবাও। অন্যদিকে শহরাঞ্চল থেকে কাজ হারিয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ গ্রামে ফিরে যাওয়ার ফলে সৃষ্ট জনস্রোত গ্রামীণ অর্থনীতিতে চাপ বাড়াবে। বাংলাদেশের অর্থনীতির সব খাতই চলমান করোনাভাইরাস মহামারীর ছোবলে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে রপ্তানি খাতের চাহিদায় ধস, বৃহৎ ও মাঝারি শিল্প খাতের উৎপাদন সংকোচন, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প খাতের টিকে থাকার সংকট, জনশক্তি রপ্তানি বাজার সংকোচন ও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স প্রবাহে ধস, প্রবাসীদের কর্মসংস্থানে ধস এবং দেশে ফেরার আসন্ন হিড়িক, পর্যটন-হোটেল-মোটেল-রেস্তোরাঁর ব্যবসায়ে ধস, নির্মাণ খাত ও নির্মাণ সামগ্রী উৎপাদন খাতের ধস, পরিবহন ব্যবস্থার লণ্ডভণ্ড অবস্থা এগুলো সহজেই দৃশ্যমান হচ্ছে। একই সঙ্গে কৃষি খাত, ভোগ্যপণ্যের সরবরাহ ও বাজার ব্যবস্থা, দোকানপাট-শপিংমল-গ্রামীণ হাটবাজারের দীর্ঘ অচলাবস্থা, ভোক্তাদের ব্যবহার্য ইলেকট্রনিক পণ্যের বাজারের ধস, ব্যাংকগুলোর আমানত প্রবাহ সংকোচন, শিক্ষা খাতসহ সেবা খাতের তছনছ অবস্থা এগুলোর মাধ্যমেও সংকোচনের অভিঘাত পরিলক্ষিত হচ্ছে। 

এ অবস্থায় সরকারের উচিত সারা দেশের অভাবী মানুষের সহায়তায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া। তাদের জন্য খাদ্যসহায়তার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।  বিশেষ করে শিশুদের জন্য পুষ্টিকর খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। হঠাৎ কাজ হারানো মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থানের কথা ভাবতে হবে। মধ্যবিত্তকে স্বল্প সুদে ও সহজ শর্তে ঋণ দিতে হবে, যারা সহায়তার জন্য কারও কাছে হাত পাততে পারেন না। প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে অর্থনীতির এই মহাবিপর্যয় মোকাবিলার উদ্দেশ্যে ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার পাঁচটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন, যেগুলোকে অত্যন্ত সময়োপযোগী বলতেই হবে। পরবর্তী সময়ে ঘোষণা করেছেন কৃষি খাতের প্রণোদনা। সরকারের এই প্রণোদনা প্যাকেজগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন যাতে হয়, তা নিশ্চিত করা দরকার। যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগকে উৎসাহিত করা সম্ভব। তবে এই প্রণোদনা প্যাকেজের বড় অংশই ব্যাংক খাতের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে, যা ইতিমধ্যে দুর্বল ব্যাংক খাতের ওপর নতুন করে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে। তাই ব্যাংক খাতের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা কাটানোর জন্য জরুরি সংস্কার পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। করোনাসৃষ্ট উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশের খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়টি নতুন করে গুরুত্বের দাবি রাখে। রাষ্ট্র যদি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে না পারে, তাহলে বিপুল জনগোষ্ঠী নতুন করে চরম খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে। তাই এ বিষয়টিও বিশেষ বিবেচনার দাবি রাখে। সর্বোপরি, করোনাসৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সরকার সব ধরনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে এটাই প্রত্যাশিত।