বিশিষ্ট সমাজকর্মী শবনম হাশমির এক লাইন টুইট আচমকা ভেসে উঠল স্ক্রিনে। এদেশ থেকে যাবতীয় কাজকর্ম গুটিয়ে চলে যেতে হচ্ছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল-কে।
খবরটা নতুন হলেও খুব কিছু চমকে দেওয়ার মতো নয়। এরকম প্রচুর ঘটনা হালফিল এদেশে ঘটে চলেছে যা গণতন্ত্রের পক্ষে ভালো বিজ্ঞাপন নয়। যে আমার পক্ষে নয় সেই আমার শত্রু। আর ছলে-বলে-কৌশলে তার কণ্ঠরোধ করা ইদানীং ভারতীয় গণতন্ত্রের দস্তুর হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিরোধী স্বর এমনভাবে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে যে এদেশের গণতন্ত্র নিয়ে সারা দুনিয়াতেই প্রশ্ন উঠে গেছে।
এমন একটা সময় অ্যামনেস্টি-কে চলে যেতে বাধ্য করা হচ্ছে যখন এই নিরপেক্ষ মানবাধিকার সংগঠনটি এদেশের সাম্প্রতিক দু-দুটো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে তদন্ত করছিল ১. জম্মু ও কাশ্মীরের সংবিধান পাল্টাবার পরে সেখানকার পরিস্থিতি কেমন এবং ২. ছ’মাস আগে ঘটে যাওয়া দিল্লি দাঙ্গার পেছনে কাদের হাত ছিল! সত্যিকারের দোষী কে বা কারা!! দুটোই অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। ভারতের শাসক দল ইতিমধ্যেই যেভাবে দিল্লি পুলিশকে সামনে রেখে গোটা বিষয়টিকে নিয়ে যাচ্ছে বিরোধী ষড়যন্ত্র বলে, অ্যামনেস্টি উল্টো রিপোর্ট দিলে তাদের মুখ পুড়বে এই আশঙ্কাতেই তাদের ওপর আক্রমণ নেমে এলো এ সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
মুশকিল হচ্ছে যত দিন যাচ্ছে ততই ভারত সরকার এমন সব কা- করছে তাতে সন্দেহ কমার চেয়ে বাড়ছে বেশি। উমর খালিদকে যে দক্ষতায় পাতার পর পাতা জুড়ে ‘অপরাধী’ প্রমাণ করতে দিল্লি পুলিশ ব্যস্ত তা নিয়েও হয়তো প্রশ্ন উঠত না, যদি বিজেপি নেতা অনুরাগ ঠাকুর বা কপিল মিশ্র একবারের জন্য হলেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় ডাক পেতেন। অথচ দিল্লি গণহত্যার সময় উমর শহরেই ছিল না এটা জেনেও তাকে রাষ্ট্র বিরোধিতার দায়ে অভিযুক্ত করা হচ্ছে।
কিন্তু চোখের সামনে পিস্তল নেওয়া ছবি সামনে এলেও পার পেয়ে যাচ্ছেন শাসক ঘনিষ্ঠরা। উমরের বিরুদ্ধে যে হাস্যকরভাবে মামলা সাজানো হয়েছে তা দেখে-শুনে বিশিষ্ট আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ বলতে বাধ্য হয়েছেন যে, এটা এক্কেবারে ক্রিমিনাল কন্সপিরেসি। শুধু প্রশান্ত ভূষণের বক্তব্য না হয় ধরলাম না। কারণ তিনিও তো ‘সরকারবিরোধী’। তিনি তো নিন্দে করবেনই। কিন্তু ভারতের ইতিহাসে এই প্রথম ৯ জন প্রাক্তন ‘আইপিএস’ অফিসার দিল্লি পুলিশের কমিশনার শ্রীবাস্তবকে খোলাচিঠিতে পরিষ্কার জানিয়েছেন যে, এই চার্জশিটে ন্যায্য তদন্তের ছায়াটুকুও নেই। এ ভীষণরকম পক্ষপাতদুষ্ট। বিশিষ্ট পুলিশ কর্তারা সরাসরি আশঙ্কা করেছেন, আসল অপরাধীদের শাস্তি হবে না। কেইস এমনভাবে সাজানো হয়েছে। ভারতীয় পুলিশের ইতিহাসে এ এক অন্ধকার সময়।
বিজেপি সরকার যেন আদাজল খেয়ে নেমে পড়েছেন এদেশের গণতন্ত্রকে কবরে পাঠাতে। দিন দিন সরকারের এই মরিয়া বেপরোয়া কিস্যু মানি না ভাবটা বড় বেশি বেআব্রু হয়ে পড়ছে। এতটাই যে একটু নিরপেক্ষ যে কোনো মানুষের কাছেই তা পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। গরু নিগ্রহ করলেও রাষ্ট্র বিরোধিতার মামলা করা হচ্ছে। ‘সিএএ’ ও ‘এনআরসি’ বিরোধী তরুণ ছাত্রদের জেলে পোরা হচ্ছে। বিনোদ দুয়ার মতো বিশিষ্ট সাংবাদিক বা প্রশান্ত ভূষণের মতো আইনজীবী কেউ সরকারের ক্রোধ থেকে পার পাচ্ছেন না। হেইট স্পিচের দোহাই দিয়ে নানা অজুহাতে বিরোধীদের সাজা দেওয়া এখন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ দ্বিগুণেরও বেশি সাম্প্রদায়িক উসকানি দিয়েও নিশ্চিন্তে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন সরকার ঘনিষ্ঠরা।
মুশকিল হচ্ছে যে অধিকাংশ মানুষ এই মুহূর্তে মূলধারার মিডিয়ার প্রচারে সময় সময় এমন বিভ্রান্ত হচ্ছে যে বিজেপি সরকারের তুমুল মিথ্যে ও কৌশলী ভূমিকায় কিছুটা হলেও থমকে যাচ্ছেন। আসল-নকল চিনতে সমস্যায় পড়ছেন। এই সুযোগে ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি শুধু ধর্মীয় মেরুকরণের রাস্তায় হেঁটে বাজিমাত করছে তা নয়, দলিত আদিবাসী ও সংখ্যালঘু মুসলিমদের যাবতীয় অধিকার কেড়ে নিতে সক্রিয় ভূমিকা নিচ্ছে। বিজেপি বা সংঘপরিবারের এত অজস্র মুখ, এত হরেক রকম সংগঠন যে কে কখন কীভাবে বিরোধী শক্তিকে ছিন্নভিন্ন করতে কোন ভূমিকা নেবে তা আগাম আঁচ করা অনেক পোড়খাওয়া রাজনীতিকের পক্ষেও কঠিন।
দাবার চালের মতো কখনো সে ঘোড়া, আবার নৌকা দিয়ে বাজিমাত করতে চেষ্টা চালায়। এখন যেমন সাধারণভাবে ভারতের মানুষ উত্তর প্রদেশের হাথরাসের এক দলিত তরুণীকে নৃশংসভাবে ধর্ষণ করে খুনের প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে এসেছে, ঠিক তখনই লোকচোখের আড়ালে বিরাশি বছরের বৃদ্ধ জেসুইট ফাদার স্ট্যান স্বামীকে গ্রেপ্তার করা হলো পুরনো মামলায়। তিন বছর আগে পুনার কাছে ভীমা কোঁরেগাও গ্রামে দলিতদের সঙ্গে উচ্চবর্গের মারাঠিদের এক সংঘর্ষের পর থেকেই দেশের বিশিষ্টজনদের নানা ছুঁতোয় গ্রেপ্তার করার যে রণকৌশল বিজেপি সরকার নিয়েছে ফাদার স্ট্যানকে গ্রেপ্তার তার আপাতত শেষ সংযোজন।
সরকারের হাতে অনেক অস্ত্র। ‘এনআইএ’ বা জাতীয় তদন্ত ব্যুরো, ‘সিবিআই’, ‘আয়কর দপ্তর’ ইত্যাদি। নিন্দুকেরা বলেন যে যখন যাকে হেনস্তা করার প্রয়োজন হবে সরকার তখন পছন্দমতো নিজেদের অস্ত্র প্রয়োগ করবে। বলাবাহুল্য যে এই প্রয়োগের পেছনে উদ্দেশ্য একটাই, বিরোধী স্বর স্তব্ধ করা। এখন আবার আর দুটি অত্যাধুনিক অস্ত্র মাননীয় সরকার বিরোধী দলকে দমনে কাজে লাগাচ্ছে। মিডিয়ার বড় অংশ ও বিচারপতিদের কাউকে কাউকে কীভাবে যেন কিনে নিয়ে। হতে পারে তা ঘুষ বা পদন্নোতির লোভ দেখিয়ে। ভীমা কোঁরেগাও মামলায় এখন অবধি যারা গ্রেপ্তার হয়েছেন তারা নিংসন্দেহে সারা দেশে যথেষ্ট জনপ্রিয় ও বিশিষ্ট। কে নেই সে তালিকায়! বিখ্যাত কবি ভারভারা রাও, সমাজকর্মী সুধা ভরদ্বাজ, গৌতম নওলাখার ও সম্প্রতি এই বৃদ্ধ ফাদার স্ট্যান স্বামী।
ভারতে ইদানীং কতগুলো বৈশিষ্ট্য দেখে অপরাধী ঠাউরে নেওয়ার একটা চল শুরু হয়েছে। এই ধরুন লুঙ্গি পরা, মাথায় টুপি, মুখে দাড়ি, হতেই পারে সন্দেহজনক আল-কায়েদার লোক! অতএব ধরে জেলে পুরে দেওয়াই যায়। নাগরিক অধিকার আবার কি! দেশ বাঁচলে সব ঠিক আছে। পাশাপাশি দলিত আদিবাসী মানবাধিকারকর্মী হলে ট্যাগ লাগিয়ে দাও ‘আরবান মাওবাদী’। ব্যস ‘জেহাদি’ বা ‘মাওবাদী’ সন্দেহে গ্রেপ্তার হলে জনগণ চট করে মুখ খুলবে না। শব্দ দুটো ইতিমধ্যেই করোনার চেয়েও ভয়ংকর। আর দেশের বাঁচা-মরার প্রশ্নে কোনো আপস চলে না। আর কে না জানে দেশ এখন শুধুই উচ্চবর্গের হিন্দুদের। মনুবাদী দর্শনের। তারাই দেশ, তারাই সরকার, তারা যা নিদান দেবে সেটাই আইন। এখন আবার মুসলিম বিদ্বেষের পাশাপাশি নতুন করে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ওপরেও নতুন নতুন হামলা নেমে আসছে। ফাদার স্ট্যানকে গ্রেপ্তার সেটাও একটা কারণ হতে পারে। অবশ্য মনে রাখতে হবে যে এই জেসুইট খ্রিস্টান যাজক মনে করতেন যিশু স্বয়ং আদি কমিউনিস্ট। যিনি সাম্যের গান গেয়েছিলেন। ফাদার নিজেই, ২০১৭ সালে আদিবাসীদের জমি দখল করে করপোরেট পুঁজির হাতে প্রায় বিনা পয়সায় দিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদে, আদিবাসী অধ্যুষিত ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়ে আদিবাসী জনজাতির অসংখ্য মানুষকে সংগঠিত করেছিলেন। এদেশের মাওবাদী রাজনীতি আজও টিকে আছে জল-জঙ্গল-জমি থেকে আদিবাসী জনজাতির উচ্ছেদবিরোধী আন্দোলন করেই। ফলে মাওবাদীদের সশস্ত্র পথ ও ফাদারের অহিংস পথ যে আলাদা তা কোনো শাসক আর কবেই-বা বুঝেছে।
খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে এক পুরনো অভিযোগ যে, তারা পয়সা দিয়ে গরিব আদিবাসীদের ধর্মান্তরিত করছেন। এই অভিযোগে ১৯৯৯-এ ওড়িশায় ফাদার গ্রাহাম স্টেইনসকে দুই শিশুপুত্রসহ পুড়িয়ে মারার অভিযোগ উঠেছিল বজরং দল নেতা দারা সিংয়ের বিরুদ্ধে। যদিও তখন বিজেপির লৌহপুরুষ লাল কৃষ্ণ আদভানি সাফ জানিয়েছিলেন বজরং দল এ কাজ করতেই পারে না। কিন্তু তখন থেকেই এটা স্পষ্ট যে গ্রামে গ্রামে বজরং দল ও বনবাসী কল্যাণ কেন্দ্র এই দুই সংঘপরিবারের মধ্যকার সংগঠন আদিবাসীদের মধ্যে ক্ষমতা বাড়াতে তৎপর। বিজেপি রাজত্বকালে আদিবাসীদের ‘ঘর ওয়াপসি’ বা হিন্দু ধর্মে ফিরিয়ে আনতে সক্রিয় ভূমিকা নিচ্ছে সংঘ ঘনিষ্ঠরা। আদিবাসীদের সাবেক সংস্কৃতির ওপরেও মনুবাদী রাজনীতি জোর করে চাপিয়ে দিতে চাইছে বলে বিস্তীর্ণ এলাকায় আদিবাসীদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছেন সংঘ সমর্থকরা এ খবরও এখন প্রায়ই শোনা যাচ্ছে। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে খ্রিস্টানদের প্রভাব দীর্ঘদিনের। তার অনেক কারণও আছে। তাই ফাদারের ওপর রাজরোষ কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালকে সরিয়ে দেওয়া আর নতুন করে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ওপরে আক্রমণ দুইই মনুবাদী রাজনীতির রণকৌশল ও আরএসএস-এর গোপন এজেন্ডা। ভারত যত হিন্দুরাষ্ট্র হওয়ার পথে এগোবে গণতন্ত্র ততই সঙ্কুচিত হবে ও প্রান্তিক সব সম্প্রদায়ের ওপরে নতুন নতুন অজুহাতে হামলা নেমে আসবে।
লেখক : ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা
sdastidar27@gmail.com