রোহিঙ্গা শিবিরে হানাহানি

যত দিন যাচ্ছে কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ার রোহিঙ্গা শিবিরগুলো অপরাধের অভয়ারণ্য হয়ে উঠছে। মাদক, ইয়াবা, অবৈধ অস্ত্র, চোরাচালান ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের আখড়ায় পরিণত হচ্ছে ক্যাম্পগুলো। গত দুই মাস ধরেই রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে অপরাধ দ্রুত বাড়তে শুরু করে। এর মধ্যে গত ১৫ দিনে ক্যাম্পগুলোতে সহিংসতা দ্বিগুণে রূপ নিয়েছে। ক্যাম্পের ভেতরেই কয়েকটি বাহিনী গড়ে উঠেছে। এসব বাহিনীর মধ্যে কর্র্তৃত্ব ও দখলদারিত্বের কারণে কোন্দল বাড়ছে। গত সাত দিনে বড় দুই গ্রুপ আরসা ও মুন্না বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় এক নারীসহ আটজন নিহত হয়েছেন।

এ পরিস্থিতি সামাল দিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও হিমশিম খাচ্ছে বলে স্থানীয় ও সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প ব্যবস্থাপনা কমিটির চেয়ারম্যান হাফেজ জালাল আহমদ বলেন, আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

স্থানীয়রা জানান, শেষ দফায় মিয়ানমার থেকে নির্যাতনের শিকার হয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা ঢলের পর থেকেই উখিয়া- টেকনাফসহ কক্সবাজার জেলা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের অনেক এলাকায় রোহিঙ্গারা অপরাধ কর্মকা- চালিয়ে যাচ্ছে। দিনে দিনে পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হচ্ছে যে, সন্ধ্যা হলেই ক্যাম্পের আশপাশে আতঙ্ক নেমে আসে। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, মাদক কারবার, চোরাচালান, মানব পাচার, রোহিঙ্গা মেয়েদের বিক্রি করাসহ সব ধরনের অপরাধই হচ্ছে এসব ক্যাম্পে। তারা বলেন, রোহিঙ্গাদের কারণে স্থানীয়রা এখন সংখ্যালঘু। সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা পাচারের মূলবাহক হিসেবে কাজ করছে রোহিঙ্গারা। স্থানীয় অপরাধীচক্র রোহিঙ্গাদের তাদের বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে কাজে লাগাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এমিনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং দেশের কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এখন যে পরিস্থিতি তাতে রোহিঙ্গা শিবিরে অপরাধ আরও বাড়বে। এখানে নিবন্ধিত এবং অনিবন্ধিত রোহিঙ্গাদের মধ্যেও উত্তেজনা রয়েছে। রোহিঙ্গা শিবিরে নিরাপত্তা জোরদারসহ রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়াতে হবে। তা না হলে রোহিঙ্গাদের কারণে কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটনশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে। হানাহানি, রক্তপাত ও অপরাধ আরও বাড়বে।

এদিকে গত সাত দিনের রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আট খুনের ঘটনায় গত বৃহস্পতিবার থেকে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যৌথ অভিযান শুরু হয়েছে। গতকালও অভিযান অব্যাহত ছিল। অভিযানের পাশাপাশি নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত ক্যাম্পের নেতাদের সঙ্গে গতকাল সন্ধ্যায় এক ঘণ্টার একটি বৈঠকও করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সেখানে দুই নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত গ্রুপের নেতারা বলেছেন, ক্যাম্পের ভেতরে যারা অপরাধ করছে তাদের ধরিয়ে দিতে সহায়তা করবেন।

গতকালের বৈঠক সম্পর্কে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সদস্য দেশ রূপান্তরকে জানান, নিবন্ধিত এবং অনিবন্ধিত ক্যাম্পের মধ্যে কুতুপালং ডি-৫ কমিউনিটি সেন্টারে ৭টা ২০ মিনিট থেকে ঘণ্টাব্যাপী মিটিং হয়। সেখানে শতাধিক রোহিঙ্গা নেতা উপস্থিত ছিলেন। এ সময় কুতুপালংয়ের ক্যাম্প ইনচার্জ খলিলুর রহমান খান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাকিবুল ইসলাম ও এপিবিএনের পরিদর্শক সালেহ আহমেদ পাঠানও উপস্থিত ছিলেন। দুপক্ষের বক্তব্য হলো তারা কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা   চায় না। যারা সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালাচ্ছে তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হোক। অনিবন্ধিত গ্রুপের নেতা জকরিয়া মাঝি, রফিক মাঝি, আমিন মাঝি ও শুকুর মাঝি বলেন, আমরা কারও সঙ্গে বিরোধ করব না। যারা বিরোধ করে তাদের ধরিয়ে দেব। সাধারণ রোহিঙ্গারা বলেন, রোহিঙ্গাদের মধ্যে একধরনের অজানা আতঙ্ক বিরাজ করছে। প্রতিনিয়ত সন্ত্রাসী গ্রুপ ক্যাম্প অভ্যন্তরে তান্ডব চালায়। আমরা শান্তি চাই।

উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের দায়িত্বরত ১৪ নম্বর এপিবিএনের ইন্সপেক্টর ইয়াছিন ফারুক বলেন, নিবন্ধিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের একটি গ্রুপের সঙ্গে অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও আধিপত্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত রবিবার ভোরে দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নিয়েছি।

স্থানীয়রা জানান, কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দুই গ্রুপের দফায় দফায় সহিংস ঘটনায় অসহায় হয়ে পড়েছে সাধারণ রোহিঙ্গারা। রাত নামলেই রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বাড়ছে গোলাগুলি, হামলা-পাল্টা হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা।

এদিকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ঘটনায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের এশিয়াবিষয়ক ক্যাম্পেইনার সাদ হামাদি বিবৃতিতে বলেছেন, সংঘাতপূর্ণ রোহিঙ্গা শিবিরের ভেতরের পরিস্থিতি অত্যন্ত বিপজ্জনক। কর্র্তৃপক্ষ যদি অবিলম্বে সহিংসতা নিরসন ও শরণার্থীদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নেয় তবে আরও বড় বিপর্যয় ঘটবে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, জড়িতদের বিচারের আওতায় আনতে অবিলম্বে সহিংসতার বিষয়ে পক্ষপাতহীন তদন্ত শুরু করতে হবে। এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া উচিত হবে না যার কারণে শরণার্থীদের মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়। অব্যাহত সহিংসতাকে পুঁজি করে রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তরিত করা হতে পারে এমন আশঙ্কা করে বিবৃতিতে বলা হয়, ভাসানচর মানুষের নিরাপদ বসবাসের উপযোগী কি না, সেই বিষয়ে জাতিসংঘের মূল্যায়নের সুযোগ দেওয়া হয়নি। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনকে শরণার্থীরা জানিয়েছেন, দ্বীপটির অনিরাপদ অবস্থা ও বিচ্ছিন্ন অবস্থার কারণে তারা সেখানে যেতে চায় না।

সাদ হামাদি বলেন, ভাসানচরে পুনর্বাসন করা হলে তাদের বিদ্যমান নিরাপত্তাহীনতা বন্ধ হবে না এবং সংকটেরও কোনো দীর্ঘস্থায়ী সমাধান আসবে না। কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরে মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে দুই প্রতিপক্ষ সংগঠনের মধ্যে সহিংস সংঘাতের পর কমপক্ষে দুই হাজার শরণার্থী অন্যান্য শিবিরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। ওই ঘটনায় ৭ অক্টোবর কুতুপালং শরণার্থী শিবিরের প্রায় এক ডজন আশ্রয়কেন্দ্র পুড়িয়ে ফেলা হয়।

অ্যামনেস্টিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রোহিঙ্গারা বলছে, মেথাফেটামিন ট্যাবলেট নামে একটি মাদকের বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টাই মূলত সংঘাত শুরু হওয়ার অন্যতম কারণ। মিয়ানমারে উৎপাদিত ওই মাদক বাংলাদেশে পাচার হয়।

উখিয়ার স্থানীয় বাসিন্দা ওমর ফারুক মিয়া বলেন, আশ্রিত রোহিঙ্গাদের অত্যাচারে স্থানীয় বাসিন্দারা অসহায় হয়ে পড়েছে। রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা মাসখানেক আগে আমার ভাই আবদুর শুক্কুরকে অপহরণ করে নিয়ে গেছে। গত ৪২ দিন ধরে উদ্ধার না হওয়ায় উৎকণ্ঠায় রয়েছি।

জানা গেছে, গত বুধবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে কুতুপালং নিবন্ধিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ২ ইস্টে ডি-১ ব্লকে অগ্নিসংযোগ করেছে দুর্বৃত্ত রোহিঙ্গারা। এ সময় তিনটি ঝুপড়িঘর পুড়ে ছাই হয়ে যায় বলে জানিয়েছেন মোহাম্মদ আলম নামে এক রোহিঙ্গা। অতিরিক্ত ত্রাণ ও শরণার্থী প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. সামছুদ্দৌজা নয়ন জানান, বুধবার রাতে কুতুপালং নিবন্ধিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সি-ব্লকে দুর্বৃত্তের দেওয়া আগুনে সাত-আটটি বসতঘর পুড়েছে এমন তথ্য পেয়েছি। তিনি বলেন, রাতে আগুন লাগার খবরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে নিয়ন্ত্রণে আনায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া গেছে। রোহিঙ্গাদের দুই গ্রুপের আধিপত্য বিস্তার নিয়ে যেকোনো একপক্ষ অগ্নিসংযোগ করতে পারে। উখিয়া ফায়ার স্টেশন ম্যানেজার ইমদাদুল হক বলেছেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অগ্নিকা-ের ঘটনায় তিনটি বসতঘর পুড়েছে। তাৎক্ষণিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয় করা যায়নি।

এর আগে গত বুধবার বিকেলে কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে যান পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. আনোয়ার হোসেন। পাশাপাশি পুলিশসহ যৌথবাহিনী ক্যাম্পের অভ্যন্তরে টহল জোরদার করেছে। এছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

উখিয়া থানার ওসি মো. সঞ্জুর মোরশেদ জানিয়েছেন, গত ১৫ দিন ধরে কুতুপালং ক্যাম্পে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের বিবদমান দুটি গ্রুপ বিভিন্ন সময়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এতে বুধবার পর্যন্ত আটজন নিহত এবং অনেকে আহত হয়েছে। এসব সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে পাঁচটি মামলা করেছে। ক্যাম্পের বিভিন্ন স্থানে পুলিশ অভিযান চালিয়ে এ পর্যন্ত ১২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। এর আগে গত মঙ্গলবার টেকনাফের চাকমারকুল এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৯ রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীকে আটক করে র‌্যাব। এ সময় বিপুল পরিমাণ অস্ত্রও উদ্ধার করা হয়।

কূটনৈতিক বিশ্লেষক ও সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ওয়ালি উর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। আর রোহিঙ্গারা যেভাবে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে তাতে স্থানীয়দের মধ্যেও আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন, এখন চীন ও ভারত চাইলেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন হবে। সরকারকে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক তৎপরতার আহ্বান জানান তিনি।

প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন উখিয়া প্রতিনিধি শহীদুল ইসলাম