জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নিবন্ধন কার্যক্রমের নিয়ন্ত্রণ নিতে চায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে প্রস্তাবটির বিষয়ে মতামত চাওয়া হয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের। এ সংক্রান্ত মতামত দেওয়ার জন্য একটি কমিটি গঠন করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। এ বিষয়ে জানতে চাইলে কমিটির আহ্বায়ক মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব সোলতান আহ্মদ গত বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আজ (বৃস্পতিবার) সবেমাত্র কমিটি গঠন করা হলো। কমিটি গঠনের আদেশ আসবে, কার্যপরিধি সম্পর্কে জানব তারপর কাজ শুরু হবে। এখন এ বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না।’
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিবকে আহ্বায়ক করে গঠিত কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের বিধি ও সেবা অধিশাখার যুগ্ম সচিব, মাঠপ্রশাসন সংযোগ অধিশাখার উপসচিব, আইন-১ অধিশাখার উপসচিব এবং বিধি অধিশাখার উপসচিব।
গত বুধবার জারি করা কমিটি গঠনসংক্রান্ত অফিস আদেশের কার্যপরিধিতে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত এনআইডি কার্যক্রম নির্বাচন কমিশনের পরিবর্তে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে ন্যস্ত করার প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করা। নির্বাচন কমিশনের বদলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন কার্যক্রম স্থানান্তরের চ্যালেঞ্জসমূহ নির্ণয় করা এবং মোকাবিলার কৌশল সুপারিশ করা, এরূপ স্থানান্তরে কী কী আইন, বিধি ও অবকাঠামো পরিবর্তন করা প্রয়োজন তা নিরূপণ করা এবং এ রূপান্তরে ফলপ্রসূ ফলাফল আসবে কি না তা মূল্যায়ন করা।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কাজ কী তা আইন ও বিধি দিয়ে নির্ধারণ করা হয়। ক্ষেত্রবিশেষে সংবিধানেও বলে দেওয়া হয় কার কী কাজ। ইসির কাজ খোদ সংবিধানেই বলে দেওয়া আছে। সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদে এ সংক্রান্ত কাজ ইসির এখতিয়ারে রাখা হয়েছে। তাছাড়া রাষ্ট্রপতি জারিকৃত রুলস অব বিজনেস এবং এলোকেশন অব বিজনেসেও বলা হয়েছে, এ সংক্রান্ত কাজের এখতিয়ার ইসির। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে এনআইডি কার্যক্রমের কর্র্তৃপক্ষ বদলাতে হবে কেন।
সম্প্রতি এনআইডি নিয়ে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টাকা হলেই পাওয়া যাচ্ছে জাল এনআইডি কার্ড। কেউ টাকা দিয়ে বয়স পরিবর্তন করছে, কেউ বা হচ্ছে দ্বৈত ভোটার। জীবন্ত ব্যক্তিকে মৃত দেখানো কিংবা নিজের ছবি রেখে দেওয়া হচ্ছে অন্যের ছবি ও তথ্য। আবার কেউ একাধিকবার পরিবর্তন করছে শিক্ষাগত যোগ্যতাও। জাল এনআইডি তৈরি করে অনেকে ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছে মোটা অঙ্কের। তারা এ ঋণ পরিশোধ করেন না। ব্যাংক তাদের খুঁজেও পায় না। এমনকি টাকার বিনিময়ে কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে এনআইডি। কয়েকশ’ রোহিঙ্গাকে এনআইডি দেওয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে খোদ ইসি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। এরপর এনআইডি জালিয়াতি ও দুর্নীতি বন্ধে ‘শুদ্ধি অভিযান’ শুরু করে ইসি। এর অংশ হিসেবে রোহিঙ্গাদের ভোটার করা ও এনআইডি দেওয়ার অপতৎপরতায় সম্পৃক্ত এক ডজন কর্মকর্তাকে নজরদারিতে রাখে কমিশন। প্রতারকরা অনৈতিক কাজে ব্যবহারের জন্য টাকার বিনিময়ে জাল এনআইডি তৈরি করে দিচ্ছে। সম্প্রতি ডিবির জালে ধরা পড়েছে একাধিক প্রতারক।
সম্প্রতি মেহেরপুরের গাংনীতে জীবিত ব্যক্তিকে মৃত দেখিয়ে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে উপজেলা নির্বাচন অফিসের বিরুদ্ধে। কুষ্টিয়ায় এনআইডি জালিয়াতির রেশ কাটতে না কাটতেই গাংনী নির্বাচন অফিসের এ ঘটনায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। এজন্য অনেকে ইসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের তদারকি না থাকা ও উদাসীনতাকে দায়ী করছেন।
সম্প্রতি ডা. সাবরিনার এনআইডি জালিয়াতির ঘটনায় দেশে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। করোনার ভুয়া সনদ দিয়ে বাণিজ্যের অভিযোগ করা মামলায় এখন তিনি জেলহাজতে রয়েছেন। মামলার এজাহারের তথ্য অনুযায়ী, সাবরিনা ২০০৯ সালে হালনাগাদের সময় রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ভোটার হন। সেই এনআইডিতে তার নাম সাবরিনা শারমিন হোসেন; বাবার নাম সৈয়দ মুশাররফ হোসেন; মায়ের নাম কিশোয়ার জেসমীন; স্বামী আর এইচ হক; জন্ম তারিখ ২ ডিসেম্বর, ১৯৭৮; পেশা সরকারি চাকরি এবং বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা পিসি কালচার হাউজিং সোসাইটি, মোহাম্মদপুর, ঢাকা। তার দ্বিতীয় এনআইডির নিবন্ধন হয়েছে ২০১৬ সালে; সেখানে তার নাম সাবরিনা শারমিন হুসেন; বাবার নাম সৈয়দ মুশাররফ হুসেন; মায়ের নাম জেসমিন হুসেন; স্বামী আরিফুল চৌধুরী; জন্ম তারিখ ২ ডিসেম্বর, ১৯৮৩; পেশা চিকিৎসক এবং বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা বাড্ডার আনোয়ারা ল্যান্ডমার্ক, ঢাকা।
এনআইডি জালিয়াত চক্রের তৎপরতা নির্মূলে বিভিন্ন সময় দেশজুড়ে ‘সাঁড়াশি অভিযান’ চালিয়েছে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগ (এনআইডি উইং)। এই অনুবিভাগের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জালিয়াত চক্রকে আমরা সমূলে নির্মূল করব। তাদের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান কঠোর। অপরাধীদের কোনোভাবে ছাড় দেওয়া হবে না। সাঁড়াশি অভিযানের জন্য ইসি সচিবালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, এনআইডি উইং, প্রকল্পের কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের সমন্বয়ে একাধিক দল করা হচ্ছে। এনআইডি জালিয়াতিসংক্রান্ত যেকোনো ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও তৎপরতার তথ্য পেলে ভেতরে-বাইরে জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনতে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। সম্প্রতি জালিয়াত চক্রের সঙ্গে আউটসোর্সিংয়ে নিয়োগ পাওয়া অস্থায়ী কর্মী ডেটা এন্ট্রি অপারেটরদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এর বাইরে চক্রের অনেকে জড়িত থাকার তথ্য আসছে। বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে মাঠপর্যায়ে অনিয়ম রোধে অভিযানের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। ইসির ডেটাবেজ সুরক্ষিত। এখন উপজেলা পর্যায়েও সার্ভারে পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা সিস্টেম চালু করা হয়েছে।’